রুশ প্রকল্প ও জ্বালানিতে প্রভাব পড়ার শঙ্কা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানিখাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া রাশিয়ার ওপর অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় বাংলাদেশে রুশ বিনিয়োগের প্রকল্পগুলোতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত-অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি), কয়লা আমদানি করে দেশের জ্বালানির চাহিদা মেটায় বাংলাদেশ। এমনিতেই করোনার প্রভাবে এক বছর ধরে দেশের জ্বালানি খাতে টালমাটাল অবস্থা। একদিকে অভ্যন্তরীণ উত্তোলন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি এবং জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চিন্তা ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। অধিক দামে আমদানি করা গ্যাস ও জ্বালানি তেল কম দামে সরবরাহ করার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে গ্যাস এবং বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে সরকার ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এরই মধ্যে মূল্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে মার্চ থেকে গণশুনানির আয়োজন করেছে।

এ অবস্থায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বেড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত প্রতি ব্যারেল (বিট্রিশ ব্যারেন্ট) তেলের দাম ১০২ দশমিক ৭৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দাম আরও বাড়তে পারে। অথচ তিন মাস আগেও তেলের দাম ৬৫ দশমিক ৫৭ ডলারে নেমেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ব্যাংক জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১২৫ ডলার এবং আগামী ২০২৩ সালে ১৫০ ডলারে উঠতে পারে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ তাদের পশ্চিমা মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়াও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ববাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের দ্বিতীয় বৃহত্তম বা ১০ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ করে রাশিয়া। সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি করে সৌদি আরব।

শুধু তেলই নয়, বিশ্বের শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী দেশও রাশিয়া। যে কোনো সময় ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে দেশটি। এর বড় প্রভাব পড়বে বিশ্বের অর্থনীতিতে। ইউরোপ প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ২০২০ সালে রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির পরিমাণ কমে গিয়েছিল, গত বছর চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ আগের অবস্থায় ফেরেনি। এর ফলে ‘স্পট মার্কেট’ থেকে এলএনজি আমদানি বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়তে দেখা গেছে। আর রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংকট যত ঘনীভূত হবে, গ্যাসের দাম ততই বাড়তে থাকবে। এতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এশিয়ার দেশগুলোও।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দেশটি রাশিয়ার পরিবর্তে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে এলএনজি সরবরাহের কথা ভাবছে। এ ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এদিকে রাশিয়াকে বাদ দিয়ে ইউরোপ যদি তাদের প্রাকৃতিক গ্যাস চাহিদার বড় একটি অংশই এলএনজি থেকে সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেয়, তবে স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম আরও বাড়বে। বিপাকে পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিকারকরা।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, ‘ইউক্রেন সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। পেট্রোলিয়াম পণ্য ও তেল-গ্যাসের দাম বাড়বে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য এটা ভালো খবর নয়।’

উল্লেখ্য, এলএনজি নির্ভরতার কারণে এমনিতেই বাংলাদেশ বড় রকমের ঝুঁকিতে পড়েছে। এলএনজির কারণে এই বছরে ৭০ হাজার কোটি টাকা লোকসানে রয়েছে জ্বালানি বিভাগ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সেই লোকসান আরও বাড়তে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ করপোরেশনের একজন পরিচালক বলেন, ‘ঠিক আজকালের মধ্যেই বাংলাদেশে প্রভাব পড়বে, এমনটা নয়। কারণ বাংলাদেশ অন্তত তিন মাস আগে তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির অর্ডার করে থাকে। তবে যদি এই যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির থাকে, তবে দেশে দুই মাসের মধ্যে একটা বিরাট প্রভাব পড়বে, যা সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন বিষয়।’

এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসির) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৭০ ডলার থাকে, তখন আমদানি করে বিদ্যমান দরে তেল বিক্রি করলে বিপিসি ব্রেক ইভেন পয়েন্টে থাকে। অর্থাৎ লাভও নয়, লোকসানও নয়। কিন্তু সেই তেল যদি ১০২ ডলারে দাঁড়ায়, তখন বিরাট লোকসান বা ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতার দেশে এত বিশাল ভর্তুকি দেওয়া কঠিন কাজ।’

এদিকে সম্প্রতি বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, গত নভেম্বরে জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে ১০ টাকা করে লোকসান গুনছে বিপিসি। এছড়া গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বৈঠকে নির্দেশ দিয়েছেন জ্বালানিখাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে।


আরও পড়ুন