মূল সংবাদে যান
২৪ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার করুন

দুর্বল নীতির কারণে মিয়ানমার সেনাসমাবেশের দুঃসাহস দেখাচ্ছে

ডেস্ক রিপোর্ট ৬৩ বার পঠিত ৬ মিনিটের পাঠ

সরকারের দুর্বল নীতির কারণে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ অযাচিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তে সেনাসমাবেশ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি।

শুক্রবার বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মন্তব্য করেন।

‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের সেনাসমাবেশ ও বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির প্রতিবাদে’ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে অগ্রাধিকার বিষয় হওয়া বাঞ্চণীয় ছিলো রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধান। সরকারের সামগ্রিক কার্যকলাপ বিবেচনায় এ ধরণের অগ্রাধিকার সর্বত্রই অনুপস্থিত। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে, এখন পর্যন্ত এই সমস্যার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী কোনো বিশ্ব নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করেননি এবং জাতিসংঘে সেভাবে গুরুত্বসহকারে বিষয়টাকে তুলে ধরতে পারেননি। যার ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমরা বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক সকল স্তরেই ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমান গণবিচ্ছিন্ন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির সুযোগে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আজ কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি , সরকারের এ দুর্বল নীতি আজ মিয়ানমার সরকারের কাছেও স্পষ্ট। এর পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেই মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ অযাচিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তে সেনাসমাবেশ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এহেন সেনা সমাবেশের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ ধরণের অপতৎপরতা রুখতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণপূর্বক আন্তঃআঞ্চলিক কুটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণে করতে বর্তমান নতজানু সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।

ফখরুল বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা দূর করতে হলে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিন, গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করুন, বহির্বিশ্বে দেশের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করুন।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে ইতোমধ্যেই আমরা সকলেই অবগত যে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তে গত ১১ সেপ্টেম্বর ভোর থেকে মাছ ধরার ট্রলারে করে মিয়ানমারের সেনাদের সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। অন্তত তিনটি পয়েন্টে সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার সৈন্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের অন্তত তিন পয়েন্টে কা নিউন ছুয়াং, মিন গা লার গি ও গার খু এ ট্রলার থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সৈন্যদের নামতে দেখা গেছে। সীমান্ত পয়েন্টগুলোর মধ্যে একটির দূরত্ব আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখার (২০০ মিটার) মধ্যে। ওই তিন পয়েন্টে মাছ ধরার ট্রলারের কাঠের নিচে বসিয়ে সৈন্যদের জড়ো করা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

‘নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা মিয়ানমার সেনাবাহিনী এক দিনেই এক হাজারের বেশি সৈন্যের সমাবেশ ঘটিয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে গণহত্যা শুরুর সময়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ঠিক একইভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সৈন্যসমাবেশ করেছিল। ফলে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ভোরে শুরু হওয়া সেনাসমাবেশের কারণে রাখাইনে এখন যেসব রোহিঙ্গা রয়েছেন, তাদের মধ্যে নতুন করে ভীতি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের গণবিচ্ছিন্ন বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার শুরু থেকে দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে সমস্যাকে জটিল থেকে জটিল করে তুলেছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে এ সমস্যাকে দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে এডহক ভিত্তিতে সমস্যার সমাধানে কার্যত মিয়াননামের পাতা ফাঁদে পা দেয়া। অথচ ইতোপূর্বে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মিত্রদের যুক্ত করে বাংলাদেশ দুই-দুইবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করেছে। সরকারের সামনে সমস্যা সমাধানে এ ধরণের ঐতিহ্যগত পররাষ্ট্রনীতির সফলতা থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, আরেকটি বড় ব্যর্থতা ছিলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের চুক্তি বাস্তবায়নে গ্যারান্টি হিসেবে আন্তর্জাতিক কোনো পক্ষকেই যুক্ত করতে না পারার কুটনৈতিক ব্যর্থতা। একটি অগণতান্ত্রিক সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে তার প্রতি বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার চরম সংকট। ফলশ্রুতিতে এধরণের সরকারের বৈদেশিক মিশনগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তদের অধিক সময় ব্যয় হয় এই অবৈধ গণবিচ্ছিন্ন সরকারের টিকে থাকার স্বার্থকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। আর এর ভয়াবহ প্রভাব প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা সমাধানে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন পেতে সুদৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করতে না পারায়।

পৃথিবীর বৃহত্তম শরণার্থী শিবির এই মুহুর্তে বাংলাদেশে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার মিয়ানমার সরকারের সক্রিয় নীতিপরিকল্পনার অংশ হিসেবে যে রোহিঙ্গা সমস্যার সৃষ্টি সেটা কোনো অর্থেই বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হতে পারে না। এটা নিঃসন্দেহে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক বিপর্যয়। এ সমস্যা সমাধানে শুরু থেকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় উদ্যোগকে সাথে নিয়ে সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী ছিল। কিন্তু লাগাতারভাবে একনায়ক রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে বিরোধীদের উপর সীমাহীন নির্মম দমন-পীড়ন ও ৩০ ডিসেম্বরের মতো মধ্যরাতের নির্বাচনের বিতর্কিত বিষয়গুলো কারণে বহির্বিশ্বে শেখ হাসিনা সরকারের গ্রহণযোগ্যতা যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তা ফিরে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায়ই আমাদের দলবাজ কূটনীতিকদের বেশির ভাগ সময় কেটে যায়।

‘আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশার বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধ, সহিংসতার নিন্দা এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের প্রস্তাবেও আমরা আমাদের ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন আদায় করতেও ব্যর্থ হয়েছি। যেমনটা ব্যর্থ হয়েছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত আর্থিক বিচারে আমাদের প্রধান উন্নয়ন অংশীদার জাপান ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার (আঞ্চলিক জোট আসিয়ানভুক্ত) দেশগুলোরপ্রস্তাবটিতে সমর্থন আদায়ে।’