ক্ষমতার লড়াইয়ে তালেবানের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব

দীর্ঘ দুই দশকের অভিযান শেষে আফগানিস্তান ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সৈন্যরা। সেই সুযোগে রাজধানী কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে দেশটির মার্কিন সমর্থিত সরকারের পতন ঘটিয়েছে তালেবান। কিন্তু বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির অভ্যন্তরে দেখা দিয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ফলে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দেশটির হামিদ কারজাই বিমান বন্দরের বাইরের গেটে ভয়াবহ বোমা হামলাকে তারই অংশ বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

আফগানিস্তানে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা একাধিক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তালেবানের সবগুলো ফ্রন্ট একাট্টা হয়ে লড়লেও দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা চলে আসায় তাদের লক্ষ্যের সমাপ্তি ঘটেছে। বর্তমানে তাদের লক্ষ্য নতুন করে যে সরকার গঠন হবে সেখানে ক্ষমতার ন্যায্য হিস্যা বুঝে নেওয়া। এ নিয়ে গোষ্ঠীটির বিভিন্ন ফ্রন্টের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ফলে দুর্বল হবে তালেবান এবং দীর্ঘমেয়দি সংঘাতে জাড়িয়ে পড়বে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি।

প্রাক্তন আফগান সরকারের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তালেবানের অভ্যন্তরে মারাত্মক বিভক্তি দেখা গেছে। দিন দিন সেটা আরও বেশি প্রকট হচ্ছে। প্রতিটি গোষ্ঠী আলাদা আলাদাভাবে বৈঠক করছে। এই গোষ্ঠীগুলোর ওপর তালেবানে কেন্দ্রীয় কোন প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ আর কাজ করছে না। সব দেখে মনে হচ্ছে, পরিস্থিতি আরও বড় সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।’

ন্যাটো সৈন্যদের আফগানিস্তান ত্যাগ এখন সময়ের ব্যাপার। ফলে, দেশটির সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বর্তাবে তালেবানের কাঁধে। অথচ তাদের সামনে রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্চ। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়, মানবিক সহায়তার দ্বার উন্মুক্তকরণে তৎপরতা, নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা আইএস এর সহযোগী সংগঠন আইএস-কেকে মোকাবিলা করা, সেই সাথে গলার কাঁটা হয়ে ঝুলে থাকা পাঞ্জশিরে আহমদ মাসউদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে বোঝাপড়া করা মতো অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তালেবানকে। এত এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিজেদের মধ্য দ্বন্দ্ব, নিঃসন্দেহে তালেবানের নাভিশ্বাস তুলবে।

স্থানীয় ও কয়েকজন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে ক্ষমতার দৌঁড়ে এগিয়ে থাকতে যে দুটি ফ্রন্ট বেশি তৎপর তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে তালেবানের হেলমান্দভিত্তিক ফ্রন্ট, অন্যটি হাক্কানি নেটওয়ার্ক। হেলমান্দভিত্তিক ফ্রন্টের দাবি- মার্কিন ড্রোন হামলায় তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাপক প্রাণহানি সত্ত্বেও তারা লড়াই চালিয়ে গেছে। ফলে, সরকার গঠনে তারা তাদের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে চায়।

অন্যদিকে, তালেবানকে অর্থায়ন এবং বর্তমানে রাজধানী কাবুলের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে হাক্কানি নেটওয়ার্ক।তালেবানের প্রধান হায়বাতুল্লাহ আখুনজাদার তিন উপ-প্রধানের অন্যতম সিরাজউদ্দিন হাক্কানী এই নেটওয়ার্কের লোক। ন্যাটো সৈন্যদের ফেলে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম তারা গোপনে সরিয়ে ফেলেছে বলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে প্রতিদ্বন্দী ফ্রন্টগুলো। এ নিয়ে তালেবান নেতৃত্বের মধ্যেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে।

এছাড়া ২০২০ সালের জুনে জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক দল সতর্ক করেছিল যে, কমপক্ষে একজন জৈষ্ঠ তালেবান নেতা ‘যেকোনো সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে একটি নতুন দল’ তৈরি করে এবং তালেবান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মার্কিনিদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে নারাজ তালেবানের এমন যোদ্ধারা ওই জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বলে বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে- পদবঞ্চিত তালেবান নেতারা বিচ্ছিন্ন সেই দলটিতে ভিড়তে পারেন। যা তালেবানের ভিতকে আরও নড়বড়ে করে দিবে।

এর বাইরে আরও একটি বিষয় তালেবানের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। তা হলো শরীয়া আইন। অতি-রক্ষণশীল কট্টরপন্থীরা শরীয়া আইনের আরও কঠোর সংস্করণ প্রয়োগের পক্ষে থাকলেও তুলনামূলক মধ্যপন্থীরা চাচ্ছেন এর ঢিলেঢালা প্রয়োগ। আর এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে, যা বিভাজনের দ্বারকে উন্মুক্ত করছে।

এছাড়া নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হোক অথবা মন থেকেই হোক তালেবানের জ্যেষ্ঠ নেতারা মার্কিনীদের হয়ে কাজ করা আফগান নাগরিকদের ক্ষমা করে দিয়েছে। এটা জ্যেষ্ঠ নেতারা মানলেও তালেবানের অন্য ফ্রন্টগুলো মানবে না। ফলে যে ভীতি নিয়ে আফগান জনগণ দেশ ছাড়ার মিছিলে যোগ দিচ্ছে, সেটা আরও প্রলম্বিত হবে এবং আফগানিস্তানে দীর্ঘমেয়াদে অশান্তির বীজ বপন হবে।

সূত্র : নিউইয়র্ক পোস্ট


আরও পড়ুন