কুলিয়ারচর - October 21, 2020

কুলিয়ারচরে কামাল হত্যার রহস্য উদঘাটন

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে কামাল হোসেন হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বুধবার (২১ অক্টোবর) পিবিআই এর পক্ষ থেকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর অজ্ঞাতনামা হিসেবে কামাল হোসেনের লাশ উপজেলার পূর্ব ফরিদপুর সাকিনস্থ ব্রহ্মপুত্র নদী সংলগ্ন পতিত জমিতে তাল গাছের নীচে থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ বিষয়ে কুলিয়ারচর থানায় মামলা রুজু হয়। পরে ৬ই অক্টোবর এ মামলা তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই। মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক মো. আজাদ হোসেন।

মৃত দেহের আঘাতের ধরণ ও পরিধেয় বস্ত্রে বণর্না : মৃত দেহের মাথার সামনে ডান পাশে গুরুতর কাঁটা ও থেতলানো আঘাত, ডান চোখের উপরে ও নিচে ধারালো অস্ত্রের আঘাত, কপালের ডান পাশে ধারালো অস্ত্রের আঘাত, মুখের উপরের ও নিচের পাটির দাঁত ভাঙ্গা, বাম চোখের উপরে এবং নাভীর উপরে ও নিচে চামড়া ছিলা জখম। বাম হাতের লম্বালম্বি ভাবে পাঁচ আঙ্গুল কাটা ও বিচ্ছিন্ন। একাধিক আঘাতের কারণে ভিকটিম এর লাশের মুখ মন্ডল বিকৃত হওয়ায় প্রকৃত চেহেরা নিরপন করা সম্বব হয় নাই। ভিকটিমের লাশের গায়ে সাদা রং এর স্যান্ডু গেঞ্চি, পড়নের নিল রং এর জিন্সের প্যান্ট ও কালো বেল্ট ছিল। ঘটনাস্থলে ভিকটিমের এক জোড়া চামড়ার জুতা পাওয়া যায়।

পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলার ক্রাইমসীন ইউনিটের ঘটনাস্থল পরিদর্শন : হত্যার সংবাদ কুলিয়ারচর থানার ডিউটি অফিসার থেকে প্রাপ্ত হয়ে এসআই (নিঃ) মোঃ শাহীন আলমের নেতৃত্বে পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলায় ক্রাইমসিন ইউনিট হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ফিংগার প্রিন্ট এর মাধ্যমে অজ্ঞাত লাশ সনাক্ত করণের চেষ্টা করে। কিন্তু লাশের বাম হাতের ৫টি আঙ্গুল অজ্ঞাতনামা আসামীরা কেটে ফেলায় ফিংগার প্রিন্ট করা সম্ভব হয়নি। ফলে লাশটির প্রকৃত পরিচয় সনাক্ত করণ সম্ভব হয়নি।

পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলার কার্যক্রম : হত্যাকান্ড সংঘটনের পর হতে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে অজ্ঞাতনামা ভিকটিম ও অজ্ঞাত নামা আসামীদের সনাক্তকরণ সহ মামলাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা ছায়া তদন্ত অব্যাহত রাখে।

পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলায় মামলা হস্তান্তর : পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স এর নির্দেশে পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা গত ইং ০৬/১০/২০২০ তারিখে মামলার তদন্তভার গ্রহন করে। পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মোহাম্মদ আজাদ হোসেন উক্ত মামলাটি তদন্ত করেন।

মৃত ভিকটিম সনাক্তকরন : গত ১৮/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ জৈনক হারুনুর রশিদ মামলার ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী কুলিয়ারচর থানাধীন হাপানিয়া গ্রামের খোকন খান(৪২), পিতা- মৃত হিরু খান এর নিকট আসে। খোকন খানকে দেখে হারুন অর রশিদ তার ভাতিজা কামাল হোসেন এর অবস্থান জানতে চাইলে খোকন অসংলগ্ন কথা বার্তা বলায় তিনি কুলিয়ারচর থানায় যান। কুলিয়ারচর থানা পুলিশ গত ০৪/০৯/২০২০ তারিখে উদ্ধারকৃত মৃত অজ্ঞাত লাশের তোলা ছবি দেখাইলে পড়নের প্যান্ট, জুতা, বেল্ট ও শারিরীক গঠন দেখে জনাব হারুনুর রশিদ উক্ত মৃত দেহ তার ভাতিজা কামাল হোসেন (৩০), পিতা-মৃত ছিদিাদক আলী পাঠান, সাং-খূরুমখালী, থানা- ফরিদগঞ্জ, জেলা- চাঁদপুর বলিয়া সনাক্ত করে। মামলাটি পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা তদন্ত করছে মর্মে কুলিয়ারচর থানা পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারে।

প্রযুক্তিগত সহায়তা : গত ১৮/১০/২০২০ ভিকটিমের চাচা মোঃ হারুনুর রশিদ ভিকটিম কামাল হোসেনকে সনাক্ত করে পিবিআই কিশোরগঞ্জ অফিসে আসে। পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা ভিকটিমের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ভিকটিম কামাল হোসেনকে হত্যার সাথে জড়িত গ্রুপ সনাক্ত করে।

আসামী গ্রেফতার ও বিজ্ঞ আদালতে দোষ স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি : গত ১৯/১০/২০২০ খ্রিঃ পিবিআই পুলিশ পরিদর্শক মোঃ আজাদ হোসেন সংগীয় ফোর্স নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। হত্যা মামলার সন্ধিগ্ধ আসামী সুমন বিশ্বাস (৩০), পিতা- মৃত শচিন্দ্র বিশ্বাস, মাতা- সনজলা রানী বিশ্বাস, সাং- হাপানিয়া, থানা- কুরিয়ারচর কিশোরগঞ্জকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে আসামী ভিকটিম হত্যার সাথে জড়িত বিষয়টি স্বীকার করে এবং স্বেচ্ছায় ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃকাঃবিঃ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করে।

উদঘাটিত তথ্য : ভিকটিম কামাল হোসেন ও আসামী খোকন খান মালয়েশিয়া থাকাকালীন সময়ে পরস্পরের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের বন্ধুত্ব উভয় পরিবারের মধ্যে পারিবারিক বন্ধুত্বের রূপ নেয়। খোকন একাধিক বার চাদপুরে ভিকটিম কামালদের বাড়ীতে গিয়ে বেড়িয়ে আসে। ০৫ বছর পূর্বে খোকন খান মালয়েশিয়া হতে বাংলাদেশে ফিরলেও ভিকটিম কামাল হোসেন মালয়েশিয়া থেকে যায়। বাংলাদেশে এসেও আসামী খোকন খান ভিকটিম কামালের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। ভিকটিম কামাল হোসেনকে আসামী খোকন খান বিভিন্ন ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া হতে ব্যাংক এর মাধ্যমে ও দেশে ভিকটিমের পরিবার হতে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমান অর্থ (প্রায় এক কোটি বিশ লক্ষ টাকা) আনয়ন করে। ভিকটিম কামাল হোসেন মালয়েশিয়া থেকে দেশে এসে আসামী খোকন খান এর নিকট তার ও তার পরিবারের প্রেরিত বিপুল অংকের টাকার হিসাব চায়। আসামী খোকন খান টাকা পয়সার হিসাব দিতে গড়িমসি করতে থাকে। ভিকটিম ক্রমাগত ভাবে আসামী খোকন খান থেকে বিপুল টাকা পয়সার হিসাব চাওয়ায় পরিশেষে আসামী খোকন খান হিসাব দিতে রাজি হয়ে ভিকটিম কামাল হোসেনকে কুলিয়ারচর আসতে বলে। ভিকটিম কামাল হোসেন বিষয়টি তার পরিবারের সদস্যদের অবগত করে গত ০৩/০৯/২০২০ তারিখ ঘটনাস্থল এলাকায় খোকন খানের উদ্দেশ্যে ঢাকা হয়ে নরসিংদী জেলার মরজাল নামক বাস স্ট্যান্ডে পৌছে। পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক আসামী খোকন খান কয়েকজন আসামীদের নিয়ে মরজাল বাস স্ট্যান্ড হতে ভিকটিম কামাল হোসেনকে রিসিভ করে সিএনজি যোগে ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী ফরিদপুর স্লুইচ গেইটে পৌঁছে। খোকন খান তার আর্থিক দায় এড়ানোর উদ্দেশ্যে তার প্রতিবেশী ও ব্যবসায়ী পার্টনার সুমন বিশ্বাস সহ আরো কয়েকজন আসামী নিয়ে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঘটনাস্থলে ভিকটিমকে নৃশংসভাবে খুন করে এবং লাশ সনাক্ত যাতে না হয় মুখমন্ডল বিকৃত করে বাম হাতের ৫টি আঙ্গুল কেটে ফেলে। উক্ত আসামীরা ভিকটিম কামাল হোসেনকে খুন করে তার সাথে থাকা মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও ভিকটিমের গায়ের শার্ট খুলে ব্রহ্মপুত্র নদীতে ফেলে দেয়। তদন্তে উদঘাটিত পলাতক আসামীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।


আরও পড়ুন