সাত জেলার হাওরের ৯৮ ভাগ ধান এখন কৃষকের ঘরে

দেশের সাত জেলার হাওরের ৯৮ ভাগ ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। আর দুইভাগ ধান ছিটেফোটা ভাবে রয়েছে। এ ধানগুলো কাটতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। এর পরই হাওরের শতভাগ ধান কৃষকের গোলায় উঠবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশা করছেন, দেশের হাওরবেষ্টিত সাত জেলায় বোরো ধানের উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণ হবে।

হাওরের ধান নিয়ে সরকার-কৃষক উভয়ই ছিল অত্যন্ত চিন্তিত। করোনা ও লকডাউনের কারণে বাইরের জেলা থেকে ধান কাটা শ্রমিক আসতে পারবে না। ফলের হাওরের ষোলআনা ধান কৃষকের গোলায় উঠবে কিনা, আবার আকস্মিক বন্যায় ধান পানিতে তলিয়ে যাবে ইত্যাদি ভাবনা এতদিন কৃষক ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কারণ হাওরের এই ধান দেশের মোট উৎপাদনের ২০ ভাগ। তবে হাওরের শতভাগ ধান কৃষকের গোলায় ওঠায় কৃষি মন্ত্রণালয় সফল। কারণ এ ধান কাটার জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক আনা এবং হাওরের বিভিন্ন জেলায় ধান কাটা মেশিন সরবরাহ সবই করেছে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। হাওরের ধান কৃষকের ঘরে তোলার জন্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের কর্মকর্তারা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন।

দুই বছর আগের চৈত্রের শেষের সময় ভারী বর্ষণে হাওরের বাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়েছিল কৃষকের সোনালী ফসল। বিনষ্ট হয়েছিল সব পাকা ও আধাপাকা ধান। ধান হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন হাওরের লাখ লাখ কৃষক। এবারও সেই শঙ্কা, সেই ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল তাদের।

সূত্র জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিচালন বাজেটের আওতায় হাওর অঞ্চলের (কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন ১৮০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার বরাদ্দ দেয়া হয়। হাওর অঞ্চলে ৩৬২টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১০৫৬টি রিপার সরবরাহ করা হয়। যে কারণে দ্রুত হাওরের ধান কাটা সম্পন্ন হয়।

নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলের কৃষক জব্বার মিয়া জানান, এবার হাওরের সব ধান ঘরে তুলেছি। ধান পাকার সময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্যারেরা বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে দিয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে হাওরের সবগুলো জেলায়। যে কারণে আমরা খুব দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। শুধু তাই নয়, ধান আগাম ঘরে আসায় ভালো দাম পেয়েছি।

কিশোরগঞ্জ ইটনা ধইলংয়ের কৃষক আমজাদ খান জানান, হাওরে ধান কাটা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম। যখন ধানের শীষ বের হয় তখন থেকে দিন গুণছিলাম কোন দিন এ ধান ঘরে তুলতে পারবো। অনেক রাত গেছে ঘুমাতে পারিনি। দুই বছর আগে বন্যায় ডুবে যাওয়া সেই দিনের কথা মনে পড়তো। এবার হাওরের ধান কাটার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাদের উদ্যোগের কারণেই আমরা দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পেরেছি।

হাওরের ধান কাটার বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাওরের ৯৮ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। বাকি যে দুই ভাগ ধান রয়েছে তা ছিটেফোটা ভাবে রয়েছে। এরমধ্যে কেউ স্থানীয় জাত লাগিয়েছে, কেউ উপসী আবার কেউ বোরো লাগিয়েছে দেরি করে। এ ধানগুলো কাটতে কৃষকের আরও সপ্তাহ খানেক সময় লাগবে।

এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, দেশের হাওরবেষ্টিত সাত জেলায় বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিকটন। যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২০ ভাগ। এবার ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। গতবার ধানে কিছু চিটা ছিল কিন্তু এবার ধানে চিটার পরিমাণ খুব কম। সে কারণে আশা করছি হাওরে এবার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণ হবে।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ রাশেদ ইফতেখার জাগো নিউজকে বলেন, শনিবার রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী হাওরে ৯৮ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি দুই ভাগ শুধু বোরো নয়, বিভিন্ন জাতের ধান। এগুলো তারা তাদের মতো করে ঘরে তুলবে। হাওরে ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন ধানের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণ হবে কিনা এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাওরের সাত জেলায় হাওর বাদেও বড় অংশের ধান কাটা এখনো বাকি। হাওরের বাইরের সমস্ত ধান কাটা হলে তখন বিষয়টি বলা যাবে। তবে হাওরে বোরো ধান হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৫০ মেট্রিকটন, উপসী ৩ দশমিক ৬০ মেট্রিকটন ও স্থানীয় পুরাতন জাত ২ দশমিক ২ মেট্রিকটন ফলন হয়েছে।


আরও পড়ুন