দেশের খবর - April 4, 2021

বরগুনার উপকূলে ঝাঁকে ঝাঁকে মরছে কাঁকড়া, চাষিদের মাথায় হাত

গত বছর একটি কাঁকড়াও বিক্রি করতে পারিনি। সব কাঁকড়া ঘেরেই মরেছে। এবারো এনজিও, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চাষ শুরু করি। কিন্তু করোনার কারণে একই অবস্থা। একদিকে ঘরে চাল নেই অন্যদিকে কাঁকড়া বিক্রি বন্ধ। এমনিভাবে চলতে থাকলে আমাদের মরণ ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

এভাবেই নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদোয়ানি ইউনিয়নের হোগলপাশা গ্রামের কাঁকড়া চাষি পরিতোষ মন্ডল।

তিনি বলেন, প্রতি বছর এমন সময়ে কাঁকড়া বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু করোনার কারণে রফতানি বন্ধ থাকায় গত বছরের মতো এবারো ঘেরেই কাঁকড়া মরে যাচ্ছে। এভাবে চললে লাভ তো দূরের কথা খরচের টাকাও তুলতে পারব না। কাঁকড়া খেতে বেশ সুস্বাদু। এছাড়া এটি বিদেশে রফতানি করে প্রচুর পরিমাণ মুদ্রা অর্জনসহ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায়। তাই বরগুনার পাথরঘাটা এবং তালতলী উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে কাঁকড়ার খামার। এসব খামারে কাঁকড়া চাষ করে অনেকে স্বাবলম্বীও হয়েছেন। কর্মসংস্থান হয়েছে শতশত মানুষের। তবে করোনার কারণে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

জেলা মৎস্য অফিস ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার দেয়া তথ্যমতে, পাথরঘাটা ও তালতলীতে ৪৭০টি ঘেরে কাঁকড়া চাষ করেছেন পাঁচ শতাধিক চাষি। অল্প সময়ে উৎপাদন ও চীনে ভালো চাহিদা থাকায় উপজেলায় গত কয়েক বছরে চাষিরা গড়ে তোলেন ঘের। তবে করোনার কারণে গত বছর থেকে রফতানি বন্ধ রয়েছে। এতে বরগুনার সব ঘেরেই কম-বেশি পরিপক্ক ও ডিমওয়ালা কাঁকড়াগুলো ঘেরেই মরছে। রফতানি বন্ধ থাকায় দেশের বাজারেও কাঁকড়ার দাম কমেছে কয়েকগুণ। আগে প্রতিকেজি কাঁকড়া বিক্রি হতো ২২০০-২৮০০ টাকা। তবে এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০-২৫০ টাকায়। এতে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হতে চলেছেন চাষিরা। কাঁকড়া চাষিদের প্রত্যেকের আছে ঋণের বোঝা।

তালতলী উপজেলার কাঁকড়া চাষি ত্রে মং বলেন, গত বছর সব টাকাই আমাদের জলে গেছে। কোনো কাঁকড়াই রফতানি করতে পারিনি। স্থানীয় বাজারেও তেমন দাম পাওয়া যায় না। একেকটি খামার করতে ২০-২৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। আর এসব টাকা এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনের কাছ থেকে নেয়া হয়। গত বছর খরচের টাকাও তুলতে পারিনি। এবারো রফতানি করতে পারব না মনে হয়। একই উপজেলার আরেক চাষি সরজিত বলেন, প্রতি বছর ফেব্রæয়ারি-মার্চের মধ্যে কাঁকড়া বিক্রি শুরু হয়। মার্চের শেষেই সবার ঋণ পরিশোধ করতে পারি। কিন্তু এবার রফতানি বন্ধ। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।

সবচেয়ে বেশি কাঁকড়া চাষি রয়েছে বরগুনার পাথরঘাটায়। এ উপজেলার কাঁকড়া চাষি শিমুল বলেন, গত বছরের মতো কাঁকড়া বিক্রি করতে না পারায় সব ঘের নষ্ট হয়ে গেছে। শুকিয়ে গেছে কিছু কিছু ঘেরের পানি। এ বছরও করোনাভাইরাস আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।

কাঁকড়া ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ বলেন, আমরা পাথরঘাটা থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে ঢাকার বড় বড় হোটেলে পাঠাই। এছাড়া চীনসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। কিন্তু করোনার কারণে রফতানি বন্ধ থাকায় আমরাও বিপাকে পড়েছি।

পাথরঘাটা উপজেলার কাঁকড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি উত্তম মজুমদার বলেন, ঋণ নিয়ে কাঁকড়া চাষ করেন চাষিরা। তারা কাঁকড়া বিক্রি করেই সেই টাকা শোধ করেন। কিন্তু করোনার কারণে রফতানি বন্ধ থাকায় চাষিদের খরচের টাকাও তোলা দায়।

পাথরঘাটা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, এ মুহূর্তে কাঁকড়া চাষিদের আর্থিক সহায়তা করা না গেলেও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। করোনার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন কাঁকড়া চাষিরা।


আরও পড়ুন