তাঁকে যদি মুক্তিযুদ্ধের ‘জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া’ বলি তবে সেটা অত্যুক্তি করা হবেনা
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকমঃ
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) কামরুল হাসান ভূঁইয়া। চার দশকের ওপর নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে। তাঁকে যদি মুক্তিযুদ্ধের ‘জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া’ বলি তবে সেটা অত্যুক্তি করা হবেনা। আজ আপনাদের সামনে শ্রদ্ধেয় এই মানুষটি’র স্মৃতিচারণা থেকে দু’টি ঘটনা তুলে ধরছি……
স্মৃতি ১ঃ
********
শ্রীমঙ্গল চা বাগানে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প। অফিসাররা থাকে ম্যানেজারের বাংলোয়। বাংলোর আশেপাশে যাবার জোঁ নেই। নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা পাকিস্তানিদের। যুদ্ধের মাঠে দেশপ্রেম এক উন্মাদনার নাম। আলী আজগর এবং তার এক সহযোদ্ধা মিলে পরিকল্পনা করলো বাংলো সামনে কাঁচা রাস্তায় এম-১৪ এন্টি-পারসোনাল মাইন লাগাবে। আস্তানার এতো কাছে মুক্তিবাহিনী আসবে শত্রুরও কল্পনার বাইরে।
রাস্তার দু’পাশে ঘন চা বাগান। চারটি করে আটটি মাইন লাগাবে তারা। আলী আসগর যখন তার শেষ মাইনটি গর্তের ভেতর ঢোকাচ্ছে, তখন হঠাৎ খেয়াল করলো চারজন পাকিস্তানি অফিসার গল্প করতে করতে বাংলোর দিকে হেঁটে আসছে। খামখেয়ালি ভাব।
আজগরের অবস্থান থেকে পাকিস্তানিদের এবং মাইন পোঁতায় ব্যস্ত তার বন্ধুর দূরত্ব প্রায় সমান। ডাকতে গেলে পাকিস্তানিরা শুনে ফেলবেই শুধু নয়, তারে দেখেও ফেলবে। দূরত্ব মাত্র দশ/বারো গজ অথচ তার বন্ধুর পিঠ তখন শত্রুদের দিকে। এতটুকুও আঁচ করতে পারছে না সে। সেকেন্ডের অংশভাগে সিদ্ধান্ত নিতে হলো আলী আজগরের। নিরুপায় হয়ে গড়িয়ে ঢুকে গেল ঘন চা বাগানের ভেতর।
শত্রুরা খেয়ালই করতে পারলো না। সহযোদ্ধা বন্ধুটি ধরা পড়লো মাইন লাগানোরত অবস্থায়।একদম সাথে সাথেই শুরু হলো অস্ত্রের আর বুটের আঘাত। মাইনের ভয়ে এরা আর স্থানত্যাগও করতে পারছে না। পরিণতি নিণর্ীত, মুহূর্তেই বুঝে ফেললো যোদ্ধা। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজকে একটু হাল্কা করে নিলো। তারপর একটু আগে নিজের পোঁতা একটি মাইনের উপর ডান পায়ের সজোরে আঘাত। চোখের পলকে বিকট শব্দে উড়ে গেল সবাই — আমরা যার নাম, ধাম কিছুই জানি না,সে মুক্তিযোদ্ধাও।
স্মৃতি ২ঃ
*********
৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় শত্রু পশ্চিম দিক থেকে আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের উপর আক্রমন করলো। আমরা সবাই মারা পড়তাম অথবা ধরা পড়তাম বা আহত হতাম। এ কেয়ামতসম অবস্থার ৯৫ ভাগ দায় আমার নিজের। ১১ প্লাটুন যোদ্ধা নিয়ে আমি যুদ্ধের সব নিয়ম কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক সারির একটি প্রতিরক্ষা অবস্থান (Linear Defense) নিয়েছি। আত্মহত্যার পরিকল্পিত প্রস্তুতি। শত্রু এক ব্যাটালিয়ান। (এ যুদ্ধ নিয়ে ময়না তদন্ত এখন নয়।)
পরদিন (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত কাটলো কোনো গোলাগুলি ছাড়া। কেননা শত্রু আমাদের অবস্থান নির্ণয় করতে পারেনি। চাঁদনি রাতটা কাটলো উভয়পক্ষের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির মাধ্যমে। মূল আক্রমণ আসলো আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানর পূর্ব দিক থেকে সকাল ৯টায়। দিনের আলোতে এমন সময়ের আক্রমণ যুদ্ধের সমস্ত ব্যাকরণের অবমাননা। তাও খোলা আবাদি জমির উপর দিয়ে। পাকিস্তানি বুদ্ধি!
আমাদের ছেলেরা মনের সুখে পাকিস্তানিদের মারলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ঘন্টাখানিক পরে। ছেলেদের গুলি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অবস্থা ভয়াবহ। গুলি ছাড়া অস্ত্র লাঠিরও অধম। আমাদের গুলি আনতে হয় ভারত থেকে।অসম্ভব অবস্থা। পশ্চাদপসরণের আদেশ দিলাম। দিনের আলোতে যুদ্ধরত অবস্থায় পশ্চাদপসরণ করা আর শত্রু অস্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে দেয়া একই কথা।
যখন ইউনিয়ন কাউন্সিলের রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে পশ্চাদপসরণ তদারকি করছি তখন হন্তদন্ত হয়ে মফিজ এসে হাজির।
‘স্যার, পইয়ারা আইয়া পড়ছে।’
এটা আমাকে মফিজের কাছ থেকে শুনতে হবে কেন। মফিজ মুক্তিযোদ্ধা না।
আমাদের ফুট-ফরমায়েশ খাটে। খালি গা, পরনে লুঙ্গি। সে এসেছে আমাকে নিরাপদে পিছনে নিয়ে যাবার জন্য। আমি বললাম,’তুমি পিছনে যাও। এখানে এসেছো কোনো?’
মফিজ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। আমার মাথায় রক্ত উঠে আছে। সবগুলি প্লাটুনের সব ছেলে আসছে কিনা-অস্থির হয়ে আছি।মফিজ বললো,’স্যার, পাইয়ারা ঘেরাও দিয়ে লাইবো’।
অর্থাৎ সে আমাকে নিয়ে যাবেই। আর কথা বলার ধৈর্য ছিলনা। বাম হাতটা দিয়ে তার বাম কাঁধটা ধরে জোরে শরীরটা ঘুরিয়ে দিয়ে বললাম,’তুমি পিছনে যাও’। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম তার পেছনের দিকে অনেকখানি মাংস নাই। সাদা হয়ে আছে। শত্রুর আর্টিলারী বা মর্টারের গোলায় উড়ে গেছে। অঝোর ধরায় গড়িয়ে রক্ত পড়ছে।
‘মফিজ, কী হয়েছে?’
‘স্যার, কিছ্ছু অইছে না।’
আমার উত্তপ্ত মাথা ক’সেকেন্ডে শীতল হয়ে গেল।
মনে মনে বললাম,’মফিজ, দেশ স্বাধীন হলেতো আমি বড় হবো কিন্তু তুমি কি জানো তুমি কোনোদিনই কিছু হবে না’।
সূত্র- গেরিলা ১৯৭১