আ.লীগ গণতন্ত্রে নয় স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাসী : ফখরুল
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এই আওয়ামী লীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও কাজ করেছে উল্টো। তারা বিশ্বাস করে স্বৈরতন্ত্রে।’
আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশে এসব কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। এ সময় নির্বাচন কমিশন মিথ্যা কথা বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তাদের কথা শুনলে মানুষ হাসে। এখন নাকি খুব সুন্দর নির্বাচন হচ্ছে, চমৎকার নির্বাচন হচ্ছে। ইভিএম পদ্ধতিতে নির্বাচন করে। এক জায়গায় ভোট দিলে আরেক জায়গায় পড়ে। ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিলে নৌকায় গিয়ে পড়ে; এই অবস্থা তৈরি করেছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রহসণের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জোর করে ক্ষমতা দখল করে আছে। ওই নির্বাচন বাতিল করে একটি নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির এই সমাবেশ। আমাদের খুব লজ্জা হয় দুঃখ হয়- যখন দেখি এই সমাবেশে নেতাকর্মীদের আসতে রাস্তায় রাস্তায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। যখন দেখি এই সমাবেশ পণ্ড করার জন্য আজকে অসংখ্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে। আবার যখন দেখি এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা গণতন্ত্র দিয়েছেন বলেই দেশ খুব ভালোভাবে চলছে। আজকের এই দিনটি হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় দিন।’
বিএনপির মহাসচিব আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালের এই দিনে (ডিসেম্বর মাস) বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছিল গণতন্ত্রে জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য। সেই চেতনাকে ধ্বংস করে (২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর) আওয়ামী লীগ তারা তাদের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে জোর করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করেছে। তাই ৩০ ডিসেম্বরের এই দিন আমাদের জন্য লজ্জা কলঙ্কের।’
জ্যেষ্ঠ এই রাজনৈতিক নেতা বলেন, ‘এই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সকল অর্জন ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, প্রশাসন দলীয়করণ করেছে, অর্থনীতি ধ্বংস করেছে এবং দেশে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে। আপনারা দেখেছেন মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা চুরি, মেগা লুটপাট, শেয়ারবাজার চুরি করে ধ্বংস করে ফেলেছে। ব্যাংকগুলোকে লুট করে অর্থ পাচার করে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলেছে। দেশে কোভিড-১৯ শুরু হয়েছে মার্চ মাস থেকে তখন থেকে লুট করে করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।’
দেশে গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতা নেই উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, ‘ডিজিটাল অ্যাক্টের মাধ্যমে গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ শিকার করা গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা ভিত্তিহীন মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। আমাদের ৩৫ লক্ষ নেতাকর্মীর নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। এই সরকার গোটা দেশকে কারাগারে পরিনত করেছে। এ থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে।’
চলমান পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘দেশের চলমান পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে গেলে দলমত ধর্ম-বর্ণ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করতে হবে। নিরপেক্ষ সরকারে অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন দিতে হবে। সর্ব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই সংগ্রাম শুধু বিএনপির একার নয়। সব রাজনৈতিক দলকে সংগ্রাম করতে হবে লড়াই করতে হবে। এই সরকারকে সরিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
বিএনপি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পূর্বঘোষণা অনুযায়ি এই সমাবেশ করে বিএনপি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি এই দিনকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। সে অনুযায়ী আজ বেলা ১১টায় এই সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ১০টা থেকেই প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপির নেতা–কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে মেট্রোরেলের কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিএনপি নেতাদের রাস্তার একপাশে রাখার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে প্রেসক্লাবের আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে বিএনপির নেতা–কর্মীদের অবস্থানের কারণে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। এগারোটার বাজার কয়েক মিনিট আগে সচিবালয়ের পশ্চিম সড়ক হয়ে বিএনপির নেতা–কর্মীরা সমাবেশস্থলে আসতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। নেতা–কর্মীরা বাধা অতিক্রম করে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়।
পুলিশকে এ সময় বিএনপির নেতা-কর্মীদের লাঠিপেটা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে বিএনপির নেতা–কর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এ সময় বিএনপির নেতা-কর্মীরা চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করেন। পরে সমাবেশস্থল থেকে মাইকে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়। এর পাঁচ মিনিট পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। সংঘর্ষ শেষে প্রেসক্লাবের বাইরে বিএনপির সমাবেশ শুরু হয়।
সকাল থেকে প্রেসক্লাবে প্রবেশের সব গেট বন্ধ ছিল। সংঘর্ষ শেষ হলে পূর্ব পাশের গেট খুলে দেওয়া হয়। প্রেসক্লাবের ভেতরে ও বাইরে বিএনপির অনেক নেতা–কর্মী অবস্থান নিতে দেখা যায়। পুলিশের রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার এস এম শামীম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যারা বিশৃঙ্খল তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে বলেছি। এর বাইরে কিছুই হয়নি।’ এই ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল। এতে আরো বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, আব্দুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নেতা শিরীন সুলতানা, আমিনুল হক, সরাফত আলী সপু, নেওয়াজ আলী, কাজী আবুল বাশার, আব্দুস সালাম আজাদ, মহানগর নেতা আব্দুল আলীম নকি, যুবদলের সাইফুল আলম নিরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভুইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও কৃষকদলের সদস্য সচিব কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন প্রমুখ।