বিদায় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ

সাত দশকেরও বেশি সময় ব্রিটিশ সিংহাসনে আসীন থাকার পর গত ৮ সেপ্টম্বরে ৯৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এরপর গত বুধবার থেকে ওয়েস্টমিনস্টার হলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত ছিল রানির কফিন। সেই দিন থেকে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার মানুষ রানির কফিনে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

গত বুধবার থেকে বহু মানুষ প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও রাস্তায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রানিকে। তবে দেশটির স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ওয়েস্টমিনস্টার হলে রানির কফিনে শ্রদ্ধা জানানোর সময় শেষ হয়।

বিবিসির সরাসরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্মরণে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের বাইরে ঘণ্টাধ্বনি শুরু হয়েছে। রানির আয়ুষ্কালের ৯৬ বছরকে স্মরণ করার জন্য যতক্ষণ শেষকৃত্যানুষ্ঠান চলবে, প্রতি বছরের জন্য প্রতি মিনিটে একবার করে এই ঘণ্টা বাজানো হবে।

এদিকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অতিথিরা প্রবেশ করতে শুরু করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে ব্রিটেন ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অন্তত ৫০০ নেতা অংশ নেবেন। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ স্ত্রীসহ ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে অবস্থান করছেন।

এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেনকে নিয়ে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে আসন গ্রহণ করেছেন। সিএনএনের সরাসরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানির কফিন এখন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে আনা হয়েছে।

সেখানে শেষকৃত্যের শেষের দিকে সংক্ষেপে বিউগলের সুর বাজানো হবে এরপর দুই মিনিট জাতীয়ভাবে নীরবতা পালন করা হবে। জাতীয় সঙ্গীত এবং রানির বাঁশীবাদক দল বিষাদের সুর তুলবেন। এরই মধ্যে দিয়ে দিনের মধ্যভাগে শোকসভা শেষ হবে।

এরপর দেশটির স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১৫মিনিটে রানির কফিন নিয়ে একটা শোভাযাত্রা হেঁটে হেঁটে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে থেকে ওয়েলিংটন আর্চ, লন্ডনের হাইড পার্কের কোনায় যাবে।

এই রাস্তায় সেনাবাহিনীর সদস্য ও পুলিশ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে। বিগ বেন থেকে এক মিনিট পর পর ঘণ্টা ধ্বনি করা হবে। শোভাযাত্রাটি খুব ধীরে ধীরে রাজধানীর রাস্তা দিয়ে যাবে। হাইড পার্ক থেকে প্রতি মিনিটে তোপধ্বনি করা হবে। সাধারণ মানুষ এই শোভাযাত্রা কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে দেখতে পাবেন।

এই শোভাযাত্রাটি রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ নেতৃত্ব দেবে। শোভাযাত্রাটি সাতটা ভাগে থাকবে। প্রতিটা ভাগের অগ্রভাগে থাকবে আলাদা বাদকদল। যুক্তরাজ্য এবং কমনওয়েলথের সৈন্যবাহিনী শোভাযাত্রায় থাকবে।

পুলিশ, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে। রাজা আরো একবার রাজপরিবারের সদস্যদের নেতৃত্ব দেবেন। কুইন কনসর্ট ক্যামিলা, প্রিন্সেস অব ওয়েলস, কাউন্টেস অব ওয়েসেক্স এবং ডাচেস অব সাসেক্স শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন গাড়িতে চড়ে।

পরবর্তীতে ওয়েলিংটন আর্চে দুপুর একটার সময় নতুন একটা রাষ্ট্রীয় শবযানে কফিনটি নেওয়া হবে উইন্ডসর ক্যাসেলের দিকে শেষযাত্রার উদ্দেশ্যে। এই প্রাসাদটি প্রায় এক হাজার বছর ধরে ৪০ জন রাজা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, আর রানির কাছে জীবনভর এটার একটা বিশেষ তাৎপর্য ছিল।

দেশটির সময় বেলা তিনটায় উইন্ডসর ক্যাসেলের প্রবেশের জন্য ৫কিলোমিটার দীর্ঘ লং ওয়াক-এ নামে আরেকটি শোভাযাত্রায় অংশ নেবে শবযান। এই সড়কের দুধারে সেনাসদস্যরা দাঁড়িয়ে থাকবেন। সাধারণ মানুষদের শোভাযাত্রা দেখার জন্য লং ওয়াকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। এরপর বেলা ৪টায় সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে কফিনটি নেওয়া হবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য। রাজপরিবারের সদস্যদের বিয়ে, দীক্ষা এবং শেষকৃত্য হয় এই গির্জায়।

এখানেই ডিউক এবং ডাচেস প্রিন্স হ্যারি ও মেগানের বিয়ে হয়েছিল ২০১৮ সালে। রানির প্রয়াত স্বামী প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য হয়েছিল এখানে।

অপেক্ষাকৃত কম মানুষ সমবেত হবেন এখানে। অনেকটা ব্যক্তিগত ধর্মসভা করা হবে যেখানে প্রায় আটশ অতিথি থাকবেন। এই ধর্মসভা উইন্ডসরের ডিন ডেভিড কনার পরিচালনা করবেন।

ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবির আশীর্বাদ নিয়ে সভাটি হবে। রানির রাজত্বের শেষ হিসেবে নানা ঐতিহ্য প্রতীকী হিসেবে স্মরণভায় উপস্থাপন করা হবে।

এসময় রানির মুকুট, রাজকীয় গোলক ও রাজদণ্ড শেষবারের মত সরিয়ে নেয়া হবে কফিন থেকে। এছাড়া এসময় আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতার পরা রানির কফিন রয়েল ভল্টে নামানো হবে।

বেলা ৪টা ৩৫ মিনিট শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শেষ হবে। রাজা ও রাজপরিবারের সদস্যরা চ্যাপেল ছেড়ে যাবেন। এরপর সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের অভ্যন্তরে অবস্থিত রাজা ষষ্ঠ জর্জ মেমোরিয়াল চ্যাপেলে রানিকে তার প্রয়াত স্বামী ডিউক অব এডিনবরার সাথে সমাহিত করা হবে।

তার সমাধির ওপর মার্বেলের ফলকে খোদাই করে লেখা থাকবে দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯২৬-২০২২।


আরও পড়ুন