ডাহুক পাখির ডাক

মোঃ আবু নোমান ভূঞাঁ: বিকাল বেলা আমার রুমে শুয়ে আছি। হঠাৎ চোখ পড়লো টিনের চালের ফাঁক দিয়ে দেয়ালে সূর্যের আলো এসে পরছে। দেখতে বেশ লাগছে। সেই দারুন দৃশ্যটা আমি মিস করতে চাই না। সেই মুহূর্তটা আমি স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে চাই। বিছানা ছেড়ে উঠে সোজা চলে গেলাম বাসার পিছনে। আমার বাসার পিছনে দুটো প্লট খালি। সেখানে এখনো বাসা হয়নি। সবুজ ঘাস জন্মেছে। হাঁটতে ভালই লাগে সবুজ ঘাসের বুক দিয়ে। মাঝে মাঝে আমি তা দেখতে যাই এবং কিছুক্ষণ হাঁটা- হাঁটি করি।

তবে আজ এসেছি একমাত্র বিকাল বেলার রক্তিম সূর্যের টানে। এসে দেখি সূর্যের আলোটা এমন ভাবে গাছের উপর পরেছে মনে হচ্ছিল যেন গাছের পাতায় আগুন লেগে গেছে। তবে এই আগুনের কোন তাপ নেই। যা সব কিছুকে পুড়ে ছারখার করে দিতে পারে। এমন কি গাছপালার ডালকেও। তবে গাছের ডালে আজ যে আগুন লেগেছে তা দেখে মানুষের মনে ভালোবাসার আগুন লেগে যাবে। আর আমারও তাই হয়েছে। সেই টানে ঘর থেকে আমাকে বাহির করে নিয়ে এসেছে।

মুগ্ধ হয়ে আমি তাকিয়ে আছি গাছের দিকে। মনে হচ্ছিল যেন সূর্য তার সমস্ত শক্তি দিয়ে গাছের উপর তাপ বিকিরণ করছে। কিন্তু সূর্য তার তেজস্বী বিকিরণ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। গাছের কাছে সে হেরে গেছে। তাই ভালোবাসার আলো দিয়ে গাছকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। গাছও ত বেশ আরাম করে গ্রহণ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে আর স্বাদ গ্রহণ করছে। আগুন লাগা গাছের উপর দিয়ে পাখিরা তাদের নীড়ে ফিরছে আপন মনে। সারা দিনের আহার গ্রহণের পর তারা দলবেঁধে সমান তালে আপন মনে ডানা ঝাপটে বাড়ি ফিরছে। এ দৃশ্য বেশ কিছুক্ষণ মন ভরে দেখলাম। আপন মনে ভাবছিলাম রং তুলি দিয়ে এঁকে রাখি।

কিন্তু আমি আঁকতে জানি না। একজন শিল্পী তা দেখলে খুব সুন্দর করে সেই দৃশ্যটা তার ছবির ফ্রেমে বন্দি করতো। এই মুহূর্তটা যেন খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ভাল মুহূর্ত গুলো খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। কষ্টের প্রতিটা সেকেন্ড মনে হয়ে দীর্ঘ নদীর মত। নদীর কোন মাথা-লেজ থাকেনা। একের পর এক শুধু মিলিত হতে থাকে। গাছের উপর থেকে সূর্যের ভালোবাসার আলো আসতে আসতে সরে যেতে লাগলো। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে সন্ধ্যা নেমে আসছে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

হঠাৎ চোখ পরল পাশের এক ঝুপে। কে যেন ঘজ ঘজ শব্দ করছে। কাছে যেতেই প্রাণ পনে পাখা মেলে উড়াল দিল সাদা কালো পালকের ডাহুক পাখি। অনেক দিন যাবৎ তাদের বসবাস এখানে। আামার বাসা ঘেঁষে ডুবা পুকুর। আগে পুুকুরের পানি ভাল ছিল। ময়লার কারণে পানি খারাপ হয়ে এখন ডুবা পুকুরে পরিণত হয়েছে। সে জন্যই সেখানেই তাদের আস্তানা। সেখানে এখন তারা তাদের রাজ্য বিস্তার করে বসেছে নিশ্চয় সেটা বলা চলে। তাদের শরীরের উপরের পালক কালো এবং বুকের পালক সাদা। পা গুলো লম্বা ধরনের। পায়ের ও ঠোটের রং হলুদ। মাছ, পোকা-মাকড় তাদের প্রধান খাবার। এরা খুব চালাক পাখি। তাদের নাগাল কেউ পায় না।

শুনেছি, রকি তাদেরকে বেশ কয়েক বার ধাওয়া করেছে ধরার জন্য। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। রকি হলো বিখ্যাত মৎস শিকারী। সে এলাকার কোন জায়গা বাদ নেই যে মাছের সন্ধানে তার পা পরেনি। বর্ষাকালে তাকে দেখা যায় বড়শি হাতে পিঁপড়ার ডিম বা উলি পোকা নিয়ে মাছ ধরতে যেতে। আসার সময় ডুলা (মাছ রাখার পাত্র) ভর্তি মাছ। এত সব মাছ যেন তার হাতেই ধরা পরে। মাঝে মাঝে তাকে থামিয়ে আমরা তার ধরে আনা মাছ দেখি। কি করে যে সে এত মাছ ধরে আল্লাহ মাবুদই জানে।

শুধু যে সে বর্ষাকালে মৎস শিকাড় করে তা বললে ভুল হবে। সে সারা বছর মৎস শিকাড় করে। এটা তার পেশা না বরং এটা তার এক ধরনের নেশা বলা চলে। একবার সে মাছ ধরতে গিয়ে ভুল করে নিজের পায়ে নিজেই কুচ (মাছ ধরার জন্য লোহা ও বাশেঁর তৈরি যন্ত্র) দিয়ে ঘা বসিয়ে ছিল। পরে সদর হাসপাতাল থেকে ব্যান্ডেজ করে আনা হয়। সেও ডাহুক পাখি ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।

পাখি গুলো মনের আনন্দে দিনে বেশ কয়েক বার চেঁচিয়ে উঠে। তারা দিনের চেয়ে বেশি চেঁচায় এখন রাতের বেলায়। প্রথম দিকে তাদের বাস ছিল পুকুরের পশ্চিম পাশে। এখন তারা কয়েকটা নুতন ফ্ল্যাট কিনেছে পূর্ব দিকের পাকা রাস্তার পাশে। পাকা রাস্তার পাশে কেন নিয়েছে আর কে যে তাদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে তা আমার জানা নেই। তবে হয়তো গাড়ির হর্ন শুনতে তাদের খুব ভাল লাগে। দিনের বেলায় ইউএনও (উপজলা নির্বাহী অফিসার) ও উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবের গাড়ি বেশ কয়েক বার হর্ণ বাজাতে বাজাতে চক্কর দেয়। হয়তো তারা তা খুব কাছে থেকে শুনতে চায়। অন্যান্য গাড়িও চলে। তবে ট্রাকের খুব দ্রুত গতির চলাটা তাদের কানে বেশ কঠিন ভাবে লাগে। মনে হয় যেন একটা ছোট খাট ভূমিকম্প হয়েছে।

আমি বেশ কিছুক্ষণ খুঁজা খুঁজি করলাম পাখি গুলো দেখার জন্য। কিন্তু তাদের দেখা পেলাম না। ডুবা পুকুর এখন কচুরিপানায় ভরপুর। সাথে কলমি গাছ জন্মেছে। তারা একমত আত্মীয় পাতিয়েছে।

কবি বন্দে আলী মিয়া তার কবিতায় লিখেন-

“আমগাছ জামগাছ বাঁশ ঝাড় যেন, মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন”।

সেই আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ এখন কচুরিপানা আর কলমিরা। কলমির ডগা গুলো বাতাসে দোলছে। দোলে দোলে কচুরিপানার গায়ে ঢলে পরছে। কিন্তু একবারের জন্য অভিযোগ করছে না। কেন সে তার গায়ে বার বার পরছে। কিন্তু আামরা মানুষ যখন ট্রেনে বা বাসে যাত্রা করি তখন কেউ দু-এক বার ঘুমের ঘোরে গায়ে পরলেই রেগে উঠি। গা ছমছম করতে থাকি। কিন্তু তাদের বেলায় এমন কোন মান-অভিমানের দেখা মিলছে না। তাদের মধ্যে গভীর প্রেম। তা দেখতে দেখতে মাগরিবের আযান হয়ে গেল।

বাসায় চলে এলাম। বাসায় এসেও শুনা যাচ্ছে ডাহুক পাখির ডাক। গলা ফাটিয়ে ডাকছে। কিন্তু কাকে ডাকছে তা জানি না। আমাকেও ডাকতে পারে। কারণ আমি বেশ কিছু সময় ধরে তাদের দেখা পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে ছিলাম ডুবা পুকুরের পাড়ে। তারা হয়তো ঝুপের ভিতরে কলমি পাতার আড়াল থেকে আমায় দেখছিল। কিন্তু আমি তাদের দেখিনি। চলে আসাতে হয়তো সেই শূন্যতার অনুভব করছে তারা। কিন্তু আমি তাদের ভাষা জানি না।

হযরত সুলায়মান (আঃ) পশু-পাখির ভাষা বুঝতেন। আল্লাহ তাঁকে সেই ক্ষমতা দিয়ে ছিলেন। তারা কি বলছে তা তিনি শুনতে পেতেন এবং বুঝতে পারতেন। তাদের সাথে কথাও বলতেন। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা প্রমাণ দিয়েছেন।

তিনি সূরা আন-নমল এর ১৬, ১৮ ও ১৯ আয়াতে বলেন-

১.অর্থ- সুলায়মান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘হে লোক সকল, আমাকে উড়ন্ত পক্ষীকূলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাকে সব কিছু দেয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব।’

২.অর্থ- যখন তারা পিপীলিকা অধ্যূষিত উপত্যকায় পৌঁছল, তখন এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকার দল, তোমারা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর। অন্যথায় সুলায়মান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পিষ্ট করে ফেলবে।

৩. অর্থ- তার কথা শুনে সুলায়মান মুচকি হাসলেন এবং বললেন, হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমাকে সামর্থ দাও যাতে আমি তোমার সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পছন্দনীয় সৎকর্ম করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মপরায়ন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর।

তাদের ভাষা যদি বুঝতাম তবে তাদের ডাকে আমি সাড়া দিতে পারতাম। তারা আমাকে না ডেকে তাদের কোন সদস্যকেও ডাকতে পারে। যেহেতু আমি তাদের ভাষা জানি না তাই তা বুঝার উপায় নাই। আমি তাদের ডাকে সাড়া না দিলেও তাদের কেউ না কেউ সাড়া দিবে নিশ্চয়।

সেই সাথে ব্যাঙ সাহেবরা তাদের ডাকে সারা দিল। ডাহুক পাখি একবার ডাকলে তারা সাড়া দেয় দুই বার। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে কিছু দুষ্টু প্রকৃতির ব্যাঙ এর ফাঁদে পরেছে পাখি গুলো। যেন একের পর এক ব্যঙ্গ করেই চলেছে।

এ স্বভাবটা মানুষের মাঝেও বিদ্যমান। তবে সবার ক্ষেত্রে না। আছে কিছু একরোখা মানুষের মাঝে। তাদের এই কাজটা শিশুদের মাঝে ফুটিয়ে তুলে খুব সুন্দর ভাবে এবং খুব মজা নেয়। যতক্ষণ পযর্ন্ত শিশুটি বিরক্ত না হবে অথবা কান্না না করবে ততক্ষণ পযর্ন্ত অনবরত ব্যঙ্গ করতেই থাকবে। দুষ্টু ব্যাঙ গুলো আজ পিছু নিয়েছে ডাহুক পাখির। বেশ কিছুক্ষণ শুনলাম কান পেতে। ভালই লাগছে তাদের খুনশুটি। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিপোকাও সেই সাথে তাল দিয়ে চলেছে। সব মিলিয়ে যেন একটা নতুন সুরের আঞ্জুমান বানিয়ে নিয়েছে।

রাত গভীর হতে চললো। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পরলাম। তারা তাদের কর্মযজ্ঞ চালিয়েই যাচ্ছে। তবে এক টানা নয় মাঝে মাঝে। হঠাৎ করে খুব জোর গলায় চেঁচিয়ে উঠে বড় শব্দ করে। শব্দ শুনে মনে হয় ডাহুক পাখির দলের কোন নেতা হবে।

মাঝ রাতে ঘুম ভাঙ্গল আমার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। প্রাকৃতিক কার্য শেষ করে। যথারীতি শুয়ে পরলাম। পাখি গুলোর ডাক কানে ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে খুব বিরক্তও লাগছে কারণ তাদের শব্দে এত রাতে ঘুম আসছে না। বেশ বিরক্ত লাগছে। আবার যখন বেশ কয়েকটা পাখি তাল রেখে ডাকতে থাকে তখন শুনতে ভাল লাগে। তাদের কলতান শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পরলাম বুঝতেই পারি নি।

লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম।


আরও পড়ুন