সিলেটের গর্ব ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা আজিজ আহমদ চৌধুরী
পিতা আলহাজ্ব নজিব আলী চৌধুরী ও মাতা বদরুননেছা চৌধুরীর ৩ পুত্র ও ১ কন্যার মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। পরবর্তীকালে তাঁর পিতা তাঁদের একই জমিদারির অন্তর্ভুক্ত সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার অন্তর্গত আলীনগর ইউনিয়নের কাদিমলিক গ্রামের কাছারিবাড়িতে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন।
আজিজ আহমদ চৌধুরী ১৯৫২ সালে বারহাল এহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এসময় ১১ ফেব্রুয়ারি বড়লেখার পি.সি. হাইস্কুল প্রাঙ্গণে ভাষণ দানকালে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে থানাহাজতে একদিন বন্দি রাখে।
মৌলভীবাজারের সিনিয়র ভাষাসৈনিক আবদুল আজিজের হস্তক্ষেপে তিনি পরদিন থানাহাজত থেকে মুক্তি পান। পরবর্তীকালে তিনি ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। যাত্রাপথে কয়েকজন সঙ্গীসহ ২০ এপ্রিল তিনি শ্রীমঙ্গলের সিন্দুরখান চা-বাগানের কাছে পাক ক্যাপ্টেন শের খানের হাতে ধৃত হয়ে নির্যাতিত হন।
শের খানের নির্দেশে সবাইকে ঐদিন লাইনবদ্ধভাবে গুলি করলে সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান এবং পালিয়ে কলকাতা চলে যান। এরপর তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় সোনামুড়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার মেজর আবদুল ফাত্তাহ চৌধুরী ও মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে একমাস সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
তাঁর এফএফ নম্বর: BDLW.SEC.FF-ANA-37। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৫ জুন সর্বপ্রথম ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে পরীক্ষামূলকভাবে হবিগঞ্জের শাহজীবাজার রেলসেতু অপারেশনে অংশগ্রহণ করে সফলতার পরিচয় দেন।
অতঃপর প্রবাসী বিপ্লবী সরকারের নির্দেশে কলকাতায় ভারতীয় কেবিনেটমন্ত্রী ড. ত্রিগুণা সেনের অধীনে সহকারী রসদ ও যুদ্ধসরঞ্জাম সরবরাহ কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি মাঝে-মধ্যে গোয়েন্দা মিশন নিয়ে ছদ্মবেশে ও ছদ্মনামে মাতৃভূমিতে প্রবেশ করে পাকশত্রুর অবস্থানগত তথ্য সংগ্রহ করতেন। তখন তিনি আহবাব আহমদ চৌধুরী, পিতা- হাসান আহমদ চৌধুরী, বিয়ানীবাজার, সিলেট, এই ছদ্মনাম ও পরিচয় ব্যবহার করতেন। যুদ্ধের শেষপর্যায়ে তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
২১ অক্টোবর ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার ধলাই চা-বাগানে এক গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে কুখ্যাত পাক-ক্যাপ্টেন শের খানকে ০.৪৪ রিভলবার দিয়ে হত্যা করেন।
২৯ নভেম্বর ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে একটি প্লাটুনের কমান্ডার হিসেবে সিলেটের গোয়াইনঘাট থানার আলীরগাঁও ইউনিয়নের বারহাল গ্রামে পাকশক্রর এক শক্ত ঘাঁটিতে এক দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেন। ঐদিন সম্মুখযুদ্ধে এক পর্যায়ে তাঁর ০.৪৪ রিভলবারের অব্যর্থ গুলিতে ৫ জন এবং হ্যান্ডগ্রেনেড চার্জের দ্বারা প্রায় ৩০ জন পাকসেনা নিহত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিলেন।
২০ ডিসেম্বর তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৮২ সালে তিনি হজব্রত পালনে মক্কা গমন করেন। দু’দুবার তিনি হজব্রত পালন করেন। এই মহান দেশপ্রেমিক ১৯৯১ সালের ৬ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সিলেট এম.এ.জি.ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)।
তাঁকে সুরমা নদীর তীরে রামদাবাজার সংলগ্ন পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজ আহমদ চৌধুরী আনা মিঞা সিলেটবাসীর গর্ব, বাঙালির অহংকার।