শ্রদ্ধেয় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমানের গল্প

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্কঃ মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান আমাদের অহংকার। যশোর জেলার সদর উপজেলার গাঁওঘরা গ্রামের গোলাম আলী মোল্যা ও রত্নগর্ভা সখিনা খাতুন দম্পতির ১১ সন্তানের মধ্যে সিদ্দিকুর রহমান সবার ছোট।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় ,সিদ্দিকুর রহমান যশোরের, ইছালি প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস ফাইভের ছাত্র। চারিদিকে যুদ্ধের বিভীষিকাময় দাউদাউ করে জ্বলছে। বড় ভাই জিন্দার আলী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য ১৯৭১ সালের জুন মাসে মা বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। অনেক দিন পর মা বাবা ও ভাই বোনদের খবর নিতে জিন্দার আলী ফিরে আসে তার প্রিয় গ্রাম গাঁওঘরায়। মুহুর্তে এ খবর পৌঁছে যায় রাজাকারদের নিকট। রাজাকাররা ছুটে আসে জিন্দার আলীকে ধরতে। জিন্দার আলী ইতোমধ্যে ছোট ভাই সিদ্দিককে নিয়ে পার্শ্ববর্তী বাগানে নিরপদ আশ্রয়ে চলে যায়। রাজাকাররা সিদ্দিকদের বাড়ী আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে সারারাত নির্ঘুম কাটে দুই ভাইয়ের।
পরদিন ভোরবেলা পিতা গোলাম আলী তার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান জিন্দার আলীর হাতে প্রাণের টুকরো ছোট ছেলে দূরন্ত বালক সিদ্দিককে তুলে দেয় ভারতে নিয়ে যাবার জন্য। খাল বিল মাঠ পেরিয়ে মাইলের পর মাইল দুই ভাই হাঁটতে থাকে সীমান্তের দিকে। শিশু সিদ্দিকের দু’পায়ের নীচে ফোসকা পড়ে যায়, ব্যথায় পা টন টন করে-তবুও সে থামে না। ক্লান্ত শরীরে এক সময় সিদ্দিক বড় ভাইয়ের হাত ধরে পৌঁছে যায় ভারতের বনগা’র চাপাবেড়ে ক্যাম্পে। সেই ক্যাম্পের কমান্ডার ছিলেন তার ভগ্নিপতি জাহাতাব উদ্দিন। সিদ্দিক জাহাতাবকে দেখে আনন্দে বলে, দুলাভাই আমি যুদ্ধ করব। এ কথা বলেই সে বাঁশের লাঠি নিয়ে অন্যান্য প্রশিক্ষণার্থী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে লেফট্ রাইট শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখাতে সে লাইনে দাঁড়ায়। দাঁড়ালে কি হবে-সে যে শিশু। কাজেই তার নাম বাদ পড়ে। সিদ্দিক কাঁদতে থাকে-তার কান্না আর থামে না।

নাছোড়বান্দা সিদ্দিক! এবার পার্শ্ববর্তী বারাকপুর ক্যাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়ায়। ক্যাপ্টেন মুখার্জী এই ক্যাম্পের প্রধান। শিশু সিদ্দিককে দেখে তিনি রীতিমতো অবাক হন। তিনি শিশু সিদ্দিককে বুঝাতে থাকেন তার দ্বারা এই কঠিন কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সিদ্দিকের একই কথা, আমি যুদ্ধ করবো। কারণ তার চোখে তখন ভাসছে তাদের বাড়ীর লেলিহান শিখা। এক পর্যায়ে ক্যাপ্টেন মুখার্জী সিদ্দিকের বুকে জোরে এক থাপ্পর মারে তার শক্তি পরীক্ষার জন্য-অপ্রত্যাশিত থাপ্পর খেয়ে সিদ্দিক লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। সে বাদ পড়ে এই ক্যাম্প থেকেও। এই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য একটি লরিতে (ট্রাক) বোঝাই করে বীরভূম নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সিদ্দিক ওই লরিতে উঠে পড়ে। সিদ্দিকের অসীম সাহসিকতার কারণে তাকে অবশেষে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তালিকাভূক্ত করা হয়। বীরভূমে যুদ্ধের ট্রেনিং নেয় ২৮ দিনের। ট্রেনিং শেষে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তার ভাই জিন্দার আলী চাচা তবিবর রহমান সহ সিদ্দিককে একটি ট্রাকে করে চৌগাছার ধূলিয়ানি সীমান্তে প্রেরণ করা হয়।
ধূলিয়ানি রণাঙ্গনে অকুতোভয় সিদ্দিক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই অপারেশনে সিদ্দিকুর রহমানের এর বড় ভাই ও চাচা সহ অনেক যোদ্ধা শহীদ হন কিন্তু নদীতে ঝাপ দিয়ে প্রানে রক্ষা পান সিদ্দিকুর রহমান। সিদ্দিক একা হয়ে পড়ে। যুদ্ধে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। সিদ্দিক বাড়ী ফেরে স্বাধীন দেশের লাল সবুজ পতাকা উড়িয়ে বীরযোদ্ধার বেশে। শহীদ বড় ভাই আর চাচাকে হারিয়ে সিদ্দিক বাড়ীতে এসে দেখে তার স্নেহময় পিতা রাজাকারদের অত্যাচারে মৃত্যু পথ যাত্রী। এক সময় তার পিতাও সেই অত্যাচারের ফলে ধুকে ধুকে মৃত্যু বরণ করেন। শিশু মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক হয়ে পড়ে একেবারে অসহায়।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়। শুরু হয় সিদ্দিকের জীবনযুদ্ধ। জীবনযুদ্ধেও সিদ্দিক হার মানতে রাজী নয়। তাই তিনি অন্যের বাড়ী লজিং থেকে শুরু করে লেখাপড়া। কখনো কখনো টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হতো। এমনিভাবে এই শিশু বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক জীবনযুদ্ধেও জয়ী হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইতিহাস বিষয়ে বি,এ (অনার্স) এম,এ পাশ করে। বর্তমানে তিনি পরিবার পরিকল্পনার একজন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড সরকারী কর্মকর্তা। এই পদে চাকুরীর পূর্বে তিনি চট্টগ্রাম তেল কোম্পানী, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ রেলওয়ে, এজি অফিস ও কলেজে অধ্যাপনার চাকুরী করেছেন।
অসীম সাহসী বীরসেনানী মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১১ বছর। এতো অল্প বয়সেই তিনি বিদেশের মাটি ভারতে উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা (এফ, এফ)। সিদ্দিক শুধু একা নন তার পুরো পরিবারটাই ছিলো মুক্তিযোদ্ধা। এটাও একটা বিরল বিষয়। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে শহীদদের তালিকায় তার আপন বড় ভাই ও চাচার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রতিমাসে তাদের পরিবার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা পেয়ে থাকেন।
শিশু মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক তার সাহসিকতার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন জীবদ্দশায় পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে অন্তর্ভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চলচ্চিত্রকার তানভির মোকাম্মেল মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেন্টরী ছায়াছবিতে (স্মৃতি ১৯৭১) মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সিদ্দিকের চিত্র ধারণ করেন।
সূত্র- গেরিলা ১৯৭১