বাণিজ্যিকভাবে কিশোরগঞ্জে এবারই প্রথম সূর্যমুখীর চাষ

নিরাপদ ভোজ্যতেলের চাহিদা থেকে বাণিজ্যিকভাবে এবারই প্রথম শুরু হয়েছে কিশোরগঞ্জে সূর্যমুখী ফসলের চাষ।

হাওরে বোরো ফসলের পাশাপাশি রবি চাষে পুনর্বাসনের আওতায় ইটনায় ২৭ হেক্টর, মিঠামইন ২৭ হেক্টর, অষ্টগ্রাম ২০ হেক্টর ও নিকলী উপজেলায় ২০ হেক্টর জমিতে ৭শ জন কৃষক-কৃষাণী হাইব্রিড সূর্যমুখীর আবাদ করেছে। চাষের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৯৪ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯০ টন এবং তেল প্রায় ৮৫ টন।

সূর্যমুখী একধরনের একবর্ষী ফুলগাছ। সূর্যমুখী গাছ লম্বায় ৩ মিটার (৯.৮ ফু) হয়ে থাকে, ফুলের ব্যাস ৩০ সেন্টিমিটার (১২ ইঞ্চি) পর্যন্ত হয়। এই ফুল দেখতে কিছুটা সূর্যের মত এবং সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে বলে এর এরূপ নামকরণ। এর বীজ হাঁস মুরগির খাদ্যরূপে ও  তেলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই বীজ যন্ত্রে মাড়াই করে তেল বের করা হয় । তেলের উৎস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়।

সমভুমি এলাকায় শীত ও বসন্তকালে, উঁচু লালমাটি এলাকায় বর্ষাকালে ও সমুদ্রকুলবর্তী এলাকায় শীতকালীন শস্য হিসাবে চাষ করা হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখী একটি তেল ফসল হিসেবে বাংলাদেশে আবাদ হচ্ছে। এবারই প্রথমবারের মতো কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ উজান এলাকায় এর চাষাবাদ হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার সংযোগস্থাপনকারী অলওয়েদার রোডের জিরো পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ সংলগ্ন জমিনে কৃষক বাহাউদ্দিন ও কৃষাণী হাজেরা বেগমসহ আরও অনেকের সূর্যমুখী ফুলের চাষ দেখে মাতোয়া ভ্রমণপিপাসুরা প্রকাশ করছেন রোমাঞ্চকর নানা অনুভূতি। শুধু হওরাঞ্চলেই না কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ২০০ জন কৃষক সূর্যমুখী ফসলের চাষাবাদ করেছেন।

সদর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার আঃ সালাম জানিয়েছেন, ১১০-১২০ দিনে সুর্যমুখী উৎপাদন করা যায়।

সদর উপজেলা অফিসার মোঃ জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, সদরের ২৭ হেক্টর জমিতে এসব ফুলের চাষাবাদ করা হয়েছে। সদর উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ২০০ জন কৃষককে প্রণোদনার আওতায় ১ কেজি করে হাই ব্রীড বীজ প্রদান করা হয়।

সদরের চৌদ্দশত ইউনিয়নের কৃষক আরিফুল ইসলাম, কামালিয়ারচরের গিয়াস উদ্দিন,সাদুল্লাচরের মানিক মিয়া, বৌলাইয়ের সাদ্দাম  হোসেন, দানাপাটুলির হানিফ,সাইমুদ্দিন,নিপেন্দ্রসহ অনেক কৃষকের সাথে কথা হলে তারা জানান, আমাদের জমিতে ফুটেছে সূর্যমুখী, যেন পুরো মাঠ হাসছে প্রাণ খিলখিলে। বিস্মিত হয়, যখন দেখলাম সূর্যমুখী ফুলই ঘাড় ঘুরাচ্ছে সূর্যতালে। থাকে সূর্র্যের দিকেই মুখ করে! এর জন্যই বুঝি নাম তার সূর্যমুখী। সূর্যমুখী খেত দেখে মন ভরে উঠেছে এবং চাষে যেন প্রকৃতিকে ঢেলে সাজিয়েছে নতুন করে কেউ। রূপ ফুলটির গতরে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে একইভাবে সূর্যমুখীর ক্ষুদ্র বীজেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর উপাদান। এতে মজুত আছে ২০% প্রোটিন, ৩৫.৪২% তেল এবং ৩১% অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড। এছাড়া ভিটামিন হিসেবে রয়েছে এ, বি ৩, বি ৫, বি ৬, ই, ফোলেট। তামা, ম্যাঙ্গানিজ,  আয়রন, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, সেলেনিয়ামের মতো খনিজ উপাদান, ডায়েটি ফাইবার এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড। সূর্যমুখী খৈল গরু ও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্য হিসেবে এবং গাছ ও পুষ্পস্তবকও ব্যবহৃত হয় জ্বালানি হিসেবে।

সূর্যমুখী ফসলের আবাদী জমি সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরর ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক বশির আহম্মদ সরকার, ঢাকা খামারবাড়ির অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) মো. মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ছাইফুল আলম ও অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আশেক পারভেজ. সদর উপজেলা অফিসার মোঃ জামাল উদ্দিনসহ একটি প্রতিনিধিদল। তারা সুর্যমুখী চাষে কৃষকদের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।


আরও পড়ুন