মানবিকতার নক্ষত্র বিরাজিত মনোবিশ্বে

গন্তব্য নিশ্চিত! ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই নিঃশব্দে সতত বহমান, ব্যতিক্রম শুধু স্থান-কাল-পাত্র। প্রাণ মাত্রই প্রয়াণ অনিবার্য। স্রষ্টা নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণের উন্মেষ ঘটান আবার দুরন্ত প্রাণকে করেন প্রাণহীন। ভূ-মণ্ডল, বায়ুমন্ডল, নভোমন্ডল সর্বত্রই মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী বিচরণ। অমরত্বের অদম্য স্পৃহা মানুষকে তাড়িত করে অবিরত। মানুষ হবে মানবিক সেটাই তো স্বাভাবিক। কখনো কখনো বিষন্ন বিবেকের দংশন আর মানবিক মূল্যবোধের অভাব মানুষ হিসেবে অপরাধী করে দেয় আমাদের।

সভ্যতার স্তরে স্তরে মৃত্যুর বিভীষিকা দেশে দেশে বিস্তৃত হয়েছে বিভিন্ন প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপটে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে কখনো কখনো অত্যাচারের প্রতিশোধ নিয়েছে প্রকৃতি। আবার ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, ক্ষমতা, ভোগবাদিতা, প্রতিপত্তির লোভে মত্ত মানুষের মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রিয় ভূখণ্ডে মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিসর্জন দিতে হয়েছে ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণ। কবি নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন –

‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না’

দেশের তরে মৃত্যু গৌরবের যা ব্যক্তিকে মহৎ থেকে মহত্ত্বর করে কিন্তু রোগে-শোকে পরাজিত মৃত্যু প্রিয়জন পরিজনদের ব্যথিত ও ভীতিত করে তোলে। অনেক আপনজন হয়ে উঠেন অপরিচিত দুর্জন!

মহামারি করোনাভাইরাসের বিধ্বংসী আগ্রাসনে মৃত্যুর মিছিল বেড়েছে জ্যামিতিক সমীকরণে। মানচিত্রের সীমানার প্রাচীর ভেঙে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধর্ম-অধর্ম- সব বিভাজনের বেড়াজাল ছিন্ন করে করোনার করাল গ্রাস বিস্তৃত বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তরে। প্রাণ চাঞ্চল্য হারিয়ে মানুষ স্থির আকাশ ও স্বপ্নের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রহর গণনা হচ্ছে ‘আঁখিতারা হতে’ অদৃশ্য এই আবর্জনা কখন মুছে গিয়ে কখন ‘পূণ্যস্নানে শূচি হবে ধরা’।

লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর ভীড়ে আমরা দেখছি অনেক জীবন্মৃত মানুষের মুখ! মৃত্যু যদি হয় জীবনের অনিবার্য পরিনতি তবে ভীতি থেকে মিলবে কি মুক্তি! এই উপলব্ধির অনুপস্থিতি কিংবা অতিমাত্রায় উপস্থিতি উভয়েই অশান্ত করে চিত্তের সমস্ত সুখ। বরং মৃত্যু আসার আগেই অনেকে মৃত্যুভয়ে নিজের ইমিউনিটি সিস্টেম দুর্বল করে রোগকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন শরীরে বাসা বাঁধতে। ক্ষুধামন্দা থেকে নিদ্রাহীনতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা টেনশন, হেডেক অনেকটাই নিত্য নৈমিত্তিক শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করছে। খিটখিটে মেজাজ, হতাশা, আবেগের অনিয়ন্ত্রণ, অসামাজিক আচরণ করে পরিবার ও পরিবেশে বাড়ছে অস্বস্তি ও অস্থিরতা।

ভাইরাস তাড়ানোর রাস্তা খুঁজতে গিয়ে ভুল ওষুধ খেয়ে নিজেই ধরা পড়ছে মৃত্যুজালে। শিশু কিশোরদের করোনা ভীতি দূর করার বিষয়ে বিশেষ মনোযোগী না হলে করোনা কাল শেষ হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বেজে যাবে ঘরে ঘরে। আত্মবিশ্বাসহীনতায় সংকট হবে প্রকট!

অকোষী এই ভাইরাসের আক্রমণে আবালবৃদ্ধবনিতা অকাতরে হারাচ্ছে প্রাণ। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতির অগ্রসর দেশ ইতালি, কানাডার রাষ্ট্রপ্রধানরাও করছেন অসহায় আত্মসমর্পন। বাঙালির আশা ভরসার বাতিঘর বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশরত্নের মতোই এই অমানিশায় শক্ত হাতে জাতির হাল ধরেছেন পরম মমতা আর ভালোবাসায়। দেখাচ্ছেন আলোর পথ।

সম্মুখ যোদ্ধারা আক্রান্ত ও মৃত্যুতেও কাজ করে যাচ্ছেন সুদৃঢ় চিত্তে। জাতির এই সংকটে অনেক স্বার্থহীন মানুষ এগিয়ে এসেছেন নিতান্তই বিবেকের টানে। বাড়িয়েছেন সাহায্যের হাত। নীরবে পৌঁছে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রী। ভিক্ষুক নজিমউদ্দিন দুই বছরে ভিক্ষা করে জমানো তার ভাঙা বসতঘর মেরামতের দশ হাজার টাকা দিয়েছেন সরকারি সহায়তা তহবিলে করোনায় দেশের মানুষের কষ্টের কথা ভেবে। এই প্রজন্মের শিক্ষার্থী তিলোত্তমা শিকদার নিজেই ইফতার তৈরি করে পৌঁছে দিচ্ছেন রোজাদারদের মুখে। অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশের এই প্রতিচ্ছবি আমাদের গর্বিত আশান্বিত করে।

আবার এর বিপরীত অনেক চিত্রই মানুষ হিসেবে আমাদের করে লজ্জিত। করোনা সন্দেহে রাতের অন্ধকারে মমতাময়ী মাকে নিজের সন্তান রাতের আঁধারে ফেলে যায় জঙ্গলে! আরোগ্যের বাসনায় হাসপাতালে আশ্রয় নেয়া মুমূর্ষ রোগীর শুশ্রূষা শেষে সেবাদাতাদের কেউ কেউ আপন ঠিকানায় এসে পাচ্ছেন অবিবেচকদের অপ্রত্যাশিত উপহার, বাড়ি ছাড়ার নোটিশ!

করোনাকে খোদার অভিশাপ মনে করে কুসংস্কারচ্ছন্ন কূপমুন্ডক অনেকেই করোনাক্রান্ত পরিবারকে করতে চায় সমাজ বিচ্যুত। অথচ নিজেই জানে না তার অদূর আগামী! কারো কারো চাল, তেল, লবণ আত্মসাতেও নেই আত্মার আর্তি!

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক নির্মম বাস্তবতাতেও দেখি কিছু মানুষের মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়? কবিতায়, উপমায় শকুনকে আমরা গালি দেই অথচ এর চেয়েও কি জঘন্য নয় কিছু মানুষের এই অমানবিক আচরণ! মনুষ্যত্বের মৃত্যু মানুষের হৃদয়কে রক্তাক্ত ও বিক্ষত করে। মানুষের মৃত্যু হলে তার দেহ ও আত্মার স্থানান্তর হয় আর মানবতার মৃত্যু জলে-স্থলে, আকাশে-বাতাসে সর্বত্র মানবিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। মানবিকতার মৃত্যুর বিষবাষ্পে বিধ্বস্ত হয় প্রজন্মের প্রগতির ও উন্নতির ধারা। মানবিক সত্তার মৃত্যু কখনোই কারো কাম্য নয়।

এই ভূলোকে আর কোন মানবিক মূল্যবোধের মৃত্যু না ঘটুক। গগন বিস্তৃত নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি জ্বলুক সবার হৃদয়াকাশে ও মনোবিশ্বে। সেই নক্ষত্রের নাম হোক মানবিকতা। ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গানের সুর ও কথা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠুক প্রতিটি মানুষের যাপিত জীবনে। ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে।’

লেখক : তানভীর সালেহীন ইমন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কুমিল্লা।


আরও পড়ুন