দেশের খবর - December 6, 2016

খোলা আকাশের নিচে সাঁওতালরা

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ রিপোর্ট :

আজ ৬ ডিসেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের বসতি থেকে সাঁওতালদের উপর হামলা, ঘরে আগুন, গুলি চালিয়ে হত্যা ও উচ্ছেদ ঘটনার এক মাস। কিন্তু সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর গ্রামের গির্জার সামনে আশ্রয় নেওয়া সাঁওতালদের জীবনযাত্রার মানের কোনো উন্নতি ঘটেনি।

ফলে মাদারপুর গ্রামের গির্জার সামনে আশ্রয় নেওয়া সাঁওতাল পরিবারের ৪ শতাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে ছোট ছাপড়া, এনজিওর দেওয়া ত্রিপল (তাবু) ও কলা পাতার ছোট ঘরের নিচে কোনো রকমে দিনাতিপাত করছেন। এছাড়া আশপাশের গ্রাম ও পরিত্যাক্ত স্কুল ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন অনেকে।

সরেজমিনে মাদারপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রামে শুনসান নীরবতা চলছে। গ্রামে নতুন কোনো লোকের আগমন ঘটলে তারা নানা প্রশ্ন করেন। কারণ তারা এখনো অনেকটা ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

গির্জার সামনে খোলা মাঠে সাঁওতালরা ছাপড়া, এনজিওর দেওয়া ত্রিপল (তাবু) ও কলা পাতার ছোট ঘরে বসবাস করছেন। প্রতিটি ঘরের সামনে খোলা আকাশের নিচে মাটি খুড়ে করা হয়েছে রান্নার জন্য চুলা। কাজ না থাকায় এখানকার সাঁওতালরা এখন অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন।

গির্জার সামনে আশ্রয় নেওয়া টেডু টুডু জানান, বাপ-দাদার জমি ছাড়ার এক মাস অতিবাহিত হলেও এখনো নিজের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে এখনো নানা হুমকিতে থাকতে হচ্ছে।

শরনি কিসকো জানান, আগে গ্রামে গ্রামে কাজ করে জীবন চলতো। কিন্তু এখন কোনো কাজ নেই। ফলে খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। তার উপর আবার কাজ না থাকায় পেটে ভাত যায় না।

স্মৃতি মুরমু জানান, ঘটনার পর খেয়ে না খেয়ে খোলা আকাশের নিচে আছি। তার উপর আবার মামলার কারণে পুলিশের গ্রেফতার ভয়ে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। পুলিশের ভয়ে অনেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

রুমিলা কিসকুর বলেন, সামান্য কৃষি কাজ করে সংসার চলে। একচালা ঘর ভেঙে আগুন দেওয়া হয়। এখন অনেক কষ্টে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি। দ্রুত তাদের থাকার স্থায়ী সমাধানে সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।

এদিকে, ইক্ষু খামারের জমিতে আদিবাসীদের (সাঁওতাল) চাষ করা রোপন আমন ধান উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত ২৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসম্বের পর্যন্ত চিনিকল কর্তৃপক্ষ কেটে তা সাঁওতালদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া সাঁওতালদের উচ্ছেদের পর ধ্বংসস্তুপ (রচিক) কর্তৃপক্ষ ট্রাক্টর দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে দিয়ে চারপাশ তার কাঁটার বেড়া দিয়ে আখ রোপন করে।

প্রসঙ্গত, ১৯৬২ সালে বেশ কয়েকটি গ্রামের সাঁওতাল বাঙালিদের কাছ থেকে ১৮শ ৪২ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। সেই জমিতে ইক্ষু খামার গড়ে তোলা হয়। কিছুদিন জমিতে আখ চাষ করলেও পরবর্তীতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিকট জমি লিজ দেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ।

ফলে আখ চাষের পরিবর্তে জমিতে ধান ও তামাক চাষ করা হতো। পরে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলে জমি ফিরে পেতে আন্দোলনে নামে আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠি। গত ১ জুলাই সাঁওতালা একত্রিত হয়ে জমি দখল নিয়ে ঘর নির্মাণ, ধান, পাট, ডাল ও সরিষা চাষ করে।

গত ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের আখ কাটাকে কেন্দ্র করে খামারের জমি দখলকারী আদিবাসী সাঁওতালের সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারী ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। এসময় সাঁওতালদের ছোড়া তীর-ধনুকের আঘাতে ৯ পুলিশ তীরবিদ্ধসহ ৩০ জন আহত হয়। এরপর বিকেলে তাদের উচ্ছেদ করে ঘরে আগুন দেওয়া হয় এবং লুটপাট করা হয় জমির ফসল।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত সাড়ে ৩শ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। এ মামলায় পুলিশ এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করেছে।

এছাড়া সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে উচ্ছেদ ও সাঁতালদের উপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও তিন সাঁওতালকে গুলি করে হত্যার ঘটনার ১১ দিন পর ১৬ নভেম্বর গভীর রাতে সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মরমু বাদী হয়ে পাঁচ থেকে ছয়শ জনকে অজ্ঞাত পরিচয় আসামি করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় এ পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার ২০ দিন পর ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের পক্ষে সাপমারা ইউনিয়নের হরিণমারী নতুরন পল্লি গ্রামের মঙ্গল হেমরমের ছেলে থোমাস হেমব্রন বাদী হয়ে ৩৩ জন নামীয় ও অজ্ঞাতনামা ৫০০-৬০০ জনকে আসামি দেখিয়ে শনিবার বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ থানায় এজাহার দায়ের করেন। বর্তমানে মামলার এজাহারটি সাধারণ ডায়েরি করে পুর্বের মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত কুমার সরকার।

এজাহারে আসামি হিসেবে গাইবান্ধা-৪ আসনের (গোবিন্দগঞ্জ) সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল হান্নান, রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল আউয়াল, সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাকিল আহম্মেদ বুলবুল ও কাটাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করীম রফিক, আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ ফকুর নাম রয়েছে।

 

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০৬-ডিসেম্বর-২০১৬ইং/নোমান


আরও পড়ুন

1 Comment

  1. I simply want to mention I’m very new to blogging and definitely liked your web-site. Almost certainly I’m likely to bookmark your site . You actually come with exceptional writings. Bless you for sharing your web site.

Comments are closed.