সিলেটে বোমাতঙ্ক : ২২ ঘন্টার অভিযানে মিললো ‘গ্রাইন্ডিং মেশিন’

বুধবার বিকাল ছয়টা। সিলেটের চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাছে পুলিশ চেকপোস্টে মোটরসাইকেল রেখে চশমা কিনতে যান ট্রাফিক সাজেন্ট চয়ন নাইডু। সাড়ে ছয়টায় ফিরে এসে দেখেন মোটরসাইকেলে পাদানির কাছে লাল রঙের একটি বস্তু বাঁধা। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন তিনি। পুলিশ এসে জায়গাটি ঘিরে ফেললে পুলিশের গাড়িতে বোমা পাওয়া গেছে- এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জিন্দাবাজার চৌহাট্টা সড়ক বন্ধ করে দিয়ে মোটরসাইকেল ও আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। ঘটনাস্থলে আসেন গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব ও ক্রাইম রেসপন্স টিমের সদস্যরা।

যতই সময় যায় পরিবেশ ততই থমথমে হতে থাকে। র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল বস্তুটি অপসারণ করবে বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে তথ্য দেওয়া হলেও একসময় জানানো হয়- র‌্যাব অভিযান চালাচ্ছে না। এর পর শুরু হয় গণমাধ্যমকর্মী ও কৌতূহলি মানুষের রাতজাগা। গভীর রাতে জানানো হয়- ভোরের দিকে সেনাবাহিনীর দল আসবে বস্তুটি অপসারণে। একটি ছোটো ডিভাইস অপসারণে সময়ক্ষেপণে উপস্থিত জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়।

ঘটনাস্থলটি চৌরাস্তার মোড় এবং সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। উপরন্তু এই মোড়ে সরকারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নতমানের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরাও তাক করা; কিন্তু সারারাত কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

বৃহস্পতিবার ভোর থেকে আবার অপেক্ষা ও উৎকণ্ঠার পর দুপুরে বন্ধ করে দেওয়া হয় চৌহাট্টাগামী চারটি প্রধান সড়কই। এতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন সিলেটের প্রধান হাসাপাতাল ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ও প্রধান করোনা আইসোলেসন সেন্টার শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালগামী মানুষ। প্রায় বিশ ঘণ্টা সড়ক আটকে রেখেও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল না আসায় ক্ষোভ দেখা যায় সিলেটের সচেতন মহলে।

সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জঙ্গি নাশকতা প্রতিরোধে র‌্যাব-পুলিশ কতটা প্রস্তুত তা নিয়েও প্রশ্ন করেন অনেকে। জানা যায়, সিলেট মহানগর পুলিশে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট না থাকায় খবর পাঠানো হয় ঢাকায়। পুলিশের সদর দপ্তর থেকে চৌহাট্টা পয়েন্টে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ও বোমা ধ্বংসকরণ টিম পাঠাতে অনুরোধ জানানো হয় সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরকে। সেনা সদর দপ্তর নির্দেশনা পাঠায় সিলেটস্থ ১৭ পদাতিক ডিভিশনকে।

এ ডিভিশনের বোমা বিশেষজ্ঞ লে. কর্নেল রাহাত, লে. কর্নেল খালেদ, ক্যাপ্টেন নূর, ক্যাপ্টেন গালিবসহ একটি টিম বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শুরু করেন তাদের অভিযান।

অভিযান শেষে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়- মোটরসাইকেলে থাকা বস্তুটি কোনো বোমা নয়, নিছক একটি গ্র্যাইন্ডিং মেশিন (টাইলস বা রড কাটার যন্ত্রবিশেষ)।

সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের বোমা ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ লে. কর্নেল রাহাত বলেন, সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা পেয়ে সিলেটে থাকা ১৭ পদাতিক ডিভিশনের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ও বোমা ধ্বংসকরণ টিম আমাদের পদ্ধতি অবলম্বন করে বস্তুটি অপসারণ করেছি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এটা একটা গ্র্যাইন্ডিং মেশিন; কিন্তু অধিকতর তদন্তের জন্য এবং এখানে যাতে অন্য ধরনের সন্দেহজনক বস্তু না থাকে- এটা নিশ্চিত করতে আমাদের নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করেছি এবং আরও নিশ্চিত হতে আমরা এটাকে খুলেছি।

লে. কর্নেল রাহাত আরও বলেন, হতে পারে ভুলবশত অথবা হতে পারে কেউ এটা পুলিশ সদস্যের গাড়িতে রেখে একটা আতঙ্ক ছড়াতে চেয়েছিল।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, কেউ ভুলবশত গ্র্যাইন্ডিং মেশিনটা এখানে রেখে যেতে পারেন। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি, সরকারি গাড়ি, তাই আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য বা জনমনে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টির লক্ষ্যে হয়তো কেউ রেখে থাকতে পারেন। আমরা আশপাশের সিসি টিভির ফুটেজ দেখছি। এ নিয়ে তদন্ত চলছে।


আরও পড়ুন