অপরাধ - March 24, 2015

যেভাবে ৭ টুকরো করা হয় শিমুর লাশ

dead body (lash)
রাজধানীর ফকিরাপুলে এক নারীর সাত টুকরো লাশ উদ্ধার নিয়ে তৈরি হওয়া চাঞ্চল্যের রহস্যভেদের দাবি করেছে পুলিশ। মাদক ব্যবসায়ীর স্ত্রী হয়েও শিমু ওরফে সুমি পুলিশ সোর্স হিসেবে কাজ করায় ঘনিষ্ঠজনরাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং লাশ টুকরো করে ফেলে দিয়েছে বিভিন্ন স্থানে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা ছয়জনের স্বীকারোক্তিতে পৈশাচিক হত্যার বর্ণনা মিলেছে। কারা ও কিভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা জানা গেছে।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলো সাইদুল ইসলাম (২৭), হানিফ (২৬), রাতুল আহাম্মেদ (২৩), নুরুন্নবী শাওন (১৯), মোহাম্মদ সুজন (২৩) ও সুমন ওরফে তোতলা সুমন (২৪)। তাদের কাছ থেকে একটি ছুরি, একটি চাপাতিসহ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস জব্দ করা হয়েছে।

গত ১০ মার্চ মতিঝিল থানার পুলিশ ফকিরাপুল কালভার্ট রোডের হোটেল উপবনের উত্তর পাশে খুঁজে পায় এক নারীর কাটা একটি হাত ও একটি পায়ের অংশ। এরপর অনুসন্ধানকালে ওয়াসা ভবনের পাকা দেয়ালের কাছে মেলে একটি পা এবং পাঁচ গজ দূরে আবর্জনার ভেতরে মেলে একটি হাতসহ বাহুর কিয়দংশ। ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির পূর্ব পাশে টিনের চালায় পাওয়া যায় রক্তমাখা বিছানার চাদর, নীল রঙের নাইলনের রশি। সেখানেই মেলে মস্তক ও হাত-পাবিহীন নারীর দেহ। কয়েক ঘণ্টা পর ১৯৩/১ ফকিরাপুল আহসান মঞ্জিল নামের একটি বাড়ির সপ্তমতলার সিঁড়ির মাঝখানে পাওয়া যায় আগুনে ঝলসানো একটি মস্তক। পুলিশ তখন নিশ্চিত হয় কোনো নারীকে হত্যার পর লাশ সাত টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হয়েছে। এ অবস্থায় উদ্ধার করা লাশের অঙ্গগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। আর মতিঝিল থানায় দায়ের হয় একটি হত্যা মামলা।

মামলাটির তদন্তকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নিশ্চিত হয় নিহত নারীর নাম শিমু ওরফে সুমি এবং তিনি কারাবন্দি এক মাদক ব্যবসায়ীর স্ত্রী। শিমু পুলিশের সোর্স হয়ে কাজ করতেন বলেও তথ্য মেলে। এ পর্যায়ে পুলিশ সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে জড়িতদের ব্যাপারে ধারণা মিলে যায়। আর সর্বশেষ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করলে মিলে যায় হত্যা রহস্য। ইতিমধ্যে আসামি সাইদুল ইসলাম, হানিফ, রাতুল আহাম্মেদ ও নুরুন্নবী শাওন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আসামিদের বর্ণনা অনুসারে, ফকিরাপুল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসায়ে যুক্ত সুজন, রাতুল, শাওন, মিকি মাউস ওরফে আলম, তোতলা সুমন, বাংলা সোহেল, হানিফ, কালু, কাননসহ বেশ কয়েকজন। তাদের দলনেতা সাইদুল ইসলাম। তারা ইয়াবা ও হেরোইন ব্যবসার পাশাপাশি একত্রে বসে মাদক সেবন করত মোবারক হোসেন মন্টির বাসায়। সেখানে চারতলার ছাদে বসে ইয়াবা সেবনের আসরে যাতায়াত ছিল সুমি ওরফে শিমুর। পুলিশ সাইদুল ও মন্টিকে কয়েকবার গ্রেপ্তার করলে শিমুকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। কিন্তু আরেক মাদক ব্যবসায়ী নাসিরের স্ত্রী হওয়ার কারণে শিমুর ব্যাপারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছিল না। ঘটনার চার-পাঁচ দিন আগে শিমুর স্বামী নাসির ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত এক বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। এ ঘটনায় শিমু দায়ী করে সাইদুল, সুজন, হানিফ ও মন্টিকে। ৯ মার্চ সন্ধ্যায় যখন মন্টিদের ছাদে সুজন, রাতুল, শাওন, মিকি মাউস ওরফে আলম, তোতলা সুমন, বাংলা সোহেল, হানিফ, সাইদুল ইয়াবা সেবন করছিল, তখন শিমু ওই বাসার নিচে হাঁটাহাঁটি করছিল। সুজন তখন শিমুকে দেখে সাইদুলকে বলে ‘বস শিমু পুলিশ নিয়া আমাদেরকে ধরাইতে আসছে।’ তখনই শিমুকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত হয়। সুজন, হানিফ, নুরুন্নবী শাওন ও সাইদুল নিচে নেমে শিমুকে ধরে মন্টির বাসার ষষ্ঠতলার চিলেকোঠায় নিয়ে যায়। লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে নাইলনের রশি দিয়ে শিমুকে বাঁধা হয়। সুজন কাগজ মুড়িয়ে ও স্কসটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে ‘বল’ বানিয়ে তা শিমুর মুখে ঢুকিয়ে দেয়। একপর্যায়ে শিমুকে ইয়াবা সেবন করায়। রাত আড়াইটার দিকে সাইদুল ও সুজন ছুরি দিয়ে শিমুকে জবাই করে। মোবারক হোসেন মন্টি তার বাসা থেকে চাপাতি ও ছুরি এনে শিমুর মাথাকে দেহ থেকে আলাদা করে। এরপর সুজন ও রাতুল পা কেটে টুকরো করে। সাইদুল, বাংলা সোহেল, হানিফ, আলমসহ সবাই এ টুকরো করার কাজে অংশ নেয়। এরপর লাশ ভাগ করে নিয়ে বাংলা সোহেল ওয়াসার খালি জায়গায় ফেলে দুই হাত। সুজন হোটেল উপবন ও মন্টির বাসার গলিতে ফেলে পায়ের কাটা অংশ। আর মন্টি কেরোসিন তেল এনে শিমুর মাথা আগুন দিয়ে পোড়ায়, যাতে কেউ চিনতে না পারে। এরপর মন্টির বাসার চাদর দিয়ে শিমুর কাটা দেহ পেঁচিয়ে ওয়াসার টিনশেড ঘরের চালে ফেলে রাখা হয়। বালতি ও মগ এনে তোতলা সুমন ও আলম যখন ঘটনাস্থলের রক্ত পরিষ্কার করছিল তখন ফজরের আজান পড়ছিল বলে জানায় আসামিরা। এরপর সবাই বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে। কিন্তু পুলিশ ও র‌্যাব তাদের ধরে ফেলে।

তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর হোসেন সোহেল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩। গত রবিবার ভোরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে মোবারক হোসেন মন্টি। আর অন্যরা গ্রেপ্তার হয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার জুয়েল রানার নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে আটক করলে জিজ্ঞাসাবাদে তারা এ হত্যার বিস্তারিত তথ্য দেয়।

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর জানান, হত্যায় জড়িত প্রত্যক্ষ আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে অন্য কারো সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেলে অভিযান চালানো হবে। তবে আসামিদের স্বীকারোক্তিতে এ হত্যার স্বচ্ছ বর্ণনা মিলেছে।


আরও পড়ুন