বাজেটে গুরুত্ব ৭ খাতে

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপে রয়েছে। রাজস্ব আয়ে ঘাটতির পাশাপাশি যোগ হয়েছে বিশ্বসংকট। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয়ে ঘাটতির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে অসহনীয় হয়ে উঠছে জিনিসপত্রের দাম। এমন পরিস্থিতির মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করছে, কোভিড পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে। কারণ খাত দুটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট সাতটি অগ্রাধিকার বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধ উদ্ভূত বৈশি^ক সরবরাহ সংকটে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানো। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর বাস্তবায়ন; অধিক খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ; সেচ ও

বীজে প্রণোদনা; কৃষি পুনর্বাসন ও সারে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা; ব্যাপক কর্মসৃজন ও পল্লী উন্নয়ন; শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন; সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতা সম্প্রসারণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে বিনা/স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, প্রতিটি বাজেটের একটি প্রেক্ষিত থাকে। সে ক্ষেত্রে এ বছরের বাজেটের তিনটি প্রেক্ষিত রয়েছে। প্রথমত করোনার আগে সর্বশেষ অর্থবছর ছিল ২০১৮-১৯। বর্তমানে করোনা উত্তরণের কথা বলা হলেও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। এই ঘাটতি নিয়েই ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সংকট চলছে। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিতিশীল ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

তৃতীয়ত ২০০৮-০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে বড় সংকটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর পর ১৩-১৪ বছরে এবারই সবচেয়ে চাপে বা টানাপোড়েনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। অর্থাৎ এখনো করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকট আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শক্তির জায়গা ছিল বৈদেশিক খাত। রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক সাহায্য এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ শক্তিশালী ছিল। এতে বৈদেশিক আয়-ব্যয় বা চলতি হিসাবের ভারসাম্য শক্ত অবস্থানে ছিল। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৫৫ কোটি ডলার ঘাটতি ছিল। এ বছরে মার্চে ওই ঘাটতি এক হাজার ৪০৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্রীয় সূচক হিসাবে বিবেচনা প্রয়োজন। অন্য সূচকগুলোকে সহযোগী হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর পরের বিষয় হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস হবে বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারণ কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পুরো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। যার রেশ পড়েছে বাংলাদেশে, এখানে সব জিনিসের দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী। ফলে বেড়ে গেছে মূল্যস্ফীতি। বাজেটে অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের ঘরে রাখার প্রাক্কলন করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ওপরে উঠে যেতে পারে।

আগামী অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের জন্য প্রায় ৯ হাজার ৯৩৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব সংস্থা বা করপোরেশনের প্রকল্প সংখ্যা হলো ৮৫টি। তাতে সব মিলিয়ে এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩ কোটি টাকা, যা চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির চেয়ে ১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং মূল এডিপির চেয়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।


আরও পড়ুন