দেশের খবর - March 24, 2015

ধান এখন কৃষকের বোঝা

চলতি বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে খরচ হবে সাড়ে ২৭ টাকা। সরকার এ চালের সামান্য অংশ কিনবে ৩২ টাকা দরে। বাকিটা বিকোবে বাজারে, যেখানে এখন ভারতীয় চালের রমরমা। ফলে মৌসুমের শেষ দিকে এসেও চালের দর বাড়েনি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে পাইকারি বাজারে এখন মোটা চাল সাড়ে ২৫ থেকে সাড়ে ২৬ টাকা কেজি।

ভরা মৌসুমের সময় ভারতীয় পেঁয়াজ, রসুন ও আদার ‘আগ্রাসন’ নতুন নয়। ফি-বছরই দেশীয় নতুন পেঁয়াজ বাজারে ওঠা শুরু হলে ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানিও বেড়ে যায়। যার কারণে কৃষক নতুন ফসলের ভালো দাম পায় না। কিন্তু এবার ভারতীয় চালের কবলে পড়ল দেশি চাল।

গত জুন থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি হয়েছে প্রায় ১১ লাখ টন চাল। পাইকারি বাজারে গেলেই চোখে পড়ছে ভারতীয় চালের বস্তা। এর মধ্যে আমন মৌসুম গেছে, যেখানে কৃষক ধানের ভালো দাম পায়নি। আসছে বোরো মৌসুমে একই পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মিলমালিকদের কাছে এখনো প্রচুর চাল মজুদ আছে। এর মধ্যে এপ্রিলের শেষ দিকে বোরো চাল বাজারে আসতে শুরু করলে দাম মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা চান, বোরো ওঠার আগে শুল্ক আরোপ বা অন্যকোনোভাবে চাল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হোক।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. এম আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমন উঠল, সামনে বোরো উঠবে- এ সময় চাল আমদানি করতে দেওয়াটা আত্মহত্যা করার মতো বিষয় হবে।’ তিনি বলেন, বোরোতে ৫৫-৬০ শতাংশ চাল উৎপাদিত হয়। কৃষক দাম না পেলে এ মৌসুমে উৎপাদনে এর প্রভাব পড়বে। বোরো উৎপাদন ৫ শতাংশ কমলেও খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তিনি বোরোর উৎপাদন দেখার পড়ে চাল আমদানির বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দেন।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে গত রবিবার বোরো মৌসুমের সরু চাল মিনিকেট বিক্রি হয়েছে ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা দরে। অন্যদিকে একই মানের ভারতীয় চালের দর ৪১ টাকা ৫০ পয়সা।

বরিশাল রাইস এজেন্সির বিক্রেতা মো. মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন ভারতীয় চাল না থাকলে মিনিকেট ৫০ টাকায় উঠত। কিন্তু দাম বাড়ার বদলে কমেছে। কুষ্টিয়ার রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল যেখানে দুই হাজার ৪০০ টাকা বস্তা (৫০ কেজি) ছিল, এখন সেটা দুই হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরো জানান, মিল মালিকদের কাছে এখনো প্রচুর চাল রয়ে গেছে। তাঁরা দোকানে দোকানে ঘুরে চাল সাধছেন। বোরো মৌসুম আসার আগে এই চাল বিক্রি শেষ না হলে দাম আরো কমবে।

বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, এখনো মিল মালিকদের কাছে প্রচুর চাল রয়ে গেছে। বোরো মৌসুমের নতুন চাল ওঠার পরও তিন-চার মাস পুরনো মিনিকেট চাল বাজারে থাকবে।

আমদানি বাড়ছে ‘অপ্রয়োজনে’ : বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বছরে প্রায় সোয়া তিন কোটি টন উৎপাদন করে দেশের কৃষকরা। তার পরও ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে চাল আসছে। গত জুলাই থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৬৪ হাজার টন চাল। যার পুরোটাই এসেছে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল তিন লাখ ৭৪ হাজার টন চাল।

আমদানি বেশি হয়েছে আমন ওঠার পর। গত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছিল তিন লাখ টন চাল। ডিসেম্বর থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে আমদানি হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন চাল। ভারতীয় চাল দামে কম হওয়ায় বাজারে বেশি বিক্রি হচ্ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির বিক্রেতা মো. মহিউদ্দিন বলেন, দেশি চাল ৫০ বস্তা বিকোলে ভারতীয় চাল বিক্রি হয় ১০০ বস্তা।

আমনে লোকসান, বোরোতেও শঙ্কা : গত আমন মৌসুমে ৩২ টাকা কেজি দরে চাল কিনেছে সরকার। ফেব্রুয়ারির মধ্যে তিন লাখ ২০ হাজার টন চাল সংগ্রহ করতে সরকারের কোনো অসুবিধা হয়নি। বাজারে দাম অনেক কম থাকায় মিল মালিকরা খুশি মনে সরকারের গুদামে চাল পাঠিয়েছেন। কিন্তু মোট উৎপাদনের তুলনায় সরকারের কেনার পরিমাণ খুব কম, ফলে বাজারে এর প্রভাব পড়েনি।

আমনে প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ ছিল ২৮ টাকা ও ধানে ১৮ টাকা। পুরো আমন মৌসুমে ধানের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম ছিল। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার যোগ হয়েছে রাজনৈতিক সংকট। অবরোধে উত্তরবঙ্গ থেকে চাল পাঠাতে না পেরে মিল মালিকরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছিলেন। যার কারণে ধান-চালের দাম কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন খরচের কম ছিল। এক মন ধানের উৎপাদন খরচ যেখানে ৬৭৫ টাকা (সাড়ে ৩৭ কেজি), সেখানে এখনো দর ৬২০ থেকে ৬৪০ টাকা।

বোরোতে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়। এবার অবরোধ-হরতাল চললেও আবাদে উপকরণ সংকট হয়নি। বোরোর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বোরো মৌসুমের শুরুতে প্রতিবছরই চালের দাম কমে যায়। এ বছর দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি ভারতীয় চাল আমদানি হলে দাম আরো কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

চালকল সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, এবার আমনে ধান-চাল বিক্রি করা যায়নি। কৃষক পর্যায়ে ও মিল মালিকদের কাছে প্রচুর ধান-চাল রয়ে গেছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ না করলে কৃষকের আরো ক্ষতি হবে।


আরও পড়ুন