কটিয়াদী - December 5, 2020

কটিয়াদীতে নূরুন্নাহার হত্যার রহস্য উদঘাটন

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর নূরুন্নাহার হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও একমাত্র আসামি তার কথিত প্রেমিক রুবেল আহমেদ (৪৪) কে গ্রেফতার করেছে পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা ইউনিট।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ নভেম্বর (শুক্রবার) নূরুন্নাহারের (২৬) মরদেহ কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের জর্জ ইন্সস্টিটিউশনের পাশের একটি ধান ক্ষেতে পাওয়া গেলে নিহত নূরুন্নাহারের বড়ভাই জয়নাল আবেদীন গত ১৬ নভেম্বর তারিখে কটিয়াদী মডেল থানায় উপস্থিত হয়ে অফিসার ইনচার্জ বরাবর এই মর্মে অভিযোগ দায়ের করেন যে তার আপন ছোট বোন নুরুন্নাহার গত ৫ মাস আগে থেকে করিমগঞ্জ থানাধীন জনৈক রুবেল এর তত্তাবধানে থাকিয়া সেলাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। গত ১৩ নভেম্বর তারিখ বিকাল আনুমানিক ৪ টার দিকে ভিকটিম নূরুন্নাহার তার একমাত্র ছেলে  আড়াই বছরের দুহাই কে তার ছোট বোন শামসুন্নাহার এর নিকট রেখে ময়মনসিংহে তার উকিল বাবা কে দেখতে যাবেন বলে বাসা থেকে বের হন।
গত ১৪ নভম্বের সন্ধ্যা অনুমান ৬ টার দিকে বাদী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জানতে পারেন তার বোন নূরুন্নাহারের লাশ কটিয়াদী থানা পুলিশ কটিয়াদী মডেল থানাধীন আচমিতা সাকিনস্থ জর্জ  ইনন্সিটিউশন এর আনুমানিক ২০০ গজ পূর্ব দিকে জনৈক হাসান এর মায়ের ধান ক্ষেত থকেে উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
মামলার আর্জিতে বাদী আরো উল্লেখ করেন গত ১৩ নভম্বের রাত আনুমানিক ৮ টা থেকে ১৪ নভেম্বর দুপুর দেড়টার মধ্যে অজ্ঞাতনামা আসামীগণ পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তার বোন নূরুন্নাহারকে গলায় রশি বা কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করেছে। বাদীর এই আবেদনের প্রেক্ষিতে কটিয়াদী থানার অফিসার ইনচার্জ মামলাটি গ্রহণ করে পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মো. আনোয়ার হোসেনের উপর এর তদন্তের দায়িত্ব দেন ।

এদিকে নূরুন্নাহারের মরদেহ পাওয়ার খবর পেয়ে গত ১৪ নভেম্বর পিবিআই, কিশোরগঞ্জ জেলার ক্রাইম সীন ইউনিট হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ফিংগার প্রিন্ট এর মাধ্যমে অজ্ঞাত লাশের পরিচয় উদঘাটন করে কটিয়াদী থানা পুলিশকে অবগত করে। ঘটনার শুরু থেকে পিবিআই, কিশোরগঞ্জ কর্তৃক ছায়া তদন্ত অব্যাহত থাকে।পরে গত ১৮ নভেম্বর হত্যা মামলাটির তদন্তভার পিবিআইকে দেয়া হলে তারা তদন্তে তৎপর হয়।

সেই মামলার সূত্র ধরে তদন্ত করে পিবিআই জানতে পারে যে, রুবেল বিবাহিত এবং তার দুটি ছেলে এবং একটি মেয়ে সন্তান আছে। তিনি করিমগঞ্জ উপজেলার নয়াকান্দি এলাকার আ. হামিদের ছেলে। ঘটনার আনুমানিক বছর খানিক পূর্বে আসামী রুবেল তার চাচী শাশুরী ময়না বেগমের বাড়িতে যান। তখন চাচী শাশুরী আসামী রুবেল আহম্মেদকে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই বাড়িতে আসামী রুবেল আহম্মেদ এর সাথে ভিকটিম নুরুন্নাহারের পরিচয় হয়। ভিকটিম নুরুন্নাহার আসামী রুবেলকে মামা এবং উক্ত আসামী ভিকটিমকে খালাম্মা বলে সম্বোধন করতেন। পরিচয় পর্বে দুই জন দুইজনের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে আসামী রুবেল এবং ভিকটিম নুরুন্নাহারের মধ্যে প্রায়ই কথা হতো। এর কয়েকদিন পর ভিকটিম নুরুন্নাহার রুবেলের মোবাইলে ফোন দিয়ে বলেন তিনি ঢাকায় গামেন্টসে কাজ করতেন, করোনার কারনে সেখানে তার কোন কাজ কর্ম নাই। তাই তার কাছে তিনি সেলাইয়ের কাজ শিখতে চান। ভিকটিম নুরুন্নাহারকে রুবেল সেলাই কাজ শেখানোর কথা বলে করিমগঞ্জ পৌরসভার বেপারী পাড়া (কলু পাড়া) রেনু মিয়ার বাসায় এক হাজার সাতশত টাকায় ভাড়া বাসা ঠিক করে দেন এবং সেলাই কাজ করার জন্য রুবেলের বাসা থেকে একটি বাটারফ্লাই সেলাই মেশিনও এনে দেন।
প্রায় সময়ই রুবেল ভিকটিম নুরুন্নাহারের বাসায় আসা যাওয়া করতেন। রুবেল নুরুন্নাহারকে প্রায়ই কাপড় চোপড় কিনে দিতনে এবং বাজার সদাই করে দিতেন। রুবেল প্রায় সময় নুরুন্নাহারের বাসায় খাওয়া দাওয়া করতেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক হয় এবং তারা দুইজন পরকিয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার শারীরিক সম্পর্ক হয়। এই সম্পর্কের খাতিরে রুবেল ভিকটিম নুরুন্নাহারকে কাপড়ের দোকান দিয়ে দেবে বলে তার নিকট থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় তিন লাখ টাকা কৌশলে হাতিয়ে নেন। রুবেলকে ভিকটিম নুরুন্নাহার তার পাওনা টাকা ফেরৎ দেওয়ার জন্য কিংবা বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে রুবেল ঘটনার দিন গত ১৩ নভম্বের অত্যন্ত কৌশলে বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে ভিকটিম নুরুন্নাহারের একমাত্র ছেলে দুহাই(২.৫)কে তার ছোট বোন শামছুন্নাহারের কাছে রেখে দিয়ে তারা দুজন কিশোরগঞ্জ থেকে আলাদা আলাদা ভাবে কটিয়াদি বাস স্ট্যান্ড গিয়ে একত্রিত হয়ে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। তারা দু’জন সারাদিন কটিয়াদি এবং বাজিতপুর উপজলোর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে রাত অনুমান ১০/১১ টার দিকে রুবেল ভিকটিম নুরুন্নাহারকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঘটনাস্থলে নিয়া যান। এক পর্যায়ে রুবেল তার মুখ চেপে ধরে ভিকটিমের সাথে থাকা নতুন শাড়ী দিয়ে ভিকটিম নুরুন্নাহারের গলায় পেচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন এবং লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে পাশের ধান ক্ষেতে ফেলিয়া দিয়া পালিয়ে যান।
এদিকে মামলাটি তদন্ত করে পিবিআই আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে বুধবার ( ২ ডিসেম্বর) গাজীপুর জেলার টঙ্গী থানার দেওড়া এলাকা থেকে সন্দেহভাজন আসামি রুবেল আহমেদকে গ্রেফতার করে। ব্যাপক জেরার মুখে তিনি হত্যার ঘটনাটি স্বীকার করেন। পরে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মো. জামির হোসেন জিয়া বৃহস্পতিবার ( ৩ ডিসেম্বর) সন্দেহভাজন আসামি রুবেল আহমেদকে আদালতে হাজির করলে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন।

আরও পড়ুন