ঋণখেলাপি মোস্তফা গ্রুপের বসতবাড়ি বাজেয়াপ্ত

একসময়ের অন্যতম ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মোস্তফা গ্রুপ দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় নাম লিখিয়েছে আগেই। গ্রুপটির কাছে ৩১ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি সাউথইস্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের একটি মামলায় গ্রুপটির সাড়ে ৬৮ শতাংশ জমি, বসতভিটা ও স্থাপনা ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত। এই রায়ের মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘খেলাপির দায়ে মোস্তফা গ্রুপের বিরুদ্ধে আদালত যে রায় দিয়েছেন, সেটা অন্য খেলাপিদের জন্য অবশ্যই কঠোর বার্তা। এই রায় থেকে খেলাপিরা এই শিক্ষা নিতে পারেন যে, ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিলে তাদেরও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্যাংকের টাকা নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি পুরনো। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এই সংস্কৃতি চলে আসছে।’

সূত্র জানায়, সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখার গ্রাহক ছিল মোস্তফা গ্রুপ। ২০২২ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত এ ব্যাংকে তাদের ঋণের পরিমাণ ১৪৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। গত তিন বছরে ঋণগুলো আদায়ের জন্য দফায় দফায় বৈঠক করেছে ব্যাংক। কিন্তু অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়েও পরিশোধ করেনি গ্রুপটি। তাই ঋণ আদায়ের জন্য গত নভেম্বরে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে একাধিক মামলা করে সাউথইস্ট ব্যাংক। এর মধ্যে গ্রুপটির সহয়োগী প্রতিষ্ঠান মোস্তফা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের নামে খেলাপি হয়ে পড়া ১৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা টাকার মামলায় গত ১০ মার্চ তাদের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন অর্থঋণ আদালত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, বড় বড় ব্যবসায়ী ও গ্রুপগুলো বেশ ক্ষমতাধর। কিন্তু আইনের কাছে সবাই সমান- এই রায় সেটারই একটা প্রতিফলন। এই রায় থেকে অন্য বড় বড় গ্রুপগুলোরও শিক্ষা নেওয়া দরকার। ঋণের টাকা ফেরত না দিলে তাদেরও মাথা গোঁজার জায়গাটুকুও হারাতে হতে পারে।

মোস্তফা গ্রুপের আরও একাধিক প্রতিষ্ঠানও সাউথইস্ট ব্যাংকের ঋণ ফেরত দিচ্ছে না। এগুলো হলো- মোস্তফা অয়েল প্রডাক্টস লিমিটেড ৮৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা, মোস্তফা পেপার কমপ্লেক্স লিমিটেড ১৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং এমএম ভেজিটেবল অয়েল প্রডাক্টস লিমিটেড ৩৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

গত বছরের ডিসেম্বরে মোস্তফা অয়েল প্রডাক্টসের বিরুদ্ধেও অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে ব্যাংকটি। এ ছাড়া মোস্তফা পেপার কমপ্লেক্স ও এম এম ভেজিটেবল অয়েল প্রডাক্টসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল হোসেন বলেন, ‘মোস্তফা গ্রুপ আমাদের ব্যাংকের কাছে তিন বছর আগে থেকেই খেলাপি। তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছি আমরা। প্রতিশ্রুতি দিয়েও টাকা ফেরত দেয়নি। এমনকি ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগও তারা নেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিকল্প না পেয়ে আদালতে অর্থ আদায়ের মামলা করি। সম্প্রতি একটি মামলায় তাদের বসতবাড়ি ক্রোক করার জন্য রায় দিয়েছেন আদালত। আদালতের রায় অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে কথা বলতে মোস্তফা গ্রুপের অর্থ-কর্মকর্তা স্বপন দাশগ্রপ্তকে ফোন করা হয়। তবে সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

একসময়কার বনেদি শিল্পগ্রুপ ছিল মোস্তফা গ্রুপ। মেধা, দক্ষতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে গ্রুপটি গড়ে তোলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান। তার মৃত্যুর পর ব্যবসার হাল ধরেন সাত সন্তান। এর মধ্যে বড় ছেলে হেফাজেতুর রহমান গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও ছোট ছেলে জহির উদ্দিন গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। অন্য সন্তানরা ছিলেন পরিচালকের দায়িত্বে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রুপের দায়িত্ব নেওয়া সাত সন্তান ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ঋণ নেওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তারা ভোগ্যপণ্য ও ভোজ্যতেল আমদানি, শিপব্রেকিং, পেপার মিলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকা ঋণ নেন। স্বল্পমেয়াদি ঋণের এসব অর্থ বিনিয়োগ করেন দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গড়ার কাজে। এ ছাড়া অর্থপাচার ও বিলাসিতায়ও অর্থ ব্যয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সুনাম থাকায় ব্যাংকগুলোও তাদের চাহিদামতো ঋণ দেয়। সেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে গ্রুপটি আজ দেউলিয়ার পথে।

জানা যায়, খেলাপি ঋণের জন্য গ্রুপটির চেয়ারম্যান, এমডি ও অন্য পরিচালকদের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা করেছে ব্যাংকগুলো। বিভিন্ন ব্যাংকের করা চারটি মামলায় গ্রুপের চেয়ারম্যান হেফাজেতুর রহমানকে ২০১৯ সালের জুনে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। যদিও বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। বাকি পরিচালকদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধেও রয়েছে পরোয়ানা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোস্তফা গ্রুপের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ৩০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ১৩৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার সাড়ে ৫৬ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার সাড়ে ৩৫ কোটি, উত্তরা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার সাড়ে ৩৩ কোটি, এনসিসি ব্যাংক আন্দরকিল্লা শাখার সাড়ে ৩১ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ২১ কোটি, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাড়ে ১৮ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের সাড়ে ১৭ কোটি, ইউসিবিএল জুবিলী রোড শাখার ১৬ কোটি ও ব্যাংক আল ফালাহ আগ্রাবাদ শাখার সাড়ে ৬ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। এর বাইরে মোস্তফা গ্রুপের কাছে সাউথইস্ট ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ২০০ কোটি, প্রাইম ব্যাংকের ৮০ কোটি, পূবালী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৬৫ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট আগ্রাবাদ শাখার ৪০ কোটি, এক্সিম ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ৪০ কোটি, রূপালী ব্যাংক লালদীঘি শাখার ২৮ কোটি, মাইডাস ফিন্যান্স লিমিটেডের ২২ কোটি টাকাসহ ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংকের বড় অঙ্কের পাওনা রয়েছে।


আরও পড়ুন