বান্দরবানে নিরাপত্তা জোরদার, মোড়ে মোড়ে তল্লাশি
বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় সশস্ত্র দুই সংগঠনের গোলাগুলিতে ৮ জন নিহত হওয়ার পর চরম আতঙ্কের কারণে গোটা জেলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি, বিভিন্ন চেকপোস্টে চালানো হচ্ছে তল্লাশি।
বৃহস্পতিবার (৬ এপ্রিল) রোয়াংছড়ি উপজেলায় পাহাড়ি দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে নিহত আট জনের মরদেহ নিতে আসেননি স্বজনরা। এমনকি এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনও মামলা হয়নি। এ অবস্থায় শনিবার দুপুর ২টার দিকে নিহতদের মরদেহ গ্রহণ করেছে বম সোশ্যাল কাউন্সিল (বিএসসি) সংগঠন।
একইসঙ্গে নিহত আট জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন বম সোশ্যাল কাউন্সিলের (বিএসসি) সভাপতি লালজার লম বম। তিনি বলেন, ‘নিহত সবাই বম জনগোষ্ঠীর। ছয় জন রুমা উপজেলার জুরভারংপাড়া, একজন রৌনিনপাড়ার ও একজন রোয়াংছড়ির পাইংখিয়াংপাড়ার বাসিন্দা।’
এ ঘটনার পর থেকে স্থানীয় লোকজন চরম আতঙ্কে দিন পার করছে। পাহাড়িদের অনেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। নিজেদের পাড়া ছেড়ে রোয়াংছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০০ জন এবং রুমার বম কমিউনিটি সেন্টারে ৬০ জন গত শুক্রবার থেকে আশ্রয় নিয়েছে, তারা সবাই খ্যায়াং সম্প্রদায়ের। তাদের নিরাপত্তা দিতে কাজ করছে পুলিশ। তাদের জন্য সেনাবাহিনী ও প্রশাসন খাদ্য সরবরাহ করছে।
রোয়াংছড়ি উপজেলার খামতাং পাড়ার বাসিন্দা অলিপার খ্যায়াং জানান, ‘গোলাগুলির পর ভয়ে আমরা পাড়া থেকে রোয়াংছড়ি সদরে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছি, পরিস্থিতি শান্ত হলে বাড়ি ফিরব।’
রোয়াংছড়ি জোনের আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার ফাহিম মাহমুদ বলেন, ‘কেএনএফের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় সেখান থেকে অনেকে চলে আসছে, আমরা তাদের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করেছি।’
কেএনএফের সশস্ত্র শাখা কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) ক্যাপ্টেন ফ্লেমিংয়ের বরাত দিয়ে শুক্রবার রাতে কেএনএফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানায়, বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি, থানছি—এই তিন উপজেলায় চার চাকার গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। যদি কেউ নির্দেশনা অমান্য করে, তবে সে যেই হোক গুলি করা হবে। কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর রামথার পাড়ার কারবারিসহ আট জনকে সংস্কারপন্থীরা বার্স্ট ফায়ার করে হত্যা করায় এই কারফিউ জারি রাখা হলো।
কেএনএফের এই নির্দেশনার পরে ওই তিন উপজেলার পাহাড়ি সড়কে পারতপক্ষে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন না ড্রাইভাররা।
গত ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে যৌথ অভিযানের সময় কেএনএফের দুই সদস্য এবং কেএনএফের গুলিতে মগ পার্টির তিন জন নিহত হয়। এছাড়া চলতি বছরের ১২ মার্চ কেএনএফের গুলিতে সেনাবাহিনীর মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন নিহত হন। সর্বশেষ গত ৭ এপ্রিল ইউপিডিএফের (সংস্কার) গুলিতে কেএনএফের ৮ জনসহ নিহত হন।
থানচি থেকে গত ১১ মার্চ কেএনএফ ১২ জন নির্মাণশ্রমিক ও গত ১৫ মার্চ রুমার লংথাসি ঝিরি এলাকার সড়ক থেকে অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট আনোয়ারসহ ৩ জনকে অপহরণ করলেও তাদের পরে মুক্তি দেয়া হয়। এই সময় পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ৬৮জন জঙ্গি ও কেএনএফের বেশ কয়েকজনকে আটক করে র্যাব।
বান্দরবানের সীমান্ত এলাকায় জঙ্গি সংগঠন এবং কেএনএফের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানের কারণে গত ১৭ অক্টোবর থেকে ওই এলাকায় পর্যটকদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এতে জেলার অন্তত দুই শতাধিক হোটেল-মোটেল কার্যত পথে বসতে চলেছে। অনেকে প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মী ছাঁটাই করেছে।
স্থানীয়রা জানান, থানচি ও রুমার পর্যটক বহনকারী ২ শতাধিক নৌযান, ৩ শতাধিক চাঁদের গাড়ি ও ৩শ ট্যুরিস্ট গাইড এখন বেকার। জুম চাষাবাদ করতে না পারায় পাহাড়িরা খাবারের সংকটে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা দুর্দশায় পড়েছেন।
বান্দরবান হোটেল মোটেল মালিক সমিতির অর্থ সম্পাদক রাজিব বড়ুয়া বলেন, ৮ জন নিহত হওয়ার পর বান্দরবানের পর্যটন শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় সবাই মিলে বের করতে হবে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঘটনার পর জেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো পর্যালোচনা করে দেখছি।’