টিএসসি ভাঙার পক্ষে ‘না’ ঢাবি শিক্ষার্থীরা

টিএসসির গম্বুজ-আকৃতির মিলনায়তন, পাশে সবুজ ঘাসের লন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় তুলে ধরা একটি দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। টিএসসির এই প্রাঙ্গণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পরিচিত এবং পুরোনো একটি ভবন আর থাকবে না, সেই জায়গায় দেখা যাবে একটি বহুতল ভবন- এমন চিন্তার বিরোধিতা করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, যেখানে বছরের পর বছর প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে থাকতে হয় ‘গণরুমে’। একজন মৃত্যু ব্যক্তি কবরে যেটুকু যায়গা পায়, গণরুমে সে জায়গাটুকুও পায় না একজন শিক্ষার্থী। এমন মানবেতর পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা নিশ্চিত না করে এমন একটি ঐতিহাসিক ভবন ভেঙে বহুতলা ভবন নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ঢাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড.কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘টিএসসির পাশ দিয়ে মেট্রো রেল যাওয়ার কারণে এর সৌন্দর্য্য এমনিতেই অনেকখানি নষ্ট হয়ে যাবে। তার উপর যদি বহুতল ভবন করা হয় এর নান্দনিকতার যেটুকু অবশিষ্ট থাকতো সেটাও যাবে।’

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেহা শারমিন বলেন, ‘ইতিহাস-ঐতিহ্যের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঐতিহ্যবহনকারী টিএসসির এমন বিপর্যয় আমি একজন শিক্ষার্থী হয়ে চাই না। সুন্দর মনোরম পরিবেশে বসে যেখানে বন্ধুদের সাথে চায়ের আড্ডা জমাতাম সেখানে আমি চাই না কোনো সুউচ্চ বিল্ডিং। আমাদের টিএসসি যেমন আছে আমরা তেমনই চাই।’

টিএসসির প্রস্তাবিত বহুতল কমপ্লেক্সের কাঠামোগত তালিকার বিরোধিতা করে ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘প্রথমত এইখানে কেন পার্কিং লট হবে? সেটা কি মেট্রো রেলের স্টেশন হবে সেই কারণে? দ্বিতীয়ত এইখানে কেন জিমনেসিয়াম হবে? আমাদের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংলগ্ন যেটি আছে সেটিকে কেন সংস্কার করে বড় আকারে করা হচ্ছে না? এখানে কেন সুইমিং পুল হবে? কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংলগ্ন একটি সুইমিং পুলতো আছে। সেটিকেই বরং আরো সুন্দর আরো ফাঙ্কশনাল করুন। তার চেয়ে বরং আধুনিক নকশায় দৃষ্টিনন্দন একটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি বানান যেন ৪০ হাজার ছাত্রের জন্য যথেষ্ট হয়। ইন ফ্যাক্ট, ভবিষ্যত বৃদ্ধির কথা ভেবে বরং এক লাখ ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভেবে একটি বড় লাইব্রেরি বানান। আর টিএসসিকে যদি আপনাদের ভালো না লাগে সেটিকে সংস্কার করুন। এমনভাবে করুন যেন এর ঐতিহ্য, এর সবুজ লন, এর নান্দনিকতা যেন একটুও ম্লান না হয়। বহুতল ভবন কোনোভাবেই নয়। আপনারা কি উন্নয়ন মানেই বহুতল ভবন বুঝেন?’

কবি জসিমউদ্দীন হলের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুজাহিদ বলেন, ‘টিএসসি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। টিএসসি চত্বরের মূল ভবন বাদ দিয়ে যদি ক্যাফেটেরিয়া ও গেমস রুম ভেঙে বহুতল ভবন করা হয় তাহলে টিএসসির উন্নয়ন ও সংস্কার হবে। টিএসসির সংস্কার করার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত আবাসন প্রকল্প হাতে নেয়া এবং গ্রন্থাগারের সংস্কার করা। একজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে কখনোই টিএসসি চত্বর ভাঙার পক্ষে নেই। তবে উন্নয়ন হোক এটা অবশ্যই চাই।’

স্যার এ এফ রহমান হলের শিক্ষার্থী ইমদাদুল আজাদ বলেন, ‘টিএসসির স্মৃতিময় এই পুরোনো ভবন ভেঙে ফেলা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অতীত ঐতিহ্য ইতিহাসকে বিনষ্ট করবে। আমি মনে করি ইতিহাস আর স্মৃতি ধরে রাখার গুরুত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চয়ই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।’

রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী আফরোজা রুমা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন গুলোর একটি কার্যালয় হচ্ছে টিএসসি। শিক্ষার্থীদের তারুণ্যতা এর মধ্যেই প্রকাশ পায়। তাদের আড্ডা, গান বাজনা, টুকটাক গল্প গুজব, পড়াশুনা সবকিছুর স্মৃতি এখানে জরিয়ে আছে। আমি কিছুতেই চাই না শিক্ষার্থীদের আনন্দের জায়গা টুকু নষ্ট হয়ে যাক। টিএসসি আগের মতোই থাকুক। এটি সকলের আবেগের জায়গা। যদি প্রশাসন উন্নয়ন করেতে চায় তাহলে টিএসসি চত্ত্বর না ভেঙে এটাকে সম্প্রসারণ করতে পারে।’

স্যার এ এফ রহমান হলের শিক্ষার্থী রিয়াজ উদ্দীন মুন্না বলেন, ‘টিএসসির আধুনিকায়ন জরুরি। কিন্তু অতি জরুরি না। শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি হলো হলের মসজিদ, হলের বারান্দায় যাতে না ঘুমাতে হয় এমন ব্যবস্থা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সকাল পাঁচটা বাজে সিরিয়াল দিয়ে একটা সীট সংগ্রহ করার মানবেতর সিস্টেমের অবসান জরুরি। আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে শিক্ষার্থীদের জরুরি প্রয়োজন গুলোতে নজর দেবে। শিক্ষার্থীদের ঘুমানোর জায়গা, পড়ার জায়গার মতো মৌলিক প্রয়োজনের দিকে নজর না দিয়ে বিনোদনের দিকে নজর দেয়া অদূরদর্শিতা মাত্র।’

প্রসঙ্গত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে শিক্ষক-শিক্ষর্থীদের প্রত্যাশা ও সুপারিশ জানতে চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২০২১ সালের ২ জানুয়ারির মধ্যে গুগল ডকস্ ফরমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতামত ও সুপারিশ পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে।

টিএসসি উন্নয়নে পুরনো ভবন ভেঙে ফেলা হবে বলে খবর প্রকাশের পর আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপ নেয়।


আরও পড়ুন