দূর পরবাস - March 6, 2022

যুবতী নারীকে বলি দিতেই পানিতে ভরে উঠত নীল নদ!

মিসরের সভ্যতা প্রাচীনকাল থেকেই নীল নদের উপর নির্ভরশীল। মিসরের প্রায় সমস্ত সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও নীলনদের তীরেই অবস্থিত। বর্তমানে যে নীল নদ দেখা যায় তার পেছনে রয়েছে এক গল্প।

এক সময় নীল নদের পানি প্রবাহের জন্য এখানে সুন্দরী নারীকে উৎসর্গ করা হতো। ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের আগ পর্যন্ত নীল নদ প্রতি বছর শুকিয়ে যেত। সেসময় মিশরীয়রা একটি কুসংস্কার মেনে চলত। সেটি ছিল শুকিয়ে যাওয়া নদীতে কোনো সুন্দরী, ষোড়শী এবং কুমারী মেয়েকে অলংকার ও সুন্দর পোশাক পরিয়ে নীল নদের শেষ সীমানায় যেখানে ডুবন্ত পানি থাকত সেখানে ভাসিয়ে দেয়া হতো। তাদের ধারণা ছিল নীল নদকে এসব উপহার দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে। না হলে নীল নদ আর পানি প্রবাহ করবে না। এই নিষ্ঠুর নারী বলি প্রথা মিসরে যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) খেলাফতের সময় বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে’ আমর ইবনুল আস (রাঃ)র নেতৃত্বে ইসলাম কায়েমের জন্য ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে যখন মিশর বিজয়ী হলো। তখন তিনি নীল নদের এই নারী বলি দেয়ার ঘটনায় খুব মর্মাহত হন। মিশরীয় একদল লোক প্রতি বছরের মতো এবারো নারী বলি দেয়ার অনুমতি আনতে বিখ্যাত সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) কাছে যায়।

তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাদের জানান, ইসলাম কখনো এ ধরণের কুসংস্কার সমর্থন করে না। অন্যায়ভাবে কোনো মানুষের জীবন এভাবে জলাঞ্জলি দেয়া ইসলামে কখনোই বৈধ হবে না। এটি ইসলাম ছাড়াও তিনটি আসমানি ধর্মেই সমর্থন করে না। কোথাও এভাবে নারী বলি দেয়ার নিয়মের বৈধতা নেই।

সে বছর ঘটনাক্রমে দেখা গেল, নীল নদে পানি আসেনি। তখন চাষাবাদের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমনকি যাদের পেশা চাষাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে। আবার অনেকেই পুনঃরায় নীল নদকে সন্তুষ্ট করতে এক কুমারীকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে’ আমর ইবনুল আস (রাঃ) তৎক্ষণাত চিন্তিত হয়ে খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) কাছে সমাধান চেয়ে বিশেষ দূত পাঠান।

সব ঘটনা জানতে পেরে খলিফা কুমারী উৎসর্গ করার রীতি বন্ধ করায় খুশি হন এবং সাহাবিকে ধন্যবাদ জানান। মহান আল্লাহ তায়ালার নামে একটি পত্র লিখেন খলিফা হজরত ওমর (রাঃ)। এরপর তিনি দূতের মাধ্যমে মিসরের সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) কাছে পত্রটি পাঠান। পত্রের মধ্যে ছিল ছোট্ট একটি চিরকুট। আর পত্রে লেখা ছিল শুকিয়ে যাওয়া নীল নদের মাঝখানে চিরকুটটি রেখে দ্রুত চলে আসতে।

খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) এর নির্দেশ অনুযায়ী, চিরকুটটি সাহাবি হজরত আমর ইবনূল আস (রাঃ) নীল নদের মাঝখানে রেখে আসেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, চিরকুটটি রেখে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নীল নদ পানিতে পূর্ণ হতে শুরু করল। সেই থেকেই নীল নদের পানি প্রবাহ শুরু হয়ে আজো তা প্রবাহমান রয়েছে।

সেই চিরকুটে খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) কী লিখেছিলেন? সেই চিরকুটটি খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) নীল নদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন। তাতে লেখা ছিল, আল্লাহর বান্দা, মুমিনগণের আমীর খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) পক্ষ থেকে মিসরের নীল নদের প্রতি, ‘তুমি যদি তোমার ইচ্ছায় প্রবাহিত হও। তবে তোমার প্রবাহিত হবার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি তোমার জারি হওয়ার, প্রবাহিত হওয়ার ক্ষমতা মহান আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে হয় তবে মহান রাব্বুল আল-আমিনের দরবারে মিনতি জানাই। তিনি যেন তোমাকে জারি করে দেন।’

আধ্যাত্নিক ক্ষমতার অধিকারী খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ)র সেই চিরকুটের দ্বারা নীল নদের সেই সমস্যা আজীবনের জন্য দূরীভূত হয়। এতে বহু যুবতী নারীর প্রাণ রক্ষা পায়। মিসরবাসী অনেক বড় কুসংস্কারের হাত থেকে চিরজীবনের মতো মুক্ত হয়। এরপর থেকেই মিসরের নীল নদে সারা বছরই পানির প্রবাহ থাকে।


আরও পড়ুন