ঈদযাত্রায় সড়কে ২৭৩ প্রাণহানি

ঈদুল আজহার চলাচলে সারা দেশে ২৪০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন নিহত ও ৪৪৭ জন আহত হয়েছে। ‌‘ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন ২০২১’–এ এমন তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বিস্তারিত জানান সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা জাতীয়-আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর মনিটরিং করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

সেখানে বলা হয়, সড়ক, রেল ও নৌ-পথ মিলিয়ে ২৬২টি দুর্ঘটনায় ২৯৫ জন নিহত ও ৪৮৮ জন আহত হয়েছে।

লকডাউনের কারণে মানুষের যাতায়াত সীমিত হলেও স্বল্পসময়ের জন্য গণপরিবহন চালু করায় সড়কে গণপরিবহনের পাশাপাশি ব্যক্তিগতযান বিশেষ করে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা-ব্যাটারীচালিত রিকশা, ট্রাক-পিকআপ ও কাভার্ডভ্যানে একসঙ্গে গাদাগাদি করে যাতায়াতের কারণে বিগত ৬ বছরের তুলনায় এবারের ঈদে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দুটোই বেড়েছে।

ঈদযাত্রা শুরুর দিন অর্থাৎ ১৪ জুলাই থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ২৮ জুলাই পর্যন্ত ১৫ দিনে ২৪০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন নিহত ৪৪৭ জন আহত হয়েছে। উল্লেখিত সময়ে রেলপথে ৯টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছে। নৌ-পথে ১৩টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত এবং ২১ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা মিলেছে।

২৩ জুলাই থেকে কঠোর লকডাউন শুরু হওয়ার পর ২৫ জুলাই থেকে সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমতে থাকে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ৮৭টি দুর্ঘটনায় ৯৩ জন নিহত ও ৫৯ জন আহত হয়েছে। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬.২৫ শতাংশ, নিহতের ৩৪.০৬ শতাংশ এবং আহতের ১৩.১৯ শতাংশ প্রায়।

এই সময় সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ১০৬ চালক, ১৯ পরিবহন শ্রমিক, ৬৪ পথচারী, ৩৮ নারী, ৩১ শিশু, ১২ শিক্ষার্থী, ৩ সাংবাদিক, ৫ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১২ শিক্ষক, ৬ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং ১ প্রকৌশলীর পরিচয় মিলেছে।

নিহত হয়েছে ২ পুলিশ সদস্য, ১ সেনা সদস্য, ১ বিজিবি, ২৭ নারী, ১৭ শিশু, ৯ শিক্ষার্থী, ৯ শিক্ষক, ৮৭ চালক, ১৬ পরিবহন শ্রমিক, ৫৩ পথচারী, ৩ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী।

সংগঠিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ২৮.৪৮ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৮.৭৮ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-লরি, ৭.৪১ শতাংশ কার-মাইক্রো-জিপ, ৮.৬০ শতাংশ নছিমন-করিমন-ট্রাক্টর-লেগুনা-মাহিন্দ্রা, ১০.৩৮ শতাংশ অটোরিকশা, ৭.৭১ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা-ইজিবাইক-ভ্যান-সাইকেল ও ৮.৬০ শতাংশ বাস দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

সংগঠিত দুর্ঘটনার ২৫.৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৪৪.২৫ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ১৮.৩৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, ৭.৯১ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে ও ০.৮৩ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁছিয়ে এবং ০.৮৩ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষে সংগঠিত হয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩৩.৩৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪৩.৩৩ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১৮.৩৩ শতাংশ ফিডার রোডে এবং ০.৮৩ শতাংশ রেল ক্রসিং-এ সংঘটিত হয়। মোট দুর্ঘটনার ৩.৩৩ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৮৩ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে সংঘটিত হয়।

সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিগত ঈদগুলোতে সরকারের নানা মহলের তৎপরতা থাকায় দুর্ঘটনার লাগাম কিছুটা টেনে ধরা সক্ষম হলেও কঠোর লকডাউনের কারণে মানুষের যাতায়াত সীমিত থাকার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় এবারের ঈদযাত্রায় সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। সরকার সড়কের অবকাঠামোর উন্নয়নে যতটা মনযোগী সড়ক নিরাপত্তায় ততটা উদাসীন।

দুর্ঘটনার কারণ

১. লকডাউনের কারণে এবং স্বল্প সময়ের জন্য গণপরিবহন চালু করার ফলে মহাসড়কে ব্যক্তিগত যানবাহন যেমন; প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা-ব্যাটারিচালিত রিকশা, ট্রাক-পিকআপ ও কাভার্ডভ্যানের বেপরোয়া গতিতে যাতায়াত।

২. জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় হঠাৎ ঈদে যাতায়াতকারী ব্যাক্তিগত যানের চালকদের রাতে এসব জাতীয় সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চালানো।

৩. জাতীয়, আঞ্চলিক ও ফিডার রোডে টানিং চিহ্ন না থাকার ফলে নতুন চালকরা এসব সড়কে দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে।

৪. মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।

৫. উল্টোপথে যানবাহন চালানো, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ

১. জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় অবাধে চলাচলের জন্য আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা।

২. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, যানবাহনের ত্রুটি সারানোর উদ্যোগ গ্রহণ।

৩. ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা।

৪. সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা।

৫. সড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা।

৬. সড়ক পরিবহন আইন যথাযতভাবে বাস্তবায়ন করা। ট্রাফিক আইনের অপপ্রয়োগ রোধ করা।

৭. গণপরিবহন বিকশিত করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

৮. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা।


আরও পড়ুন