“সিরিয়ার মানবতা কি আজ স্বার্থের কাছে হেরে যাবে!!”

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
মে ৭, ২০১৮ ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

মুক্তকলাম ।। ৩ লক্ষ ৫৩ হাজার ৯০০ মানুষ মারা যাওয়া, কোটিরও বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হওয়া আর ৫৬,৯০০ মানুষের হদিস না পাওয়ার পর; সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে আমার হাত কাপছে, বৈ কি! একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই রকম একটি পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বিশ্ব মানবতা মুখ থুবরে পড়বে সেটা কি কেউ ভেবেছিল!!  কি হবে এত সব সাস্টেইনেবল ডিভেলপমেন্ট গোলস দিয়ে!! কি হবে এই নিরাপত্তা পরিষদের মতো ফাঁকা বুলি ছুড়া বডি থেকে!! কেউ কি ভেবেছে ১৮.৫৩ মিলিয়ন মানুষের জীবন কি দুর্বিষহ আর ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে???  নারী, শিশু কিংবা নিরীহ জনগণ;  কে রেহাই পেয়েছে এই নিষ্ঠুরতা থেকে!!  কে আছে এই মানুষ গুলোর পাশে??? কে নিয়েছে এই পরিস্থিতি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ??? জাতিসংঘ??? ওআইসি??? দুনিয়ার বড় বড় দেশ যারা বিভিন্ন দেশে শান্তির কথা বলে গ্রাম্য মাতব্বরি করতে যায়; তারা কি নিয়েছে??? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র!! রাশিয়া!! কিংবা যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য কে নেতৃত্ব আর শোষণ করতে চায়, তারা কি নিয়েছে কোন পদক্ষেপ??? সৌদি আরব!! ইরান!! তুরস্ক!!   

এই যে সিরিয়ায় চার দলের (বাশার আল আসাদের সরকারী বাহিনী/বিদ্রোহী গোষ্ঠী/কুর্দি বাহিনী/আইএস জঙ্গি গোষ্ঠী)  মধ্যে যুদ্ধ চলছে কেউ কি স্বার্থের বাহিরে গিয়ে যুদ্ধ নিরসনে কাজ করেছে!! আদৌ কি সেই ইচ্ছে বা আশার বানী শুনা গেছে!! যায়নি। বরং যে যার মত করে নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়নে একটি দলকে অন্য দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছে। এই ধরুন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব আর ইসরায়েলের কথাই যদি বলি, তাহলে দেখবেন দেশ তিনটি,  বিদ্রোহী গোষ্ঠী কে সমর্থন দিয়েছে, শুধু সমর্থন-ই দেয়নি সাথে অস্রের যোগানও দিচ্ছে। সৌদি তাঁর চির প্রতিদ্বন্দ্বী শিয়া রাষ্ট্র ইরানকে ঠেকাতে চায়। তারা রাশিয়ার, আর ইরানের বলয় থেকে সিরিয়াকে মুক্ত করতে চায়।

অন্যদিকে রাশিয়া এবং ইরান চায় বাশার আল আসাদ সিরিয়ায় ক্ষমতার মসনদে বসা থাকুক। তাহলে যে তাঁদের স্বার্থ বজায় থাকে। উভয় দেশ বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী গোষ্ঠী (সুন্নি মুসলিম) দমনে লেবানননের ইসরাইল বিরোধী হিজবুল্লাহ কে ব্যবহার করছে। হিজবুল্লাহ আর আসাদের বাহিনী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে লড়ে যাচ্ছে। হিজবুল্লাহ মনে প্রানে ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী। অন্যদিকে ইরানের ইসরায়েল বিরোধী নীতি আর পারমাণবিক কর্মসূচির কারনে ইসরায়েল এই যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বাশার আল আসাদের সরকারকে অস্ত্রের যোগান, সৈন্য প্রেরন থেকে শুরু করে কত যে সমর্থন দিয়েছে ইরান আর রাশিয়া, তাঁর হদিস আজও কেউ খাতা কলমে হিসেব করে কষতে পারেনি।  

সিরিয়া নিয়ে কেন সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, তুরস্কের এত দ্বন্দ্ব?? সেটার উত্তর একটাই- “গ্যাস লাইন”। রাশিয়া রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত “গ্যাযপ্রম” কোম্পানি ইউরোপের ৮০% গ্যাসের সাপ্লাই দিয়ে থাকে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় রাশিয়ার উপর ইউরোপের নির্ভরতা কমাতে সেই সাথে রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে। তাই ২০০৯ সালে “কাতার-টু- ইউরোপ” এ পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস  সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রোজেক্টটি একাধারে সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তুরস্কও চায় রাশিয়ার উপর গ্যাসের নির্ভরতা কমাতে। কিন্তু বাশার আল আসাদ রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতার দরুন এই প্রকল্পে স্বাক্ষর করেননি বরং ‘ইরান-টু-ইউরোপ’ প্রোজেক্ট এ ২০১২ সালে স্বাক্ষর করেন। ইরান তাঁর গ্যাস ইরাক, সিরিয়া আর ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে বিক্রি করতে চায়। স্বল্প গ্যাসের এই প্রোজেক্ট কে রাশিয়া স্বাগত জানায় কারন ইরান তাঁর মিত্র দেশ। কিন্তু সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র আর তুরস্ক এটা মেনে নেয়নি।

সিরিয়া ইস্যুতে তুরস্কের চিন্তা আবার অন্য জায়গায়। রিসেপ তাইপে এরদোগানের দেশ যে ২০% কুর্দি জনগোষ্ঠীর মত বিষফোড়ায় আক্রান্ত সেটা কি তিনি অস্বীকার করতে পারবেন!! সেই জন্য তিনি সিরিয়ার ৯% কুর্দি জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহকে সন্দেহের চো

খে দেখেন। তাই এরদোগান তাঁর সীমান্তে থাকা সিরিয়ার‘আফরিন’ অঞ্চলে কুর্দি দখল নিয়ে খুব-ই উদ্বিগ্ন হয়েছেন এবং কুর্দি বিরোধী আক্রমনও চালিয়েছেন চলতি বছরে।  

এই বার আসি সিরিয়ায় কেন এই বিদ্রোহ, এই প্রসঙ্গে। বাশার আলা আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদ সিরিয়ার ক্ষমতায় আসেন ১৯৭১ সালে। তিনি ছিলেন একজন সামরিক নেতা। আরব-ইসরায়েল ৪র্থ যুদ্ধে তিনি ইসরায়েলের দখলদারিত্ব থেকে গোলান মালভূমি রক্ষা করেছিলেন। সেই জন্য সিরিয়ায় তিনি নারী-পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সবার কাছে একজন সত্যিকারের নায়ক হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এই বীরত্ব খুব বেশি দিন জনগনের মনে জায়গা করে নিয়ে পারেনি। ১৯৮১ সালে সিরিয়ায় হামায় ৮ হাজার সুন্নি মুসলিম হত্যা করেছিলেন। এর পর থেকেই তিনি সুন্নিদের চোখে আর বীর থাকেননি বরং হয়েছেন খলনায়ক।

২০০০ সালে হাফিজের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে আসাদ ক্ষমতায় আসেন। সেও একই পথে হাটতে থাকেন। তিনিও সুন্নি আর কুর্দিদের দমন-পীড়ন করতে থাকেন। সুন্নি আর কুর্দিরা বেকারত্বের শিকার হতে থাকে। এই খানে উল্লেখ না করলে ভুল হবে যে, সিরিয়ায় ৫৯% সুন্নি মুসলিম , বাশার আল আসাদ কে মেনে নাওয়ার আরেকটি কারন আছে, সেটা ধর্মীয় বলেই আমার ধারণা। কারন আসাদ একজন প্রো-শিয়া যিনি ‘আলিওয়েইট’ গোষ্ঠীর; এই গোষ্ঠীটি সিরিয়ায় মোট জনসংখ্যার ১১% হওয়া স্বতেও দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ায় উচ্চ আসনে থেকে সুন্নিদের নিপীড়ন করতে থাকে। ‘আলিওয়েইট’ গোষ্ঠী ইসলামের ৫ স্তম্ভ কে হালকা ভাবে দেখে এবং তারা মনে করে ইসলামের স্তম্ভ আরও দুটি রয়েছে- একটি ‘জিহাদ’ অন্যটি হযরত আলী (রাঃ) কে স্রষ্টা মনে করা। তারা মসজিদ থেকে বিমুখ, মদ কে তারা হালাল  মনে করে; যেই গুলো সুন্নি মুসলিমরা অপচ্ছন করে। সেই জন্য এক-গ্রুপ অন্য গ্রুপের ঘোর বিরোধী। আর বাসার আল আসাদ ও ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাননা। ছাড়লেই তো পূর্বের মতো ‘আলিওয়েইট’ গোষ্ঠী নিপীড়নের স্বীকার হবে।

খড়ার কারনে দেশটিতে যখন বেকারত্ব, দুর্নীতি তীব্র আকার ধারন করে ঠিক তখন আরব বসন্তের ঢেউ সিরিয়ায় আঁচড়ে পড়ে। সেই থেকেই ২০১১ সালের মার্চ মাসে আসাদ বিরোধী জনগনের ঢল রাস্তায় নেমে পড়ে; কিন্তু আসাদ সেই মিছিলে গুলি নিক্ষেপ করে। ফলে একই বছর জুনে সুন্নিরা আসাদের বিরুদ্ধে “ফ্রি সিরায়ান আর্মি” গঠন করে।

অন্যদিকে সিরিয়ার ৮.৯% কুর্দিরা তারা অনেক বেশি লিবারেল। তারা ধর্ম নিরপেক্ষ কুর্দিস্তান চায়। সেই জন্য তারাও সুন্নিদের সাথে তেমন ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারেনি। এই সুযোগটি নিয়েছে- বাশার আল আসাদ। আসাদ কুর্দিদের কে তাঁর বিপক্ষ অবস্থান নেওয়া থেকে কিছু সুবিধে দিয়ে  নিরপেক্ষ রেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর সিরিয়ায় আইএস জঙ্গি দমনে কুর্দিদের ব্যবহার করেছে। ফলে উত্তর সিরিয়া এখন কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। অন্যদিকে, আলকায়েদা তাঁর শাখা হিসেবে আল নুসরা ফ্রন্ট কে আসাদের বিপক্ষে ব্যবহার করছে। আল-নুসরা ফ্রন্ট কে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যেই অনেকটা ফেলা যায়। আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীও আসাদের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে।

এত সব জটিল পরিস্থিতিতে সিরিয়া আজ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিগণিত হয়েছে। জাতিসংঘ যখন-ই কোন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে ঠিক তখন-ই রাশিয়ার স্বার্থ বিরোধী হলে সে ভেটো দিয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিষদে কোন কার্যকরী রেজুলুশন পাশ করানো সম্ভব হয়ে উঠেনি। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়- তাহলে কি আজ মানবতা ভেটো তে সীমাবদ্ধ?? এই নিরীহ মানুষ গুলো কি তবে মুক্তি পাবে না!! পাবে না বাঁচার অধিকার!!!

স্বার্থের বাহিরে গিয়ে- সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

“রক্ষা পাক হিউমিনিটি, নিপাত যাক অত্যাচারী”

 

লেখক : মোঃ ইয়ামিন হোসাইন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

 

Comments are closed.