একজন হালিমার আর্তনাদ এবং ১০০০ টাকায় কেনা সম্ভ্রমের গল্প

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ রিপোর্টঃ 

বাজারে গরুর মাংসের কেজি এখন কত জানেন? ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। দু’কেজি গরুর মাংস কিনতে আপনার পকেট থেকে বেরিয়ে যাবে প্রায় ১১০০টাকা। অথচ জানেন কি, এই দেশে আজকাল একটা নারীর সম্ভ্রম রফা হয় মাত্র ১০০০ টাকায়। কি সাশ্রয়ী, তাই না?

গোসিঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুর সিটপাড়া গ্রামের নিঃসন্তান হজরত আলী ও হালিমা বেগমদম্পতি ৮ বছর আগে তিন মাসের শিশু আয়েশাকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। পেটের সন্তানের মতোই আদর-যত্ন আর স্নেহ ভালোবাসায় বড় হচ্ছিল আয়েশা। পড়ছিল হেরাপটকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীতে।

প্রায় দুই মাস আগে একদিন হঠাৎ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে তুলে নিয়ে যায় এলাকার ফারুক হোসেন ও দুলাল মিয়াসহ তিন যুবক। সন্ধ্যায় রক্তাক্ত অবস্থায় বাচ্চা মেয়েটাকে ফেরত দেয় পাষন্ডগুলো। এই নির্যাতনের বিচার চেয়ে হজরত আলী থানায় অভিযোগ করেন। স্থানীয় ফারুক, আফসু, কুদ্দুস ও আবদুল খালেকের নামে অভিযোগ করা হয়। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে এএসআই বাবুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আলী স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেনের কাছেও এর বিচার দেন।

তারপরেই ঘটে মজার এক ঘটনা। বাংলাদেশের আর দশটা নারী নির্যাতনের ঘটনার মতো আয়েশা নামের এই বাচ্চাটার উপরে চালানো পাশবিক নির্যাতনের ঘটনাটাও ধামাচাপা দেবার জন্য নির্লজ্জ প্রস্তাব দেয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেন। হ্যাঁ, মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে এই পাশবিকতার ঘটনা ভুলে যাবার জন্য হুমকি দেয় সে। ঘৃণাভরে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর হজরত আলী ও হালিমার পরিবারের উপর নেমে আসে নানা নির্যাতন। গত ৪ এপ্রিল তাদের গরু চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। বিচার না পেয়ে আলী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। উল্টো অভিযুক্তরা তাকে নানা হুমকি দিতে থাকে।

হালিমা জানান, সর্বশেষ শুক্রবার বিকেলে তাদের একটি ছাগল বাড়ির পাশের ক্ষেতে যাওয়ার অপরাধে আলীকে মারার জন্য দা ও লাঠি নিয়ে মহড়া দেয় ওই এলাকার বোরহান ও শাহিদ। আয়েশাকে অপহরণ করারও হুমকি দেওয়া হয়। তাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য রাত ১০টা পর্যন্ত মেয়েকে নিয়ে লুকিয়ে থাকেন রাজমিস্ত্রি আলী।

প্রিয় পাঠক, স্রেফ একবারের জন্য হজরত আলীর জায়গায় আপনাকে আর ফুটফুটে আয়েশার জায়গায় আপনার আদরের রাজকন্যাটাকে ভেবে দেখুন তো! আপনি লুকিয়ে আছেন আপনার রাজকন্যাটাকে নিয়ে, কারণ বেশ কিছু নরপিশাচ আপনার মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যাবে বলে হুমকি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই অপরাধের কোন প্রতিকার নাই, বিচার চাওয়ার মতো কোন আইনের দরজা নাই, যে আইনের হাত বিচার করবে, সেই হাত অপরাধীর হাতের সাথে মিলে গেছে। কেউ নেই আপনার পাশে, বরং বিচার চাইতে গেলে মেয়েটাকে হারাবেন, মরতে পারেন নিজেও। কিছু ভাবতে পারছেন কি? মাথা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে না?

হ্যাঁ, হজরত আলীরও মাথা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। হজরত আলী বুঝে গিয়েছিলেন এই ঘৃণ্য নোংরা জঘন্য দেশের সর্বত্র এমন হাজারো নরপশু ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর বাকিরা চোখে ঠুলি পরে, কানে তুলো গুঁজে আর মুখে জিপার আটকে জম্বির মতো বেঁচে আছে। এই দেশ মানুষের না। তাই শনিবার সকালে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়েন আলী। ব্যস, সব সমস্যার সমাধান!

শনিবার দেখা যায়, রেললাইনের পাশে সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে আছে দুটি মরদেহ। এক হতভাগ্য বাবা এবং তার হতভাগ্য সন্তানের মৃতদেহ। একটু দূরেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গগনবিদারী আর্তনাদ করছিলেন আলীর স্ত্রীহালিমা বেগম। বলছিলেন- ‘আমি কিছু চাই না, তোমরা আমার মাইয়ারে আইন্যা দেও, আমার স্বামীরে আইন্যা দেও।’

দাঁড়ান দাঁড়ান, হজরত আলী আর তার মেয়ে আয়েশার আত্মহত্যাকে “স্বরাষ্ট্রস্টাইলে” বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার আগে কয়েকটা পরিসংখ্যানে চোখ বুলিয়ে আসি চলেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৩২৫টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই ৩২৫ শিশুর মধ্যে ৪৮ জন শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৩১ জন প্রতিবন্ধী বা বিশেষ শিশু, ৫ জন গৃহকর্মী শিশু। এদের মধ্যে ১৫ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

২০১৫ সালে ৫২১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ৯৯ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়, ৩০ শিশুকে ধর্ষণের পরহত্যা করা হয় এবং ৪ জন শিশু ধর্ষণের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। ২০১৪ তে ১৯৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ২২টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, ২১টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ২৩টি শিশু ধর্ষণের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। ২০১৩ এবং ২০১২ সালে যথাক্রমে ১৭০ এবং ৮৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।

এগুলো কেবল সেই সকল ঘটনা, যেগুলোর ক্ষেত্রে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাহলে এবার ভাবুন, সারা দেশে ক’জন অভিভাবক ধর্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকরার দুঃসাহস করেছেন? আর কতজন ধর্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার সাহস করেননি? কিংবা ভাবুন তো, মোট কতটি ঘটনায় অভিভাবক লোকলজ্জার ভয়ে ধামাচাপা দিয়ে ফেলেছেন? একটা অনুমান করুন তো, কত হতে পারে।

আয়েশার মা হালিমার এই গগনবিদারী আর্তনাদ কি শুনতে পাচ্ছেন কেউ? গোসিঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান সরকার বলেছেন, ইউপি সদস্যের কাছে বিচার দেওয়া হয়েছে কি-না সে সম্পর্কে জানা নেই। পুলিশ কর্মকর্তা বাবুলের ভাষ্য, স্থানীয় ফারুক শিশুটিকে জোর করে তার সাইকেলে তুলেছিল। এ সময় তার পা কেটে যায়। পরে ওষুধপত্র কিনে দেওয়া হয়। কতটা পাষণ্ড হলে, নরপিশাচ হলে মানুষ এত নির্মম আর মর্মস্পর্শী একটা ঘটনার পরেও এমন বলতে পারে? আয়েশার উপর নির্যাতনকারী, তার বাবাকে হুমকি দেওয়া এই জানোয়ারগুলোর কি বিচার হবে না? আমরা কি এতোকিছুর পরেও চলৎশক্তিহীন জড় পদার্থের মত চোখ-কান-মুখ বন্ধ করে জম্বি হয়ে থাকবো?

হালিমার আর্তচিৎকার কি আমাদের বিবেকের কর্ণদ্বারে পৌঁছাবে না?

 

সংগ্রহীত।।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০২-০৫-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ