অনিশ্চয়তায় পোশাক খাত

চলমান করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট মহামারীর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। ফলে একটি বড় ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগের জোগানদাতা তৈরি পোশাক খাত। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে শ্রমিক, মালিক ও সরকার-এ তিন পক্ষকেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘কোভিড-১৯ : সংকটের মুখে শ্রমিক ও মালিক-সরকারি উদ্যোগ ও করণীয়’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনায় এ বিষয় উঠে আসে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৭ম বার্ষিকী উপলক্ষে এ আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে ফ্রেডরিখ-ইবার্ট-স্টিফটাংফ্রেডরিখ-ইবার্ট-স্টিফটাং (এফইএস), বাংলাদেশ অফিস। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘চলামান এ মহামারীর কারণে রপ্তানি আয়ের ওপরে যে প্রতিঘাত পড়েছে তার ফলে শ্রমিকদের জীবনমানের ওপর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ সমস্যা নিরসনে পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সংগঠন ও শ্রমিকদের মথ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন। দেরিতে বেতন দেওয়া, পূর্ণাঙ্গ বেতন না হওয়া, শ্রমিক ছাঁটাই ও লকডাউনের সময়ে কারখানা খোলা রেখে শ্রমিকদের কাজে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটেছে।

এসবের ফলে শ্রমিকরা ও তাদের পরিবার এ দুর্যোগের মধ্যে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কারখানাগুলোতে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। রানা প্লাজার ঘটনা বিবেচনায় রেখে দেশের কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের জন্য দুর্যোগকালীন সেবার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’

তবে বেশ কিছু আশার কথাও শুনিয়েছেন এ গবেষক, ‘বৈশ্বিক ঝুঁকি চলে গেলে অল্প মূল্যের গার্মেন্টস পণ্য কেনার চাহিদা বাড়বে। যেহেতু অনেকের আয় কমে যাবে, ফলে কম মূল্যের পণ্যের চাহিদা বাড়বে। যেগুলোর জন্য আমাদের দেশের চাহিদা তৈরি হবে। তখন এটি আমাদের দেশের জন্য একটি সুযোগ বা সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিতে পারে।’

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান অনুষ্ঠানে সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘যদিও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সাময়িক টানাপড়েন চলছে, কিন্তু তাতে করে এ দুই দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। বর্তমানে রপ্তানি খাতে যে স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে, ভবিষ্যতে তা কাটিয়ে উঠে ব্যবসার সুযোগ ধরে রাখার প্রতি উদ্যোক্তাদের মনোযোগী হতে হবে।’

ভার্চুয়াল আলোচনাটির সঞ্চালক সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বৈশ্বিক এ মন্দার মধ্যে পোশাক খাতের কার্যাদেশগুলো যেন অন্য দেশগুলোতে চলে না যায় সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও ক্রেতাদের দরকষাকষি অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আপাত এ সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সব পক্ষকেই সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি আরশাদ জামাল দীপু বলেন, ‘উদ্যোক্তা ও কারখানার মালিকরা বৈশ্বিক এ মহামারীর ফলে সৃষ্ট সংকট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছে। এ অভিজ্ঞতা সবার জন্য নতুন। রানা প্লাজার মতো ট্র্যাজেডি ছিল জাতীয় পর্যায়ের সংকট। কিন্তু এখন আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মুখে পড়েছি। এ জন্য হয়তো কিছু সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তা ও কারখানা মালিকরা দেশের আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা করবে।’

শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ ও বকেয়া বেতন-বোনাস দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশোধের দাবি জানান জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (এনজিডব্লিউএফ) সভাপতি আমিরুল হক আমিন। জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে শ্রমিকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সংকট মোকাবিলায় কৌশল প্রণয়ন করা উচিত বলেও মনে করেন বক্তারা। আলোচনায় আরও অংশ নেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন, শ্রমিক প্রতিনিধি নাজমা আক্তার, জলি তালুকদার, বাবুল আক্তার, তাসলিমা আক্তারসহ অনেকেই।


আরও পড়ুন