আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে যথেষ্ট সতর্কতার পরামর্শ

ডেস্ক রিপোর্ট , মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ
সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮ ৮:০৭ অপরাহ্ণ

আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন জরিপের বরাত দিয়ে তারা বলেছেন, আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের পর আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়।

বৃহস্পতিবার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ‍মিলনায়তনে এক কর্মশালায় এ পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেন, আত্মহত্যার সংবাদ এমনভাবে পরিবেশন করা উচিত, যাতে এর দ্বারা অন্যরা প্রভাবিত না হয়। যাতে অন্যরা সংবাদ পড়ে আত্মহত্যার পথে না এগোয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু নির্দেশনা মেনে সংবাদ পরিবেশনেরও পরামর্শ দেন তারা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ‘ওয়ার্কশপ অন রেসপন্সিবল রিপোর্টিং অব সুইসাইড ফর মিডিয়া প্রফেশনালস’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মোহিত কামাল বলেন, আমরা টিকটিকি-তেলাপোকার মরার খবর রাখি, কিন্তু নিজের ঘরের মানুষের মনের খবর রাখি না। নিজের আশপাশের মানুষগুলোর মনে খবর রাখতে হবে। যারা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কাউন্সিলিং করে আত্মহত্যার পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে। যদি আগে থেকেই বোঝা যায়, কেউ আত্মহত্যার পথে হাঁটছেন, তাহলে তাকে বুঝিয়ে ওই পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

আত্মহত্যার খবর প্রকাশের ব্যাপারে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে সংবাদ পরিবেশনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, আত্মহত্যার খবর ফলাও করে প্রকাশ না করে, এমনভাবে প্রকাশ করা, যাতে এর দ্বারা কেউ প্রভাবিত না হয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ফারুখ আলম বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে আলাদা পলিসি হওয়া দরকার। আত্মহত্যা প্রতিরোধে এ ধরনের আলোচনা বেশি বেশি হওয়া দরকার। যত বেশি আলোচনা হবে, সবাই তত বেশি এ সম্পর্কে জানবে। জানলে সচেতন হবে। আর সচেতন হলে প্রতিরোধও বাড়বে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। বছরে করে ৮ লাখ। ২০২০ সালে এই সংখ্যা হবে দ্বিগুণ- প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ। আত্মহত্যার ঝুঁকিতে ১ নম্বরে কৃষক, দুই নম্বরে চিকিৎসকরা।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বলেন, আত্মহত্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো জরিপ নেই। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি লাখে ১০ থেকে ৩৯.৬ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। আামদের দেশে নারী, কম বয়সী ও বিবাহিতদের মধ্যে আত্মহত্যা বেশি হয়ে থাকে। গলায় দড়ি ও বিষপান আত্মহত্যার অন্যতম প্রদ্ধতি। ২০১৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, শুধু বিষপান আর ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার ঘটনা ১০ হাজার ১২৯টি। বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। এদের বেশিরভাগের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন। যাদের বেশিরভাগই অল্প বয়সী এবং প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী।

এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, যেকোনো ব্যক্তির মৃত্যুর  প্রথম ২০টি কারণের মধ্যে আত্মহত্যা অন্যতম। ১৫ থেকে  বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ আত্মহত্যা। ৭৯ শতাংশ আত্মহত্যা ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। প্রতি একটি আত্মহত্যায় ১৩৫ জন কোনো না কোনোভাবে  মানসিক যন্ত্রণা বা অন্যভাবে আক্রান্ত হয়। যত জন মানুষ আত্মহত্যা করে তার চেয়ে ২৫ গুণ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আর তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে।

আত্মহত্যার সংবাদ কেমন হবে, সে সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনার বরাত দিয়ে ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সংবাদটি প্রথম পৃষ্ঠায় বা অন্যত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রকাশ করা যাবে না। শিরোনামে এমন কোনো শব্দ বা বাক্যরীতি ব্যবহার করা উচিত নয় যা পাঠক বা  দর্শককে উদ্দীপনার খোরাক দেয়। আবার এমনভাবেও প্রকাশ করা যাবে না যে আত্মহত্যা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুমাত্র। শিরোনামে যেন এমন কোনো বার্তা না থাকে যাতে মনে হয়, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান।

তিনি বলেন, কীভাবে একজন আত্মহত্যা করেছে বা করার চেষ্টা করে কেন ব্যর্থ হয়েছে সে বিষয়ে যেন বিস্তারিত বিবরণ সংবাদে না থাকে। এ ধরনের বিবরণ ভবিষ্যতে আরো একজনকে একটি সফল আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আত্মহত্যার স্থান নিয়ে যেন কোনো সংবাদ না থাকে। তবে স্থানটিকে নিরাপদ রাখতে প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষকে আলাদা করে জানানো যেতে পারে। আত্মহত্যার পরে মৃতদেহের  ছবি বা ভিডিও ফুটেজ কোনোভাবেই প্রকাশ করা উচিত নয়। সেলিব্রেটি ব্যক্তিদের আত্মহত্যার সংবাদ দ্বিগুণ সতর্কতা নিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

আত্মহত্যাকারীর পরিবারের নিকটজনের শোকের বিষয়টি  গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। এমন শব্দ বা তথ্য দেওয়া যাবে না যাতে নিকটজনদের শোক আরো ঘনীভূত হয় এবং তাদের মধ্যে আত্মহত্যার ইচ্ছা জেগে ওঠে। পরিবার ও স্বজনদের স্বাক্ষাৎকার নেওয়ার বিষয়ে অতি সংবেদনশীল ও সতর্ক হতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. হাসিনা মমতাজ বলেন,  পাঁচটি প্রথম শ্রেণির পত্রিকার কয়েক মাসের ৬২টি ঘটনার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা গেছে, ৬৯ শতাংশ কেসে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে আত্মহত্যাকে সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে। আত্মহত্যার পদ্ধতি হাইলাইট করা হয়েছে। ৭৩ শতাংশ কেসে লোকেশন উল্লেখ করা হয়েছে। ৬২টির মধ্যে ১০টি কেসে ছবি বা ভিডিও দেখানো হয়েছে। এসব নেতিবাচক বিষয়ের মধ্যেও মিডিয়ার ইতিবাচত দিকগুলো হচ্ছে- কয়েকটি প্রতিবেদনে এর প্রতিরোধে কোথায় যেতে হবে, কারা কাজ করছে, প্রতিরোধের উপায় তুলে ধরা হয়েছে।

আলোচকরা বলেন, আমাদের দেশে আত্মহত্যাকে এখনো অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। আসলে এটিকে অপরাধ ইস্যু হিসেবে না ধরে এটিকে স্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাউন্সিলিংয়ের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে একটি হটলাইন চালুর দাবি জানিয়েছেন আলোচকরা।

Comments are closed.