ডলারের দাম গেল ব্যাংকের হাতেই

অবশেষে ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন চাহিদা-জোগানের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো নিজেরাই ডলারের দাম নির্ধারণ করতে পারবে। প্রবাসী আয় ও রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ডলারের দাম যেন বেশি বাড়ানো না হয়, সেটি তদারক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো যাতে দাম বেশি বাড়াতে না পারে, সেদিকেও ব্যাংকগুলোকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত ডলারের সংকট কাটিয়ে বাজারে ভারসাম্য আনতে সহায়ক হবে।

এদিকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরই বেড়ে গেছে ডলারের দাম। গতকাল আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম উঠে প্রায় ৯৫-৯৭ টাকা। যদিও অধিকাংশ ব্যাংক তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রির দাম দিয়ে রেখেছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯১ টাকা। গত সোমবার থেকে আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত দাম ছিল ৮৯ টাকা ১৫ পয়সা। তবে এই দামে আমদানিকারকরা ডলার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করা হচ্ছিল। এদিকে গতকাল আরেক দফা টাকার মান কমিয়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার ৯০ পয়সা বাড়িয়ে ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই দামে গতকালও ডলার পাননি আমদানিকারকরা। আগের মতোই আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতে ৯৫-৯৭ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাফেদা ও এবিবির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ডলারের একক দাম নির্ধারণ করেছিলাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই দামে ব্যাংকগুলো প্রবাসী আয় সংগ্রহ করতে পারছে না। আবার রপ্তানিকারকরাও এই দামে রপ্তানি বিল নগদায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাই আমরা রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় উৎসাহিত করতে ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরই মধ্যে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।’ একক দাম তুলে নেওয়ায় বাজার আরও অস্থির হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডলারের একক দাম প্রত্যাহার মানেই কিন্তু এটা নয় যে ব্যাংকগুলো যা খুশি তাই করতে পারবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যে ব্যাংক অপেক্ষাকৃত কম দামে এলসি খুলবে, সেই ব্যাংকেই আমদানিকারকরা যেতে চাইবে। কাজেই গ্রাহক ধরে রাখতে কেউ চাইলেই ইচ্ছামতো দাম আদায় করতে পারবে না। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও বিষয়টি তদারক করা হবে।’

বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার স্বাধীনতার পর থেকে সরকারই নির্ধারণ করে। টাকাকে রূপান্তরযোগ্য ঘোষণা করা হয় ১৯৯৪ সালে। আর ২০০৩ সালে এই বিনিময় হারকে করা হয় ফ্লোটিং বা ভাসমান। এরপর থেকে আর ঘোষণা দিয়ে টাকার অবমূল্যায়ন বা পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না। তবে বিনিময় হার ভাসমান হলেও পুরোপুরি তা বাজারভিত্তিক থাকেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময়ই এতে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এত দিন ‘ম্যানেজড ফ্লোটিং রেট’ নীতি অনুসরণ করে আসছিল। এর অংশ হিসেবে গত সোমবার থেকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ দাম ৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রির রেট নির্ধারণ করা হয় ৮৯ টাকা ১৫ পয়সা। বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) প্রস্তাব পর্যালোাচনা করে এ দাম নির্ধারণ হয়। তবে এ দাম নির্ধারণের পর প্রবাসী আয় কমার অশনি বার্তা পায় বাংলাদেশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়িয়ে বাজারের ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেরিতে হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক একটা কৃত্রিম দর নির্ধারণ করে দিত, যেটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল থাকত না। এভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, যা বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করে দেখেছে। এখন বাজারের ওপর ছেড়ে বাস্তবতাকেই স্বীকৃতি দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে সাধুবাদ। সেই সঙ্গে তাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি রাতারাতি যে স্থিতিশীল হয়ে যাবে, এমন আশা করা ঠিক হবে না।’

ড. জাহিদ বলেন, ‘বাজারের সঠিক মূল্যটা হলো সেই দাম, যেটা চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সেটা খুঁজে পেতে সময় লাগবে। এটা লেনদেনের মাধ্যমেই খুঁজে পাওয়া যায়। এজন্য সময় দিতে হবে। আবার খুব বেশি সময়ও লাগবে না। কারণ এটা খুব প্রতিযোগিতামূলক বাজার।’

মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা করেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ডলারের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এটা এখন আর ৮৯ টাকায় থাকবে না। ৯৫-৯৬ টাকায় উঠে যেতে পারে। সেই পর্যায়ে দাম উঠলে মূল্যস্ফীতির ওপর একটা চাপ তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতির চাপটা দুদিক দিয়ে ম্যানেজ করতে হবে। একটা হলো, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সেই চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণে বাজেট ঘাটতি সংযত পর্যায়ে রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি সবার জন্য সমান সমস্যা নয়। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্যই বেশি সমস্যা। এটা তাদের জন্য একটা জীবিকা সংকট। কাজেই যাদের কাছে এটা জীবিকা সংকট, তাদের জন্য বাজেটে আর্থিক সহায়তার কর্মসূচি থাকতে হবে।’

এদিকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরই বেড়ে গেছে ডলারের দাম। গতকাল প্রাইম ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক আমদানিকারদের কাছে সাড়ে ৯১ টাকায় ডলার বিক্রি করেছে বলে নিজস্ব ওয়েবসাইটে দাবি করেছে। এই দামকেও আনুষ্ঠানিক হিসেবে নিলেও একদিনের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় দেড় টাকা। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া রেট অনুযায়ী, আমদানি পর্যায়ে ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৯ টাকা ১৫ পয়সা। আর আন্তঃব্যাংক ডলারের রেট নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৯ টাকা। তবে গতকালই ডলারের বিপরীতে ফের ৯০ পয়সা টাকার অবমূল্যায়ন করে ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৯ টাকা ৭০ পয়সা। যদিও এই রেটে আমদানিকারকরা ডলার পাননি। কয়েকজন আমদানিকারক আমাদের সময়কে জানিয়েছেন, আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতে গতকাল তাদের ৯৫ থেকে ৯৭ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। এদিন ব্যাংকগুলো নগদ ডলার বিক্রি করেছে ৯৫ থেকে ৯৭ টাকায়। আর খোলাবাজারে ডলার বিক্রি হয়েছে ৯৬ থেকে ৯৭ টাকায়।


আরও পড়ুন