আমার চোখে শেষ দেখা ‘বঙ্গবন্ধু’ : মুক্তিযোদ্ধা নিছার আহমদ

বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পাইপ টানতে টানতে আমার দিকে তাকিয়ে দরাজ কণ্ঠে বলেন, "এই ছোকড়াটা কে রে?"

মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের শেষার্ধে একটি সরকারি চাকুরিতে যোগদান করি। ১৯৭৪ সালের শেষার্ধে সরকার বিভাগটি বিলুপ্ত ঘোষণা করায় আমি চাকরি হারাই। তাই কয়েকমাস বেকার থাকা অবস্থায় সরকারের একটি বিভাগে চাকরির বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার পর আবেদন করি। কিন্তু পদ মাত্র ৩টি হওয়ায় আবেদনকারী বেশি থাকায় সংশ্লিষ্ট জেলা কর্মকর্তার নিকট চাকরির বিষয়ে জানতে চাইলে উপর মহলের সুপারিশের পরামর্শ দেন এবং বলেন আগামী ১০ই জুন ১৯৭৫ ইং আমি ঢাকা বিভাগীয় অফিসে কনফারেন্সে যোগদান করবো। একটি টেলিফোন নাম্বার দিয়ে তিনি বলেন, কনফারেন্স চলাকালীন সময়ের মধ্যে বিভাগীয় কর্মকর্তার অফিসে টেলিফোনে সুপারিশ করতে পারলে চাকরির নিশ্চয়তা হবে।

৯ই জুন ১৯৭৫ ইং, কিশোরগঞ্জ থেকে আমি সকালে রওনা হয়ে ট্রেনে বিকেলে ঢাকায় পৌছাই এবং কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারে আমার বড় বোনের বাসায় উঠি। ঐ কোয়ার্টারের দ্বিতীয় তলায় থাকেন আমার গ্রামের মফিজ ড্রাইভার। তিনি বঙ্গবন্ধুর সচিব শেখ আলাউল হকের গাড়ি চালক। মফিজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার ব্যাপারে বিস্তারিত কথা বলি। তিনি বলেন, তোর বাপ আমাকে ঢাকায় এনে কৃষি ফার্মে চাকরি দিয়েছিল। দেখি চেষ্টা করে এবার ঋণ পরিশোধ করতে পারি কিনা। তিনি আমাকে বলেন, পরদিন ভোর ৬ টার সময় নিচে আমার গাড়ির কাছাকাছি অপেক্ষা করবি।

তারপর তিনি ভোরে আমাকে নিয়ে গাড়িতে করে মিন্টু রোডের সচিব শেখ আলাউল হকের বাসায় যান। সচিব সাহেব গাড়িতে উঠার সময় জিজ্ঞেস করলে মফিজ ভাই আমাকে মুক্তিযোদ্ধা ও চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন এবং আমার চাকরির সুপারিশের ব্যাপারে বিস্তারিত বলেন। অত:পর গাড়ি নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যান। মূলত সচিব আলাউল হক সাহেব বঙ্গবন্ধুর প্রটোকলের দায়িত্বে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে আসার পর সচিব সাহেব আমাকে বঙ্গবন্ধু যে সিড়ি দিয়ে নামবেন তার কাছাকাছি দাড়িয়ে থাকতে বলেন। কিছুক্ষনের মধ্যেই সকাল ৮ টার কিছু পুর্বে বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পাইপ টানতে টানতে নিচে নেমেই আমার দিকে চোখ পরে এবং দরাজ কণ্ঠে বলেন, “এই ছোকড়াটা কে রে?” (এর আগে বঙ্গবন্ধুকে কয়েকবার দেখেছি কিন্তু এতো কাছ থেকে দেখিনি) আমি নিরব দাড়িয়েছিলাম। তখন সচিব শেখ আলাউল হক সাহেব আমার কাছে এসে বঙ্গবন্ধুকে বলেন, সে কিশোরগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা। চাকরি থেকে ছাটাই হওয়ায় নতুন চাকরির আবেদন করে সুপারিশের জন্য আসছে। তাৎক্ষনিক বঙ্গবন্ধু পাইপ দিয়ে একটি ইশারা করেন এবং গার্ড অব অনার নিয়ে গাড়িতে চড়ে গণভবনের দিকে রওনা দেন। আমাদের গাড়িও উনার পিছনে গণভবনের দিকে রওনা দেয়।

গণভবনে পৌঁছে বঙ্গবন্ধুর পিছনে সচিব আলাউল হক এবং তার পছনে আমি দোতলা পর্যন্ত গিয়ে সচিবের রুমে প্রবেশ করি। বঙ্গবন্ধু তার একটু উপরে (প্রায় আড়াই তলায়) নিজ কক্ষে চলে যান। রুমে ঢুকে সচিব শেখ আলাউল হক আমাকে জিজ্ঞেস করেন সুপারিশ করার জন্য কোন নাম্বার আছে কিনা। তখন আমি নিয়োগ কর্মকর্তা ঢাকা বিভাগীয় উপ-পরিচালক মুনসুর সরকার সাহেবের টেলিফোন নাম্বার দেই। তাৎক্ষনিক তিনি ফোন করে বলেন, আপনার এখানে চাকরির আবেদন করেছে কিশোরগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা নিছার আহমদ। তার চাকরি নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ করছি যা সয়ং বঙ্গবন্ধুর নলেজে আছে। সুপারিশের পর আমি ঢাকা বিভাগীয় অফিসে এসে কনফারেন্স রুমের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা অবস্থায় কনফারেন্স থেকে বেরিয়ে কিশোরগঞ্জের সেই জেলা কর্মকর্তা আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরেন এবং আমাকে চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে কিশোরগঞ্জে চলে যেতে বলেন।

২৫শে জুন ১৯৭৫ ইং তারিখে আমি চাকরির লিখিত ও ভাইবা পরিক্ষা দেই এবং বিকেল ৫ টার পর আমাকে নিয়োগপত্র দিয়ে পরদিন যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়। কিশোরগঞ্জ জেলা অফিসে চাকরিরত অবস্থায় আমি নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ কৃষি বিভাগের কমকর্তা-কর্মচারীদের গঠিত বাকশাল কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। উল্লেখ্য, তখন নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ মিলে কৃষি জেলা ছিল। এরমধ্যেই ভয়াবহ ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ ইং বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। বাঙালি তখন অভিভাবকহীন। এর ফলস্বরূপ আমাকে তাৎক্ষনিক শাস্তিমূলক নেত্রকোনা বদলি করে দেয়া হয়।

এই শোকের মাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের নিহত সকলের বিদেহী আত্নার শান্তি কামনা করছি।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা নিছার আহমদ (রতন)
উপ-অধিনায়ক, ডি কোম্পানি
৫ নং সাব সেক্টর সুনামগঞ্জ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ.কম
muktijoddharkantho.com


আরও পড়ুন