বে ক্রস ড্যাম হতে পারে বাংলাদেশের মুক্তির পথ!

একটা প্রশ্ন সবাই করে থাকেন যে বাংলাদেশ কি সত্যিই সমুদ্রগর্ভে বিলীন হতে চলেছে?

আলোচনার শুরুতেই জেনে রাখি, বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে বড় ব-দ্বীপ। গঙ্গা, অববাহিকায় যমুনা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র নদী হাজার বছর ধরে সমুদ্রে পলি জমিয়ে পৃথিবীর সব থেকে উর্বর এই ভুখন্ডের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ২/৩ অংশ এই ব-দ্বীপ। পশ্চিম বঙ্গের কিছু এলাকা নিয়ে বাকিটা। সুদূর ভুটান, নেপাল, হিমালয় থেকে নদীগুলা উৎপন্ন হয়ে পথে প্রায় ১,০০,০০,০০,০০০ (১ বিলিয়ন) মেট্রিক টন পলি বা সেডিমেন্ট বয়ে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলতেছে। যার বেশিরভাগ পলি মহীসোপান পার হয়ে গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যায়।

মহীসোপান হল উপকুল থেকে স্লোপের মত গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত অগভির অংশ। বলা বাহুল্য, বিশ্বে সব থেকে বিস্তৃত এবং দীর্ঘ অগভির মহীসোপান হল বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর জুড়ে। এর গভীরতা কোথাও ২০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার বা তার একটু বেশী এবং উপকূল থেকে প্রায় ২০০ কি.মি. এর বেশি পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতি বছর সমুদ্রে আমাদের মহীসোপান প্রায় ১৫ মিটার করে বাড়তেছে।

আমরা নদী ভাঙ্গনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০০ বর্গ কিমি করে জায়গা হারায়। আর ভুটান, নেপাল, ভারত থেকে বয়ে আনা পলি বা সেডিমেন্ট এর সাথে এই ১০০ বর্গ কিমি যুক্ত হয়ে প্রতি বছর প্রায় ১২০ বর্গ কিমি করে জায়গা নতুন ভাবে যুক্ত হচ্ছে। নিত্য নতুন দ্বীপ জেগে উঠতেছে বঙ্গোপসাগরে। কোন কোন দ্বীপ স্থায়ী কাঠামো পেয়েছে। এটুকু থেকেই বোঝা যায় সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে বাংলাদেশ যে একদম ভেসে যাবে পানিতে ধারনাটা ঠিক নয়। অন্তত সব স্থানে এটা সত্য নয়। এই আলোচনাটুকু আমাদের মুল আলোচনার জন্য প্রয়োজন।

আমরা যদি মুল নদীগুলার প্রাবাহ বাধাগ্রস্থ না করে সাতক্ষীরা উপকূল থেকে মহীসোপানের গভীরে যেয়ে ছোট ছোট অন্তরায় বা বাধ তৈরি করে (অস্থায়ীভাবে) মেঘনা পর্যন্ত নিতে পারি, তবে পানিতে থাকা পলি বা সেডিমেন্টের গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে অনেকটা নিয়ন্ত্রিতভাবে অসংখ্য দ্বীপ তৈরি করতে পারি। এটা করতে পারলে প্রায় ২৫০০০ বর্গ মাইল ভূমি মুল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করা সম্ভব। সাথে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মুক্ত থাকা যাবে। আর পলি যুক্ত জমি উর্বর আর চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত হয়।

আমাদের ডেল্টা প্লান ২১০০ এর সাথে সমন্বয় করে যদি এভাবে সাগরে পলি জমিয়ে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরির জন্য গবেষনা করে এরকম ৫০০ পয়েন্ট চিহ্নিত করা যায় সেটাও কম নয়। এখানে মনে রাখতে হবে মোহনার মূল প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা যাবেনা।

বাঁধ বা অন্তরায় তৈরি করতে যে খুব বেশী খরচ হবে তা নয়। উদ্দেশ্য পলি আটকানো। তাই কোন জালের সাথে পরিত্যাক্ত বোতল গুলা বেধে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে (Dumping) এটা করা যেতে পারে। এতে খরচ অনেক কমবে সাথে সেডিমেন্টগুলা ফিল্টার হয়ে আটকে থাকবে। ভবিষ্যতে এই অন্তরায়ে পলি গুলি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে জমতে শুরু করবে। স্থায়ী রুপ পাবে আস্তে আস্তে। পুরা বিষয়টা করতে হবে পরিকল্পিত ভাবে যেন নদীগুলার মুল প্রবাহ ঠিক থাকে। আর এক্ষেত্রে এটি সল্পমেয়াদী পরিকল্পনাও নয় বরং দীর্ঘ বছর ধরে আস্তে আস্তে আমরা বঙ্গোপসাগরে জমা হউয়া পলিকে নিয়ন্ত্রন করে নতুন দ্বীপ গঠনের পক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারি।

এতে সুবিধা কি?

প্রথম সুবিধা হল উপকূলে পলি জমার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে এই অঞ্চলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাবে ডুবে যাওয়ার ঝুকি কমবে। বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে আমাদের ভূখন্ড পানির নিচে চলে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

উর্বর পলিযুক্ত নতুন ভূমি আমাদের কৃষি জমি, বনভূমি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে। সেই সাথে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামলানো সহজ হবে।

বিশ্বে অনেক দেশ রয়েছে যাদের ভূমির উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা থেকে বেশি নয়। নেদারল্যান্ডস এর মত দেশ ডেল্টা প্লানের মাধ্যমে তাদের দেশকে টিকিয়ে রেখেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বিলিয়ন ডলার খরচ করে মাটি বা বালি এনে সমুদ্রে কৃত্রিম দ্বীপ করেছে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ভাবে মাটি বা বালি দিয়ে ভরাট করা লাগবে না। প্রাকৃতিক ভাবেই এদেশের নদী গুলি প্রচুর পলি বহন করে। নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সুপরিকল্পিত ভাবে পলি গুলিকে নিয়ন্ত্রিত স্থিতি দিলেই হয়ত আমাদের দেশের সামনে বিশাল সুযোগ আসতে পারে।

সূত্র – ডিফেন্স রিসার্চ


আরও পড়ুন