মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে আরো নিবিড় গবেষণা জরুরি
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্কঃ মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা বিষয়ক এক আলোচনা সভায় বক্তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে এ বিষয়ে আরো নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৬ সালে বাঙালি জাতির এক তমসাঘন মুহূর্তে এ এস এম সামছুল আরেফিন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করেন।
তিনি নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে এই গবেষণার কাজটি শুরু করেন। যা আজ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক জরুরি তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। এ ধরনের গবেষণা তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে সহায়তা করবে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সাবসেক্টর অধিনায়ক এ এস এম সামছুল আরেফিনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণার ৪০ বছর পূর্তি ও ৬৫তম জন্মদিন উপলক্ষে গবেষণা ও প্রকাশনা সংস্থা ‘বাংলাদেশ রিসার্চ এ্যান্ড পাবলিকেশন্স’ বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে আজ এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে সামছুল আরেফিনের গবেষণাকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করেন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এম পি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ড. আতিউর রহমান, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবেদ খান, কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এবং দৈনিক প্রথম আলোর দিল্লী প্রতিনিধি সৌম্য বন্দোপাধ্যায়। জাতীয় প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি একুশে টেলিভিশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার মনজুরুল আহসান বুলবুল অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
রাশেদ খান মেনন বলেন, “আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে খুব বড় কাজ হয়নি। যেটা হয়েছে সেটি বিকৃত। সেই ইতিহাস বিকৃতির ধারাবাহিকতায় গোলাম আজমকে বাংলাদেশের ভাষা সৈনিক হিসেবে পরিচিত করানোরও চেষ্টা হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে এ এস এম সামছুল আরেফিন গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসের সত্যকে তুলে এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ দলিল।”
তিনি শামছুল আরেফিনের এই গবেষণার মাধ্যমে জাতিকে সঠিক ইতিহাসের উপাদান সরবরাহ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এ এস এম আরেফিনের গবেষণার ৪০ বছর পূর্তি ও জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। মন্ত্রী তার গবেষণাকে ‘ইতিহাসের নির্মোহ সত্য উদঘাটনে সহায়ক গ্রন্থ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে তিন কাজের সাথে যুক্ত ছিলো। সাম্প্রদায়িকতার জাল বোনা, জঙ্গীবাদী তৎপরতা এবং পাকিস্তানের সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করা। পরবর্তী সময়ে তাদের দোসর বিএনপি-জামাত জোট তাদের সাথে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছে।
তিনি বলেন, আরেফিনের গবেষণা ইতিহাস বিকৃতিকারীদের চিহ্নিত করতে ভবিষ্যতের নীতি কৌশল ঠিক করতে সাহায্য করবে। এই বইগুলো ইতিহাস বিকৃতির জালকে ছিন্ন করে জাতির কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরবে।
ড. আতিউর রহমান বলেন, “আমাদের দূর্ভাগ্য আমাদের ইতিহাস বড়ই কুয়াশাচ্ছন্ন। বড়ই বিভ্রান্তিতে ভরা। আরেফিনের রচিত বাংলাদেশ ডকুমেন্টস ১৯৭১’ বইতে ইতিহাসের সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে। আমরা আশাবাদী যে তরুণ প্রজন্ম আজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হবে।
তিনি তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস বিকৃতির অন্ধকারের কুহেলিকা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যি ইতিহাস সন্ধানে এ এস এম শামছুল আরেফিনের গবেষণা পাঠ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একটি উন্নত দেশ ও জাতি গঠন করতে হলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্মারক চিহ্ন, সমাধি রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্ণধার দরিদ্র ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন নির্মাণে সহজ শর্তে ঋণদানের জন্য শিগগিরই সকল ব্যাংকে নির্দেশ জারি করবেন বলে জানান।
তিনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আশাবাদী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে ১ নম্বর দেশ এবং সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে ২ নম্বর দেশ বাংলাদেশ। তাই এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের সবাইকে প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতে হবে।
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, শামছুল আরেফিনের গবেষণা কেবল ইতিহাসের সাক্ষ্যই বহন করে না, তার গবেষণার মধ্যে লুকিয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের উপাদান। যা একজন লেখকের রচনার জন্য বড় দলিল। তিনি গবেষকের অনন্য সব গবেষণার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানান।
সাংবাদিক সৌম্য বন্দোপাধ্যায় শামছুল আরেফিনের এই গবেষণা কর্মকে দুই বাংলার ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির যোগসূত্র উপস্থাপনের অনন্য কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তার মুক্তিযুদ্ধের গবেষণায় কেবল বাংলাদেশ নয়, মুক্তিযুদ্ধে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের অবদান সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জরুরি রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে থাকায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তিনি একটি লিখিত শুভেচ্ছা পাঠান। অনুষ্ঠান সঞ্চালক বক্তব্যটি পাঠ করে শোনান।
অনুষ্ঠানে সামছুল আরেফিনের ৬৫তম জন্মদিন উপলক্ষে সমাজের বিশিষ্টজন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন সংগঠন, প্রকাশক এবং শুভার্থীরা শুভেচ্ছা জানান। তাদের মধ্যে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, আবদুল ওয়াদুদ দারা এমপি, পংকজ নাথ এমপি, মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, ভারতের বি বুক প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ত্রিদিব চ্যাটার্জি, ভারতের দ্বীপ প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী শংকর মন্ডল, সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ প্রমুখ। – বাসস।
