মূল সংবাদে যান
২৪ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার করুন

যুদ্ধাহত এক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছকাই মিয়া

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ৬৫ বার পঠিত ৫ মিনিটের পাঠ

freedom-fighter-chokai-sylhet
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্ক, হাবিব আহমদ দত্তচৌধুরী: আমাদের এলাকায় ছকাই মিয়া নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন (গেজেট নং-৮১০)। উনাকে আমরা ছকাই ভাই বলেই ডাকি। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনেক দুঃসাহসী কীর্তি আছে। আত্মপ্রচারবিমুখ এ লোকটির বীরত্বগাথা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক মূল্যবান সম্পদ। এসব নিয়ে বই আকারে কিছু লিখার ইচ্ছা থাকলেও অাপাতত অতি সংক্ষিপ্তভাবে তাঁর সম্পর্কে সমান্য একটু আলোকপাত করবো।

ছকাই মিয়া ১৯৪০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার দক্ষিণ দুবাগ গ্রামে এক গৃহস্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৃত সৈয়দ আলী ও মাতা তছিয়া বেগমের তিন পুত্রসন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। যুবক বয়সে তিনি পূর্বপাকিস্তান মুজাহিদ বাহিনীর সদস্য হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী ছকাই মিয়া রাইফেল চালনায় ছিলেন খুবই পটু। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তাঁর হৃদয়কে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য আন্দোলিত করে তোলে। ২৬ মার্চ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এসময় ছকাই মিয়া সিলেট শহরের খাজাঞ্চিবাড়ি কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে কয়েকজন সাথীসহ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারতের আসামে পালিয়ে যান এবং করিমগঞ্জ টাউন হলে অন্যান্য মু্ক্তিযোদ্ধাদের সাথে শামিল হন। সেখান থেকে কমান্ডার মেজর সি.আর. দত্ত-র নির্দেশে তিনি কলকলিঘাট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে নবাগত যুবকদের সশস্ত্র প্রশিক্ষক হিসেবে মাসখানেক দায়িত্ব পালন করেন। জুন মাসের দিকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর নির্দেশে তিনি আসামের লোহারবন্দ ট্রেনিং সেন্টার থেকে একমাস উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে এম.এফ.-এর সদস্যভুক্তি লাভ করেন। কর্তৃপক্ষ তাঁর সামরিক দক্ষতা ও যোগ্যতা বিবেচনায় তাঁকে ৫০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্লাটুনের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করে অাগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়েকটি গেরিলা অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে বাংলাদেশে প্রেরণ করে। তাঁর প্লাটুনটি ইনজেকশন পার্টি নামে পরিচিত ছিল।
ছকাই মিয়া বেশকয়েকটি অপারেশনে সাহসিকতার পরিচয় দেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আমাদের পার্শ্ববর্তী গোলাপগঞ্জ থানার সুন্দিশাইল যুদ্ধ। সুন্দিশাইল গ্রামে পাকশত্রুর একটা শক্ত অবস্থান ছিল। ১৮ আগস্ট শেষরাতে ছকাই মিয়া তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে কৃষকবেশে সুন্দিশাইল অভিমুখে রওয়ানা দেন। ১৯ তারিখ দুপুরের দিকে তারা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেয়ে কৌশলে সুন্দিশাইল গ্রামে পৌঁছে বিভিন্ন ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে অবস্থান নেন এবং শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকেন। এভাবে তারা হঠাৎ আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে থাকেন। বিকাল অনুমান ৪টার দিকে তারা এক সুযোগে শত্রুর উপর ঝটিকা আক্রমণ শুরু করেন। শুরু হয়ে গেল তুমুল যুদ্ধ। প্রায় দেড়ঘন্টা যুদ্ধ চলে। শত্রুর বিরাট একটি দলকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে সক্ষম হয় ছকাই মিয়ার ক্ষুদ্র প্লাটুনটি। প্রায় দুশতাধিক শত্রু হতাহত হয়। তিনজন মুক্তিসেনা শহীদ হন। এ যুদ্ধে ছকাই মিয়া আহত হন। তাঁর মাথায় ও বাম হাতে মর্টারের শেলের আঘাত লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় সহযোদ্ধারা তাঁকে করিমগঞ্জ পি.কে. হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সেখানে সপ্তাহখানেক চিকিৎসায় থেকে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার রণাঙ্গনে ফিরে আসেন।
৪নং সেক্টরের অধীনে তিনি আরও বেশকয়েকটি অপারেশনে অংশ নিয়ে সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। সিলেটের কানাইঘাট, চিকনাগুল বাগান, হেমু, মোকামটিলা প্রভৃতি এলাকায় পাকশত্রুর ত্রাস হিসেবে তিনি খ্যাত হয়ে উঠেন। চিকনাগুল বাগানের এক অপারেশনে তাঁর ঘনিষ্ঠ তিনজন সহযোদ্ধা শহীদ হন। তাঁরা হলেন: নায়েক গোলাম রসুল, সিপাহী আবদুর রব ও সিপাহী মানিক। এদিন সাধারণ অবয়বের দুঃসাহসী ছকাই মিয়া একজন বিশালাকৃতির পাকশত্রুকে হাতেনাতে ঝাপটে ধরে নিয়ে এসে বীরবাঙালির শৌর্যের পরিচয় দেন। এই পাকি কুত্তাটাকে ভারতীয় বাহিনীর হাতে হস্তান্তরকালে ভারতীয় জনৈক মেজর ঐ পাকির দেহসৌষ্টবের সাথে ছকাই মিয়ার সাধারণ দেহাবয়বের অকল্পনীয় শৌর্যের তুলনা করতে গিয়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
ছকাই মিয়ার মতো সাহসী সন্তানদের জীবনবাজি রাখা যুদ্ধের ফসল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। তাঁদের ইতিহাস তো কেউ লিখে না। কারণ ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাজারে ছকাই মিয়ারা ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন ইতিহাসের অন্তরালে। আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা তা হতে দেবো না, দিতে পারিনা। প্রয়োজনে আরেকটি যুদ্ধের মহড়া চলবে নেতাজী-শেরেবাংলা-মাস্টারদা-বঙ্গবন্ধুর বাংলায়। জয় বাংলা।

লেখক‬: হাবিব আহমদ দত্তচৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সভাপতি, বাংলাদেশ ব্রতচারী সমিতি।