১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে চার সেক্টর কমান্ডারসহ ২১ জন খেতাবধারী ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুক্তিযোদ্ধা নিহত (মৃত্যুদণ্ডসহ) হয়েছেন
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকমঃ
স্বাধীনতার ৪৪ বছরে বাংলাদেশের অনেক প্রাপ্তি থাকলেও রাজনৈতিক আনুগত্য, মতাদর্শগত লড়াই, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ব্যক্তিগত রেষারেষি ও বহির্বিশ্বের ইন্ধনে জীবন দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সূর্যসন্তানেরা।
স্বাধীনতার ঊষালগ্নে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল এম আবু তাহের, মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের মতো মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডাররা স্বগোত্রীয় সশস্ত্র প্রতিপক্ষের হাতে অথবা ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছেন।
চার সেক্টর কমান্ডারসহ ২১ জন খেতাবধারী ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুক্তিযোদ্ধা নিহত (মৃত্যুদণ্ডসহ) হয়েছেন এ সব ঘটনায়।
এ ছাড়া জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মোট ২২ দফার ক্যু’তে প্রায় আড়াই হাজার মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ও সদস্য খুন এবং নিখোঁজ হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এ সব বিরোধে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধনও কাজ করেছিল। তাদের মতে, এ সময় পাকিস্তান ফেরত অমুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের বিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেনা অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা সদস্য নিহত হন। সেনা অভ্যুত্থানের কয়েকটি ঘটনায় সামরিক আদালত বা কোর্ট মার্শালে বিচার হলেও তা নিয়ে রয়েছে যুক্তিসঙ্গত বিতর্ক।
তবে স্বাধীনতার ৪৩ বছরে সেনা অভ্যুত্থান বা পাল্টা অভ্যুত্থানের নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে কতজন সেনা কর্মকর্তা ও সদস্য নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান ও তালিকা সরকারিভাবে এ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। এ সব ঘটনার নেপথ্যের কারণগুলোর সঠিক তদন্ত হওয়ার খবরও জানা যায়নি।
১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সেনা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে দু’জন রাষ্ট্রপ্রধানসহ নিহত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চারজন সেক্টর কমান্ডার। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ৩ থেকে ৭ তারিখ সংঘটিত অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে নিহত হন কে ফোর্সের অধিনায়ক ও ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর-উত্তম)। এই ঘটনায় তার সঙ্গে নিহত হন মেজর হায়দার (বীর-উত্তম) ও মেজর নাজমুল হুদাসহ (বীরবিক্রম) আরও বেশ কয়েকজন।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দায়ের করা এক হত্যা মামলায় সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এম আবু তাহেরকে, যা ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই কার্যকর করা হয়।
সেনাবাহিনীতে কর্মরত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, ১ নম্বর ও পরবর্তী সময়ে ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের প্রধান জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর।
সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হলে অভ্যুত্থানের দায়ে ৩৩ জন সেনা অফিসার ও সদস্যকে অভিযুক্ত করে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
এর আগে জিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে (বীর-উত্তম) গ্রেফতার ও পরে ক্যান্টনমেন্টে হত্যা করা হয়।
এ সময় তার সঙ্গে নিহত হন তার ভাগনে কর্নেল মাহবুবুর রহমান (বীর-উত্তম) ও লে. কর্নেল মতিউর রহমান (বীরপ্রতীক)।
সরকারি তালিকানুযায়ী অভিযুক্তরা হলেন— ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম), লে. কর্নেল এ ওয়াই এম মাহফুজুর রহমান (বীরবিক্রম), মেজর নওয়াজিস উদ্দিন, মেজর এম এ রশীদ (বীরপ্রতীক), মোহাম্মদ দিলওয়ার হোসেন (বীরপ্রতীক), ক্যাপ্টেন এ জেড গিয়াসউদ্দিন আহম্মদ, রওশন ইয়াজদানী ভূঁইয়া (বীরপ্রতীক), লেফটেন্যান্ট মজিবুর রহমান, মোহাম্মদ মারুফ রশিদ, ক্যাপ্টেন আব্দুল কাইয়ুম খান, শওকত আলী (বীরপ্রতীক), মোহাম্মদ লতিফুল আলম চৌধুরী, মোহাম্মদ ফজলুল হক, কাজী মোমিনুল হক, লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ রেজাউল করিম, মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ মোহাম্মদ মুনীর, সালাহউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ রফিক হাসান খান, মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন জামিল হক, সুবেদার সাজদার রহমান, ক্যাপ্টেন দোস্ত মোহাম্মদ শিকদার, মোহাম্মদ মুস্তফা, লেফটেন্যান্ট এম এম ইকবাল, মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন, লেফটেন্যান্ট এ টি এম মেসবাহ উদ্দিন সেরনিয়াবত ও মতিউর রহমান।
বিচারে অভিযুক্তদের মধ্যে ১২ জনকে একসঙ্গে এবং আলাদাভাবে একজন মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এ রায় কার্যকর করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেনা অফিসাররা হলেন— ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম), লে. কর্নেল এ ওয়াই এম মাহফুজুর রহমান (বীরবিক্রম), মেজর নওয়াজিস উদ্দিন, এম এ রশীদ (বীরপ্রতীক), মোহাম্মদ দিলওয়ার হোসেন (বীরপ্রতীক), ক্যাপ্টেন এ জেড গিয়াসউদ্দিন আহম্মদ, রওশন ইয়াজদানী ভূঁইয়া (বীরপ্রতীক), লেফটেন্যান্ট মজিবুর রহমান, ক্যাপ্টেন কাজী মোমিনুল হক, লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, ক্যাপ্টেন জামিল হক, লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ রফিক হাসান খান। এ ছাড়া সরকারি তালিকায় অভিযুক্ত নন কিন্তু সামরিক আদালতের বিচারে পরবর্তী সময়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয় লে. কর্নেল শাহ মোহাম্মদ ফজলে হোসেনের।
সূত্র- গেরিলা ১৯৭১।
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০২-০২-২০১৬ইং/নিঝুম



