প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে রাবির দুই শিক্ষকের ‘কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফিশারিজ বিভাগের একটি কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও একটি কোর্সের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরেক শিক্ষকের করা এমন অভিযোগ যেন পরস্পরের মধ্যে ‘কাঁদা ছোঁড়াছুড়িতে’ পরিণত হয়েছে।

এই ঘটনার কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকরা ওই দুই শিক্ষকের ব্যক্তিগত রেষারেষিকেই দায়ী করছেন। তারা বলছেন, তাদের এমন রেষারেষি বিভাগের সুনাম ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রমেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ইসতিয়াক হোসাইনের ফেসবুক স্টোরিতে বিভাগে চলমান চূড়ান্ত পরীক্ষার একটি কোর্সের (এফএমএমসি-৬৪১) প্রশ্নপত্র ছাড়া হয়। পরবর্তীতে সেই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

এর কয়দিন পরেই গত ১৮ ডিসেম্বর ড. ইয়ামিন হোসেন সাজেশনের নামে চূড়ান্ত পরীক্ষার পূর্বেই একটি কোর্সের প্রশ্নপত্র অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীর কাছে শেয়ার করেন বলে অভিযোগ ওঠে। তিনি ওই কোর্সটির একজন প্রশ্নকর্তা এবং পরীক্ষা কমিটির একজন সদস্য। পরে সেই কোর্সের পরীক্ষা স্থগিতের জন্য অধ্যাপক ইসতিয়াক পরীক্ষা কমিটির কাছে আবেদন করেন।

অধ্যাপক ইসতিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি আওয়ামীপন্থী প্যানেল থেকে ফিশারিজ অনুষদের ডিন হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। অপরদিকে, সহযোগী অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসেন বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচনে অধ্যাপক ইসতিয়াকের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অ্ধ্যাপকরা জানান, ফেসবুকে কিংবা শিক্ষার্থীদের কাছে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নফাঁস করা নিঃসন্দেহে অন্যায়। সম্ভবত এসবের পেছনে ওই দুই শিক্ষকের ব্যক্তিগত রেষারেষি এবং নন-একাডেমিক কিছু বিষয়ও রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়া কাম্য নয়। এতে একাডেমিক কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের উপরেও এর একটা প্রভাব পড়ে। তাই এসব বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এসব ঘটনা শিক্ষকদের দায়িত্বের প্রতি অবহেলাকে স্পষ্ট করছে। তাছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক এতো খারাপ কেন হবে? এসব বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত। এগুলো এখনি সমাধান না হলে সমস্যাগুলো আরও বাড়বে এবং শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে ড. ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ করা হয়েছে আমি সেগুলো পড়াই না। আর এটি ২০১৮ সালের প্রশ্নপত্র। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা দিতে পুরোনো প্রশ্নগুলো দিয়েছিলাম। আর অধ্যাপক ইসতিয়াক নিজেও এই প্রশ্নপত্র মডারেশন করেছেন। তিনি আমার বিরুদ্ধে কীভাবে এমন অভিযোগ তুলতে পারেন? মূলত ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্যই এমনটা করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে অভিযোগকারী অনুষদ অধিকর্তা অধ্যাপক ইসতিয়াক হোসাইন বলেন, ‘আসলে বিভাগের প্রশ্নপত্রের মডারেশনের কিছু গাফিলাতি রোধ করার জন্য আমি প্রশ্নপত্রের ছবি তুলেছিলাম। সেটি ফেসবুকে ভুলবশত শেয়ার হয়ে গেছে। আমার উদ্দেশ্য প্রশ্নফাঁস করা ছিল না।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইয়ামিনের সঙ্গে আমার এখনো ভালো সম্পর্ক। আমি মূলত বিভাগের প্রশ্নপত্র মডারেশনের বিষয়টি স্বচ্ছ করার জন্য এমন অভিযোগ করেছি।’

বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মঞ্জুর আলম বলেন, ‘আমাদের বিভাগের সব শিক্ষকদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এ ঘটনার পর আমি মর্মাহত হয়েছি। এমন ঘটনায় নিজেদের বিভাগের মান-সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। যদিও প্রশ্নপত্রের বিষয়ে আমার করার কিছু নেই।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ‘এ ঘটনায় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দপ্তরে থেকে বিস্তারিত জানানো হবে।’


আরও পড়ুন