‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষ ঢুকে পড়েছে, যা করেছ যথেষ্ট, স্কুলে ফিরে যাও’

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ নেমে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি-জামাতের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েকটি আন্দোলন করেছে। তাদের ইচ্ছামত যা যা করার করছে- আমরা তা মেনে নিয়েছি। কোন বাধা দেইনি। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আমি এখন শঙ্কিত। তাদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে গেছে। যারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করতে পারে। বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারতে পারে। তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে নেমে এলে কী না করতে পারে? যেকোনও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। আমি শিক্ষার্থীদের বলবো যথেষ্ট হয়েছে আর নয়, ঘরের ছেলে মেয়ে ঘরে ফিরে যাবে। লেখাপড়া করবে।

প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ১০টি জেলার ৩০০টি ইউনিয়নের অপটিক্যাল ফাইবার কানিক্টিভিটি উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন (ইনফো সরকার-৩ পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে এই ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হচ্ছে।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা আপনাদের সন্তানদের ঘরে, স্কুলে ফিরিয়ে নিন। তারা (শিক্ষার্থীরা) যেটুকু করেছে, যথেষ্ট করেছে। কিন্তু, এখন তৃতীয় পক্ষ তাদের আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এখন যদি কোনও ধরনের নাশকতা ঘটে তাহলে তার দায় কে নেবে?  শিক্ষার্থীদের বলবো- পড়াশুনায় মনোযোগী হও। যার যার স্কুলে চলে চাও।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা পক্ষ বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। কেউ গুজবে কান দেবেন না, অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না।

তিনি বলেন, স্কুলে যাবে কলেজে যাবে পড়াশুনা করবে। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবি একে একে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। স্কুলে ট্রাফিক থাকবে। ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের পার করে দেবো। দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে কমে এসেছে। দুর্ঘটনা যাতে না হয় সেই চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি।

ছাত্রছাত্রীদের গত কয়েকদিনের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এসব কোমলমতি শিক্ষার্থীর যা যা দাবি-দাওয়া ছিল আমরা সব মেনে নিয়েছি।  তারা ইচ্ছামতো যা যা করার করছে। বাধা দেওয়া হয়নি। তারা ট্রাফিক পুলিশের আইন-কানুন না বুঝলেও রাস্তায় গাড়ির কাগজ পরীক্ষা করেছে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, মন্ত্রীরা মিলে সব শুনেছে, ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। আমাদের এমপি মন্ত্রীদের গাড়ি আটকে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন,  আমি জানি না তারা এসব বোঝে কিনা তবে,  তবে এখন তাদের ঘরে ফিরে যেতে হবে। আমরা ট্রাফিক  সপ্তাহ পালন শুরু করেছি। শিক্ষার্থীদের আর রাস্তায় থাকার দরকার নেই। পুলিশই দায়িত্ব পালন করবে। তারপরেও ছাত্রদের কেউ এতে আগ্রহ দেখালে তারা ট্রাফিক পুলিশের কাজে সাহায্য করতে পারবে।  তারা দুজন সহপাঠীকে হারিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। আর কেউ না বুঝুক, আমার চেয়ে কেউ তাদের কষ্ট বুঝবে না। কারণ, আমি মা-বাবা-ভাই-বোন হারিয়েছি। আমি তাদের কষ্ট বুঝতে পারি। তারপরেও আমি তাদের বলছি, এবার তাদের ঘরে, স্কুলে ফিরে যেতে হবে।

শনিবার নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, গাউসিয়া মার্কেটে স্কুল ইউনিফরম বিক্রি বেড়ে গেছে। পলাশি থেকে আইডি কার্ড তৈরি করা হয়েছে। তারা আমাদের দলীয় কার্যালয়ে আক্রমণ করেছে। আমাদের ১৭জন কর্মী হাসপাতালে। আমাকে ফোন দিয়েছে। আমি ধৈর্য ধরতে বলেছি। সেখানে নাকি ৪ জনকে মেরে লাশ করে দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।  ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ২০/২৫ জন শিক্ষার্থীকে অফিসে নিয়ে গেছে। সেখানে তারা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছে। কোথাও কিছু পায়নি।

দলীয় কার্যালয়ে পাথর নিক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ছাত্র হলে তো তাদের ব্যাগে বই থাকবে। পাথর থাকবে কেন?

গণমাধ্যমের একটি অংশের সমালোচনা করে সরকার প্রধান বলেন, কিছূ কিছু পত্রপত্রিকা আছে সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারা তাদের পছন্দ নয়। তারা চায় অন্য কিছু ঘটুক। এটা হলে তারা গাড়িতে পতাকা পায়, মন্ত্রী হতে পারে। তবে যদি এতই শখ তাহলে রাজনীতি করেন না কেন? মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি- অপপ্রচার চালিয়ে দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল করার কী অধিকার তাদের আছে?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। তবে, যতদূর সম্ভব আমরা বন্ধ করতে পারি, তারজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।

অনেক কিছু আমরা আগেই করেছি। এরপরও ওভার ব্রিজ, আন্ডার পাস করছি। তবে ওভারব্রিজ রেখে কেউ যেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে পার হওয়ার চেষ্টা না করে। তাহলে যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে তার দায় কে নেবে?

তিনি বলেন, তবে কিছু বিষয় আছে যেগুলো একদিনে হয় না। যেমন ট্রেনিং তো একদিনে হয় না, আন্ডারপাস হতে সময় লাগে। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। নতুন ট্রাফিক আইনে আমরা দূরপাল্লার বাসচালকরা যাতে চার-পাঁচ ঘণ্টা পরপর বিশ্রামে যেতে পারে সে আইন করে দিয়েছি।  এগুলো বাস্তবায়ন হতে তো একটু সময় লাগবে।

অনীক, হৃদয়-এদের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা আগুন দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালে এসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের মতো অনেক মানুষকে তারা গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে, পেট্রোল বোমা মেরে অনেক মানুষকে হত্যা করেছে। এদের থেকে সবাইকে বিশেষত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাবধান থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

ইন্টারনেটে ছড়ানো কোনও গুজবে কান না দিতে শিক্ষার্থীসহ সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে ‍বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। সকলকে আহ্বান জানাবো মিথ্যা অপপ্রচারে কেউ বিভ্রান্ত হবে না। কোন কিছু শুনলে তা সত্যমিথ্যা যাচাই করে নিন। কোনও রকম বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে ফেসবুক ইন্টারনেট ভালো কাজে ব্যবহার করুন। নোংরা কাজে নয়। আজেবাজে কাজে ইন্টারনেট যাতে ব্যবহার না হয় তা দেখতে হবে। মোবাইল ফোন যেন শান্তির জন্য ব্যবহার হয়, ভালো কাজে ব্যবহার হয় সেটা আমরা চাই।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, নিজের জীবনকে সুন্দর করা, ভালো চিন্তাভাবনা নিয়ে গড়ে উঠা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠবে। স্বাধীন দেশের ভাবমূর্তি কোননোভাবেই যেন নষ্ট না হয় সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

তিনি বলেন, রাস্তায় চলাচল করতে হলে কিছু নিয়মকানুন রয়েছে তা মানতে হবে। ট্রাফিক আইন রয়েছে তা মানতে হবে। স্কুল থেকে ট্রাফিক রুল শিক্ষা দিতে হবে। এজন্য আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছি। শিশুকাল থেকে ট্রাফিক রুল শিখতে হবে। রাস্তার কোন পাশ দিয়ে হাঁটতে হবে, কিভাবে রাস্তা পার হতে হয়।

নতুন ট্রাফিক আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। এটা ক্যাবেনেটে আসবে তারপর সংসদে গিয়ে সেটা পাস করে দেয়া হবে। আমরা চাই সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার সুফল যাতে জনগণ পায় সেটাই আমাদের লক্ষ্য। প্রতিটি মানুষ শিক্ষা পাবে, চিকিৎসা পাবে। উন্নত জীবন পাবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

 


আরও পড়ুন