লিচুর গ্রাম মঙ্গলবাড়িয়া

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
মে ২০, ২০১৮ ৮:৪০ অপরাহ্ণ

মঙ্গলবাড়িয়া থেকে ফিরে আমিনুল হক সাদী (নিজস্ব প্রতিবেদক) ।। “পুকুরের ঐ কাছে না/লিচুর এক গাছ আছে না/হোথা না আস্তে গিয়ে/য়্যাবড় কাস্তে নিয়ে/গাছে গো যেই চড়েছি”। ছোট এক ডাল ধরেছি….জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই লিচু চোরের কবিতাটির মতো মঙ্গলবাড়িয়া নামে একটি গ্রাম দেখা গেল। মিল পাওয়া গেল সেই কবিতার চরিত্রের কিছু লোকেরও। কিছু বাচ্চা কাচ্ছা লিচু গাছে লিচুর জন্য ঢিল ছুঁড়ছে আর লিচু গাছের মালিক তেড়ে এসে আড়াঙ্গি দিচ্ছেন। রবিবার পাকুন্দিয়া উপজেলার মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেল লিচুর এই বিশাল বাগান। দেশ সেরা লিচুর নাম মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু। রসে টুইটম্বুর। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। খেতে সুস্বাদু। আকারে বড়। বাতাসের তালে,গাছের পাতার ফাঁকে লাল হয়ে দোলছে আর দোলছে। দেখে যেন জিভে জল এসে যায়। বাজারে অনেক জাতের লিচু উঠলেও লোকজনের চোখ থাকে কিশোরগঞ্জের মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর দিকে। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরাও যেকোনো লিচুকেই মঙ্গলবাড়িয়ার বলে চালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু বাজারে খুব একটা পাওয়া যায় না। বাগান থেকেই কাড়াকাড়ি করে নিয়ে যায় লোকজন। রসালো, সুমিষ্ট, সুন্দর গন্ধ ও গাঢ় লাল রঙের বৈশিষ্ট্যের কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। এবার এ লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই জেলার পাকুন্দিয়া পৌর এলাকার মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের বাগানগুলোতে ‘লিচুবিলাসীদের’ আনাগোনা বেড়ে গেছে।

মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের সবচেয়ে বড় লিচু চাষি তৌহিদুর রহমান। তাঁর ১২৮টি লিচু গাছ আছে। এবার ফলন ভালো হওয়ায় অন্তত ১০ লাখ টাকার লিচু বেচবেন বলে আশা করছেন। তিনি জানান, এর মধ্যে অর্ধেক গাছ তিনি গাছের মালিকদের কাছ থেকে এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন। খরচ বাদ দিয়ে এ মৌসুমে পাঁচ লাখ টাকা লাভ থাকবে বলে মনে করছেন তিনি।

দেখা গেছে, বাজারের সাধারণ ১০০ লিচু ২০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও মঙ্গলবাড়িয়া লিচু দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। লিচু চাষিরা জানিয়েছে, লিচুর জন্য অনেকে আগাম টাকা দিয়ে রেখেছে তাদের। শুধু দেশে নয়, বিদেশে আত্মীয়স্বজনের কাছেও পাঠানো হচ্ছে এ লিচু। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে ৪০০-৫০০ কৃষকের অন্তত ছয় থেকে সাত হাজার লিচুগাছ আছে।

অন্তত ২০০ বছর আগে এ গ্রামে লিচু চাষ শুরু হয় বলে জানা যায়। পরে তা পুরো গ্রাম এমনকি আশপাশেও ছড়িয়ে পড়ে। সাফল্য দেখে অনেক কৃষক ধানি জমিতেও লিচুর বাগান গড়ে তুলেছে।

লিচু চাষের ইতিহাস পর্যলোচনা করলে জানা যায়, এই গ্রামে প্রখ্যাত ধর্ম প্রচারক মঙ্গলল শাহ আগমন করেছিলেন। যিনি বর্তমান মঙ্গলবাড়িয়া ঈদগাহের স্থানটিতেই বসে মানুষকে দীক্ষা দিতেন। এ বিষয়ে মঙ্গল শাহের বংশের অধস্তন পুরুষ শামসুদ্দোহা মেম্বার বলেন,মঙ্গল শাহ একবার পিতা মাতার সাথে রাগ করে সুবিশাল গাছের ছায়ায় ধ্যান মগ্ন হয়ে বসেছিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে পানি বের হতে হতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে মা বাবা সেখানে ছুটে যান। পিতা মাতার আগমন টের পেয়ে তিনি বলেন আমাকে স্পর্শ করো না।আমি অন্ধ হয়ে গেছি। পরে তাকে স্পর্শ করা হলে সাথে সাথেই চোখ ভালো হয়ে যায়। মঙগল শাহের নামানুসারেই এ গ্রামের নাম মঙ্গলবাড়িয়া রাখা হয়েছে। আর এই পরিবারেই প্রথম লিচুর আবাদ করেছেন বলে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু নামে অভিহিত হয়েছে। বর্তমানে শামসুদ্দোর পরিবারের এক ছেলে রুহুল আমীন শিক্ষকতা করছেন। দিতীয় ছেলে শামীম বর্তমানে কাউন্সিলর । আরেক ছেলে রাজীব ও এক মেয়ে শিক্ষকসহ আরও চার মেয়ে রয়েছেন। এই গ্রামের সুলতান মিয়া বলেন,আমাদের পুর্বসুরীদের রেখে যাওয়া লিচু গাছেই এখনও অনেক লিচু হচ্ছে। যা স্থানীয় বাজারে নেওয়া আগেই পাইকার রা নিয়ে যায় এখান থেকেই। আবুল হাশেম মেম্বার বলেন,মঙ্ঘল শাহ নামে একজন বিখ্যাত মোমিন লোক এখানে বসবাস করতেন। কিন্ত তার কবরের কোন চিহ নেই এখানে। লিচু ব্যবসায়ী খন্দকার রেজা শাহ পাহলবী বলেন, মঙ্গল শাহ নামে এখানে কোন কবর নেই। তার কোন ইতিহাস নেই। এখানের মাটি খুবই ভালো ফলে লিচু সুস্বাদু হয়ে থাকে।

মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী সবুজ জানান, কেবল কিশোরগঞ্জ নয়, দেশের অন্যান্য জেলায়ও মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর বাড়তি চাহিদা রয়েছে । আর এ কারণেই লিচুর মৌসুমে স্থানীয় বাজারে এসব লিচু পাওয়া যায় না। চলে যায় দেশের বড় বড় জনবহুল শহরে। দামও অন্য জাতের লিচুর চেয়ে বেশি। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু আকারে যেমন বড় হয়, রঙে, স্বাদে-গন্ধেও হয় ব্যতিক্রমী গুণের অধিকারী। যে কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর একটি বাড়তি কদর ও চাহিদা রয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, ব্রিটিশ আমলে এ গ্রামের জনৈক দারোগা সদূর চীন থেকে এই জাতের লিচু সর্বপ্রথম রোপণ করেন। এরপর থেকে এ লিচুর স্বাদ, গন্ধ, সুস্বাদু দেখে পুরো মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে লিচু চাষ। এ গ্রামের অনেকেই লিচু চাষে এখন স্বাবলম্বী। গ্রামের প্রায় শতাধিক লিচু চাষির সহস্রাধিক লিচু গাছ রয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে, মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতেই কমবেশি লিচু গাছ রয়েছে। দিনদিন এর ব্যাপকতা বেড়েই চলছে। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর সঠিক জাত জানা সম্ভব হয়নি। তবে গ্রামের নামানুসারে একে ‘মঙ্গলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী লিচু বলে দেশে খ্যাতি অর্জন করেছে।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কিশোরগঞ্জে যোগদানের পরই মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুবাগনগুলো পরিদর্শন করে অভিভূত হয়েছি। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুবাগান গুলোতে কৃষকরা কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করে না। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে এর রোগবালাই দমন করে তারা। এ কারণেও হয়তো এ লিচুর এত জনপ্রিয়তা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া