স্মৃতিতে ১৯৭১ : শারমিন হক
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্কঃ আমার ছোটবেলা আজিমপুর এবং শেখ সাহেব বাজারে কেটেছে। ১৯৭১ এ আমরা স্মরণিকা নামের বাসায় থাকতাম। ধুসর রঙের বাড়িটা সেসময় বেশ আকর্ষণীয় লাগতো। তখনো আমি স্কুল শুরু করিনি। সামনে স্কুলের ভর্তি পরীক্ষ। আব্বু আর বড় আপ্পির হাত ধরে স্কুলে গেলাম। আজিমপুর গার্লস স্কুল। এত্ত বড় বিল্ডিংটা দেখে চমকে উঠি। আমার মনে হারিয়ে যাবার ভয় এলো। আব্বু বললেন, পরীক্ষা শেষে গেটের বাইরে যেওনা কিন্তু। আমি তাই করেছিলাম। বাইরে যাইনি। তিন তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেজ আপ্পি এসে আমায় নিয়ে গেলেন।
কিছুদিন পর আব্বু রেজাল্ট পেয়ে জানলেন আমি পাশ করেছি। মাকে স্কুলে যেতে হবে। আমার জন্য আব্বু-আম্মা বই, খাতা, পেন্সিল, ইরেজার, স্কুল ব্যাগ কিনে আনলেন। আমি তো মহাখুশী আপ্পিদের আর খালামনির স্কুলে আমিও যাব। এই স্কুলটি সে সময় পুরো শহরে নামকরা ছিল। এখানে আমরা ৫ বোন আর খালা লেখাপড়া করেছেন। লাকি ভাইয়ার (গায়ক ও সুরকার লাকি আখন্দ) বোনও এখানে পড়েছিলেন। আর আমার খালামনি আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ স্কুলেরই ছাত্রী ছিলেন।
দেশ স্বাধীন হবার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের বেশীরভাগ মন্ত্রীদের মেয়েরাও এখানকার ছাত্রী ছিলেন। যথারীতি স্কুল শুরু হোল কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই স্কুল জরুরী ভিত্তিতে বন্ধ করে দেয়া হলো। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ একদিন কারফিউ। রুমে রুমে ম্যাডাম’রা এসে বললেন তোমরা সবাই বাড়ি ফিরে যাও। আমি ভয়ে কান্না শুরু করলাম কিন্তু আপ্পিরা বলল বোকা মেয়ে ভয় কিসের? আমরা আছি না? চল, বাসায় চলে যাই। কিন্তু একটা মেয়েকে দেখলাম স্কুল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। হেডমিস্ট্রেস এসে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি করে যাবে? মেয়েটি বলল, আমার আব্বু তো অফিস এ। আমি কি ভাবে যাব? দারওয়ান স্কুল গেট বন্ধ করবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ম্যাডাম তখন মেয়েটিকে রিক্সাতে উনার সাথে তুলে নিলেন আর বললেন আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।
এর মধ্যে ঢাকায় অনেক হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। অনেক ছাত্রদেরকে বেয়নেট চার্জ করে মেরে ফেলেছে। আমার চাচুকে বলাকা সিনেমা হল এর সামনে বেয়নেট চার্জ করা হোল। কারণ উনিও শেখ মুজিবকে সাপোর্ট করতেন এবং মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কে বা কারা সেদিন আমার চাচুকে কোলে করে রিক্সাতে তুলে নিয়ে এলেন আমি জানি না। কিন্তু আমি সেই বীভৎস দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলাম। দেখি চাচুর বাম পাঁজর দিয়ে অনেক রক্ত ঝরছে, উনার জাম্পার বেয়নেটের খোঁচায় ঝাঁজরা হয়ে গেছে। আব্বু তাড়াতাড়ি চাচুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটালে নিয়ে গেলেন। আমার আম্মুর সেদিনের কান্না আমি আজও ভুলিনি।
আম্মু ছিলেন এ বাড়ির বড় বউ। দাদা-দাদী আব্বুর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার সময় মারা গেছেন তাই আমার আব্বুই আমার চাচু আর ফুপির গার্জিয়ান ছিলেন। আমার আরেক চাচুকে ষড়যন্ত্র করে মেরে ফেলা হয়েছিলো। তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সদস্য ছিলেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন আমার এই চাচা। তাঁকে শারীরিকভাবে অত্যাচার করে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল। যদিও ময়না তদন্তে এ বলা হয় তাঁর প্লেন ক্রাশ করেছিল। আব্বু আম্মু বিশ্বাস করেনি ব্যপারটা। উনারা চ্যালেঞ্জ করলেন এবং আমার এক কাজিন Aeronautical Engineer ছিলেন । উনি করাচীতে থাকতেন, তাই উনি প্লেন চেক করলেন কিন্তু কোন চিহৃ পেলেন না প্লেন ক্রাশের।
মূলতঃ আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের লোকদেরকে এরা বোকা মনে করতো। এভিডেন্স না দিলেও আমরা বিশ্বাস করব এরা জানতো। কারণ ঐ সময়ে সবার পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তান গিয়ে তদন্ত করা ব্যয়বহুল ছিল।
যখনই আমার আব্বু আম্মু এই কেসটা রিওপেন করতে চাইলেন অমনি আমাদের বাড়ি সাদা পোশাক পরিহিত DB police দিয়ে ঘিরে রাখা হোল। আম্মু প্রায় সবসময় কান্না করতেন। কারণ উনি আমার এই চাচু’র লাশ দেখেছিলেন। চাচুকে উনি নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। চাচুর সারা শরীরে নীল দাগ ছিল। কয়েকটা দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিল, গলা ছিল কাটা। বিধ্বস্ত হলে বিমান কি করে অক্ষত থাকে? উনার শরীর আগুনে পুড়ে যাবার কথা। হাড়গোড় থাকারই কথা না, এমনকি কোথাও পোড়া ছিল না। এই পাকিস্তানিরা এত মিথ্যুক যে আমার আব্বু আম্মুর মন ভেঙ্গে গেল।
এবার ফিরে আসি ১৯৭১ এ। আমার স্মৃতি থেকে কিছু গেরিলা ১৯৭১’র মাধ্যমে ভাগাভাগি করতে চাই। আমাদের বাড়িটা West End High School এর পাশের গলিতে ছিল। এই বাড়ির দোতলায় আমরা ছিলাম। এই জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দেয়া চোখ দিয়ে আমি প্রথম লাশ দেখলাম। ২৬ মার্চ। সকালে পাড়ায় হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। লা ইলাহা ইল্লালাহ্–দেখতে পেলাম একজন ছেলের লাশ। সবাই লাশ খাট ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার জীবনে প্রথম শক্ পেলাম। আমাদের বাড়িতে ছোট বাচ্চাদেরকে লাশ দেখতে দেয়া হতো না। কিন্তু সেই অস্থির সময় আমার পুরো পরিবার এই বাড়ির দুই জানালা জুড়ে দাঁড়িয়ে লাশ যেতে দেখল কিন্তু উনারা একটুও টের পেল না সেই ছোট মেয়েটি তাদের হাতের নীচ দিয়ে উকি মেরে লাশ দেখছিল। মৃতদেহটি দুলছে। পরে আম্মু আর আব্বু জানতে পারলেন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র ছিল, আমাদের পাশের রাস্তায় ওদের বাড়ি। আমি ভয়ে চুপ করে থাকলাম, রাতে ঘুমাতে পারলাম না। আমার মনে এত ভয় এলো কোথা থেকে আমি জানি না। আমার চোখের সামনে ঐ লাশটার চেহারা ভেসে উঠত। বাঁ দিকের কান উপরের একটা লাল দাগ, রক্ত পড়ছে, তাঁর চুলগুলো রক্তে লাল দেখাচ্ছে।
এই বাড়ির উপর তলায় প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েয আহমেদ থাকতেন। উনার ভাই রফিক আহমেদ এর পরিবারও ছিলেন। ফয়েয আহমেদ এর ভাস্তে রুমি নোমানের (বর্তমানে এ,টি,এন, বাঙলা’র সাংবাদিক) সাথে আমি খেলা করতাম। আমাদের নীচ তলায় ডাক্তার আংকেল থাকতেন। বাড়ির সামনে বাঁ দিকের পেছনে বিহারি পরিবার থাকতো, এবং এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর আমাদের জন্য। আমার আব্বু রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ৭১ এর আগেই চাকুরী ছেড়ে দেন। উনি ব্যবসা আরম্ভ করেন।
আমাদের বাসায় আব্বুর বন্ধুরা আসতেন যারা ২৬ তারিখ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযোদ্ধারা রাতে আসতেন। এসে চুপি চুপি আব্বুর কাছে গ্রেনেড রেখে যেতেন। এই প্রথম আমি নিজের চোখে দেখতে পেলাম এর রং সবুজ। আব্বু খুব সাবধানে একটা কাঠের আলমারীর নীচে পেপার বিছিয়ে রেখে দিতেন। আংকেলরা রাতে এসে গ্রেনেড কয়েকটা করে নিয়ে যেতেন। ২৭শে মার্চ আব্বু আমাদের সবাইকে বললেন, এক্ষুনি রেডি হয়ে নাও। আম্মুতো অবাক। আব্বু বললেন, কোন সময় নেই। যা পড়ে আছে সেটাই থাক, সাথে সবাই একটা করে এক্সট্রা ড্রেস নিয়ে নাও। আম্মু তাই করলেন।
আমরা কোনরকম ডালভাত খেয়েই রওনা দিলাম। আমাদেরকে গাইড করবেন মুক্তিযোদ্ধা আংকেল এবং উনার আরো তিন ভাই, সাথে উনার মা এবং দুই বোন।
আমরা শেখ সাহেব বাজার থেকে লালবাগের দিকে গেলাম পায়ে হেঁটে তারপর পুরান ঢাকার কিছু, পরে আব্বুর কাছ থেকে নাম জেনেছি হাজারীবাগ, মানিক বাবুর ঢাল-এই পথ ক্রস করে আমরা বুড়িগঙ্গায় নৌকাতে উঠলাম। নৌকাতে উঠতে গিয়ে দেখি শতশত পাকিস্তানী আর্মি। ভয়ে আমি কাঠ হয়ে গেলাম। আম্মুর আঁচল ধরে রেখেছি। আমরা বালুরঘাট হয়ে তারপর জিঞ্জিরাতে এলাম কিন্তু আংকেলের বন্ধুরা বললেন এ জায়গা নিরাপদ নয়। আরো দূরে যেতে হবে। আমরা এবার নৌকা থেকে নেমে আরো মাইলখানেক হাঁটতে থাকলাম। পরে একটা ঠেলাগাড়িতে আমি, আম্মু, আমার ছোট বোন আর আংকেলের মা উঠলেন। আর আব্বু, আংকেলরা, আমার তিন বোন সহ বাকি সবাই আমাদের সাথে সাথে বেশ তাড়াতাড়ি হেঁটে চললেন। কতোটা পথ জানিনা, তবে বেশ দীর্ঘ সময় পথ পাড়ি দিয়ে আমরা এসে পৌছালাম আব্বু’র পরিচিত একজনের বাড়ি’তে। উনি ছিলেন জাহাজের প্রাক্তন সারেং। প্রথম রাতে ঘুমাতে যাবো কিন্তু অদ্ভূত আওয়াজ আগে শুনিনি সারারাত চললো তান্ডব, গোলাগুলি আর মর্টারের আওয়াজ। আকাশে শুধু আলো জ্বলছিল একটু পরপর। আব্বু, আম্মু এবং আংকেলরা কেউই্ ঘুমাতে পারছিলেন না তাই উঠানে এসে জড়ো হয়েছিলেন।
পরদিন সকালে জানা গেল জিঞ্জিরা ম্যাসাকার। এক সপ্তাহ থাকা হলো এই কলাকোপা বান্দুরায়। সারেং চাচা আমাদের অনেক যত্ন করলেন। ২রা এপ্রিল ১৯৭১, আমরা ঢাকা ফিরে এলাম, ঢাকা থেকে আসা অনেকেই আব্বুকে বললেন এখন নিরাপদ তাই।
বাসায় এলাম, কেমন যেন লাগছিল। আমি খুব ভয় পেতে শুরু করলাম। আম্মুর কাছ থেকে সরে পাশের রুমে যেতে ভয় লাগছিল। ঐ বয়সে বুঝিনি কিন্তু আজ বুঝি যে বাচ্চারা মা বাবার চেহারা দেখলে বুঝতে পারে আনন্দ, দুঃখ, ভীতি’র চিহৃ। আমি উনাদের চেহারায় উদ্বিগ্নতা আর অস্থিরতা দেখেছি।
একদিন উপরতলার ফয়েজ আহমেদ আংকেল আর নীচতলার ডাক্তার আংকেল চুপি চুপি কথা বলছিলেন। বাইরে যাওয়া যাবে না। সব রুমে লাইট অফ থাকবে। এমনকি টয়লেটে যেতে চাইলেও আম্মু বললেন লাইট অফ থাকবে, অন করো না কিন্তু। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে যেতাম। ধীরে ধীরে আমার ক্ষিধে কমতে থাকলো, ঠিকমত খেতাম না, ঘুমাতে পারতাম না। রাতের বেলা হেলিকপ্টারের আওয়াজ শোনা যেত।বাইরের জানালাগুলোতে কালো পেইন্ট করলো আব্বু। প্রত্যেক রাতে গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসতো। ডাক্তার আংকেল একদিন আমার আব্বুকে অনেকগুলো ভিটামিন এর প্যাকেট দিলেন আর বললেন, “ভাই আমার বাসায় এই ভিটামিনগুলো পড়ে আছে, এইগুলো আপনি আপনার বাচ্চাদের খাওয়াতে শুরু করেন।” আমাদের বাসার দুদিক দিয়ে দুটো দরজা ছিলো। একটা ড্রয়িং রুম দিয়ে বাইরে যাওয়া যেত আর আরেকটা বারান্দা দিয়ে যাওয়া যেত। আমার আব্বু ড্রয়িংরুম দিয়ে বাইরে যাওয়ার দরজাটা বাইরে থেকে তালা দিয়ে রাখতো যাতে মনে হয় বাড়িতে কেউ নেই। আর বারান্দার দিকের দরজাটা সবসময় ভেতর দিক থেকে ভালো করে লক্ করা থাকতো। নীচ তালার ডাক্তার আংকেল উনার পরিবার দেশের বাড়ি সিলেটে পাঠিয়ে দিলেন শুধু আংকেল নিজে আর উনার শালা থেকে গেলেন। ডাক্তার আংকেল আব্বুর কাছে অনুরোধ করলেন যে এই সময়তো কাজের মানুষ পাব না, কষ্ট করে আমাদের রাতের খাবারটা পাঠিয়ে দিলে ভাল হতো। আব্বু আম্মুকে তাই করতে বললেন।
মেজ এবং সেজ আপ্পি ডাক্তার আংকেল কে খাবার দিয়ে আসতো। তখন আপ্পিরা ক্লাস এইট এবং ফাইভে পড়তো। আমার আম্মু আব্বু বড় আপ্পি এবং খালামনিকে নিয়ে খুব ভয় পেতেন কারণ আপ্পি ক্লাস টেনে আর খালামনি কলেজে পড়তো। আর্মিরা নাকি মেয়েদের ধরে নিয়ে যেত।আমাদের আজিমপুর এলাকা থেকে একজন হিন্দু মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। উনি হিন্দু ছিলেন। খালামনির কাছে শুনেছি ঐ মেয়েটা নাকি খুব সুন্দরী ছিলেন। পরে তাঁর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমার এখনো মনে আছে আপ্পিরা ডাইনিং টেবিলের নীচে বসে থাকতো। ওটা ওল্ড ফ্যাশানড ছিল দেখতে কিছুটা ঘরের মতই। এ ভেতরে ল্যানটার্ন যা অন থাকতো সেখানে আপিরা লুডু খেলতো। আমি তাদের পাশেই বসে থাকতাম।
আমাদের বাসায় দুধ খাওয়া ছিল রুটিনের মত মানে প্রতিদিন খেতেই হবে। বাড়িতে যে দুধওয়ালা আসত তাঁর কষ্ট দেখে আব্বু আম্মুর খুব মায়া হোল তাঁর প্রতি। সেই লোকটি প্রতিদিন জিঞ্জিরা থেকে নদী পার হয়ে আসত। একদিন আম্মু বলল, ভাই তুমি আর কষ্ট করো না। আমরা পাউডার দুধ কিনে নেব। এই মুহূর্তে তুমি নিজের জানের উপর এত রিস্ক নিয়ে এসো না। লোকটি তাই করলো। কিন্তু শুরু হোল নতুন বিপদ।আব্বু পাউডার দুধ আনার জন্য নিউ মার্কেট যেত। কিন্তু পাক আর্মিরা তাঁর ব্যাগ চেক করতো এমনকি ওরা বেয়নেট দিয়ে টিন কেটে দেখত। এভাবে মাসের পর মাস যেতে থাকল আর নিউ মার্কেট এর কাছে যে পাক আর্মিগুলো দাঁড়িয়ে থাকতো তারা আর আব্বুর দুধের টিন চেক করতো না। মাঝে মাঝে আব্বুর সাথে উর্দুতে কোথা বলার চেষ্টা করতো। আব্বু হ্যা বা না বলে চলে আসত।
আমাদের উপরতলার ফয়েয আংকেল চলে গেলেন বাড়ি ছেড়ে। একজন নতুন আংকেল এলেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে। তিনি ছিলেন একজন পদার্থবিদ আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন ডাক্তার। আমাকে অনেক বেশি স্নেহ করতেন উনারা। উনাদের কোন বাচ্চা ছিল না, নববিবাহিত। ডাক্তার আন্টি আমাকে উপরে নিয়ে যেতেন। আম্মুকে এসে বলতো, ভাবি, শারমিনকে নিয়ে যাই।
আস্তে আস্তে আমার ভয় অনেকটা কেটে যেতে থাকলো। অন্ধকারে বসে থাকা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, রাতে ঘুম না আসা, খিদে নষ্ট হয়ে যাওয়া, ভয়ে খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, দিনের বেলাতে বারান্দায় যেতে না পারা- এইসব কিছু ডাক্তার আন্টি এসে বদলিয়ে দিলেন। আমাকে উনাদের বাসায় নিয়ে যেতেন। অনেক কথা আর গল্প শোনাতেন। খুব ভাল লাগতো। আব্বু উপরতলার scientist আংকেল এর সাথে ছাদে কি যেন দেখতেন। আমাদের বাড়ির আশে পাশের বিহারিগুলো আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতো। ওরা লক্ষ্য করছিলো আমাদের বাসায় কারা আসা যাওয়া করে তাও রাতের বেলায়। একদিন আব্বু উনাদের বললেন তোমরা কিছুদিনের জন্য এসো না। তাই হোল। আম্মু খুব ভয়ে থাকতেন খালামনি আর বড় আপ্পিকে নিয়ে।খালামনি ইডেন কলেজে পড়তেন আর বড় আপ্পি ক্লাস টেন।একদিন আম্মু বড় আপ্পি আর খালামনি কে বললেন, শোন, যদি দরজায় কড়া নাড়তে শুনিস, তোরা এই পাইপ বেয়ে নিচে পেছনের দিকে চলে যাস। তাই বড় আপ্পি আর খালামনি খুব সজাগ থাকতেন।
আমাদের বাড়ির বারান্দাটা বেশ লম্বা ছিল। শেষের দিকে কিচেন। বারান্দার রেলিং টপকে গেলেই একটু নীচ থেকে বেশ মোটা একটা পাইপ নীচের দিকে চলে গেছে যা দিয়ে যে কেউ সোজাসুজি নিচে নেমে যেতে পারবে। এটাই ছিল আম্মুর উপদেশ। একদিন দুপুরে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ এলো। আম্মু উর্দুতে বললেন, ‘কৌন হ্যায়’ ? বেশ ভাঙ্গা গলায় এক পুরুষ বলল, আমাকে কিছু ভিক্ষে দেন। আম্মু বুঝতে পারলেন এটা অবাঙ্গালির সুর। কিন্তু তিনি খুলে দিলেন। আম্মু যা দেখলেন তা তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।একজন জোয়ান ছেলে। গায়ের রঙ ফর্সা, সারা শরীর মুখ চাদরে ঢাকা। আম্মু তাকে চাল দিতে যাবেন আর অমনি তাঁর মুখ থেকে চাদরটা সরে গেল। আম্মু চেয়ে দেখে পাশের বাড়ির বিহারির মেজ ছেলে। ভয়ে আম্মু কাৎ । তাড়াতাড়ি উনি দরজাটা বন্ধ করে দিলেন এবং আম্মু একশভাগ নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে বিহারি রাজাকারেরা আমাদের পিছনে লেগে গেছে। আম্মু সেদিনই আব্বু’কে সরাসরি বলে দিলেন যা আজ নিজের চোখে তিনি দেখেছেন। আব্বু অনেক শক্ত হয়ে গেলেন।
এর ঠিক কয়েকদিন পরেই আমাদের পাশের বাসায় রাত ৯/১০ টায় পাক আর্মি হানা দিল। অনেক হৈচৈ করছে, কাকে যেন পিটাচ্ছে আর খুব জোরে গালিগালাজ করছে। সেদিন আমার আব্বু আম্মু পাথরের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। পরেরদিন সবচেয়ে আশ্চর্য কাহিনী আব্বু আম্মু কে পাশের বাড়ির লতিফ আংকেল শোনালেন যা সবাই শুনে অবাক হয়েছিল এবং অনেক হেসেছিল। আমাদের বাড়ির নাম্বার ছিল ৯/২, স্মরণিকা। পাক আর্মিদের আমাদের বাশার ঠিকানা বিহারিরা দিয়েছিল আমার আব্বু’কে মেরে ফেলবার জন্য। ঐ রাতে মূর্খ আর্মিরা আমাদের ঠিকানা না দেখেই ভুল করে ৯/১ লতিফ লজে ঢুকেছিল। লতিফ আংকেল কে অনেক মারধর করেছে কিন্তু উনার কাছ থেকে কোন কিছু না পেয়ে ওরা চলে গিয়েছিল। উনার মাথায় আর কনুই’তে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। আব্বু উনাকে অনেক সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। আজ আমার মনে অনেক শ্রদ্ধা পোষণ করি লতিফ আংকেলের জন্য, যিনি সেই রাতে এত অত্যাচার সহ্য করেও উনি আব্বুর নাম একবারও বলেননি। উনি ছিলেন একজন ব্যাংকার।
এর কিছুদিন পরেই এক রাতে আব্বু আম্মু ঘুম থেকে উঠে গেলেন আর আমাদের সবাই কে ডেকে তুললেন, বললেন তাড়াতাড়ি উঠে পড়, পাশের লেখা আর্ট প্রেসে আগুন লেগেছে। চারদিকে আগুনের উত্তাপে দাঁড়ানো অসম্ভব। আমার সেই রাতের কথা মনে আছে। আমি দুহাত দিয়ে খালামনি কে জড়িয়ে ধরেছিলাম, আমি অনুভব করেছি আগুনের উত্তাপ। আব্বু বলছিলেন এই কাজ রাজাকারেরা করেছে, কারণ এখানে ২১ শে ফেব্রুয়ারির কাগজ ছাপান হয়। বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ কর হয়েছে তাই। লেখা আর্ট প্রেসটা আমাদের বাসার ঠিক পিছনে ছিল, মানে পাশের গলিতে।
আব্বু হটাৎ করে খুব সাহস পেলেন। খবর এসেছে ইন্ডিয়ান আর্মিরা ঢুকে গেছে। আকাশে ডগ ফাইট চলছে।
যেখানে সবাই ট্রেঞ্চ অথবা বাংকারে গিয়ে লুকোয় শেখানে আব্বু, উপতলা আর নিচতলার আংকেলদের সাথে নিয়ে ছুটে যান ছাদে শুধু দেখবার জন্য। আগেরদিনে এত উঁচু বিল্ডিং ঢাকায় খুবই কম ছিল। তাই উনারা এয়ারপোর্ট থেকে কি হচ্ছে তা লক্ষ্য করতে শুরু করলেন। যুদ্ধের শুরু থেকেই আব্বু, আম্মু আর আংকেলরা চরমপত্র, চক্ষু মিয়ার পাকি আর্মিদের নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক খবর, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর খবর গুলো শুনতেন। এখন উনারা বেশ সাহস পেতে থাকলেন। আব্বু বলেছিলেন একবার নাকি নায়িকা কবরি , রাজ্জাক এবং হাসান ইমাম নাকি ঐ কেন্দ্রে গিয়ে দেশবাসীর কাছ থেকে দোয়া চেয়েছেন।
একদিন দুপুরে হঠাৎ খবর এলো কাছেই জিঞ্জিরাতে নাকি একটা পাকি প্লেনকে ফেলে দিয়েছে। সেদিন আব্বু আম্মুর মুখে হাসি ফুটে উঠে। পাকিরা নাকি সবচেয়ে বিপদে পড়েছিল আমাদের নদীপথে কারণ এরা এতো নদ-নদী কখনো দেখেনি। আরও শুনেছি এরা নাকি বৃষ্টি হলেই থেমে যেত কারণ এরা অনেক শুষ্ক আবহাওয়ার মানুষ। আব্বুর খুশি কে দেখে? উনি শুধু পথ চেয়ে বসে আছেন কবে এদেশ মুক্তি পাবে পাকিদের হাত থেকে? একদিন উপরতলার আংকেল আব্বুকে ডেকে ছাদে নিয়ে গেলেন। উনার কাছে বায়নকুলার ছিল। উনি আব্বুকে বললেন, ভাই, আমি বোধহয় কিছু একটা লক্ষ্য করছি। একটু দেখুন তো তেজগাঁও এয়ার পোর্ট এর কাছে সাদা বেলুন কেন বাঁধা? অনেকগুলো মনে হচ্ছে। মুক্তি বাহিনী আর ইন্ডিয়ান আর্মিরা সম্ভবত ডিনামাইট ফিট করে রেখেছে যাতে পাকিদের প্লেন গুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
আব্বু আমাদেরকে বললেন, কেউ বেশি খুশি হয়ে ছুটাছুটি করোনা। বাইরে যাওয়া তো বন্ধ ছিলই আর বারান্দায় যাওয়া তো বন্ধ সেই ২৫ মার্চ থেকে। তারপরেও আবার সাবধান করে দিলেন সবাইকে যাতে কেউ বারান্দায় না যায়। আমাদের বড় শত্রু বিহারিরা যারা আমাদের চারদিকে থাকতো। শুধু পা টিপে ছাদে যেত আব্বু আর আংকেল’রা। উনারা নাকি দাঁড়াতেন না, ছাদের মেঝেতে বসে আস্তে আস্তে কথা বলতেন। এমন এক সময় আব্বু আম্মু লক্ষ্য করলেন, যে বাড়ির ছেলে রাজাকার হয়ে আমাদের বাসায় এসেছিল ঐ পরিবারের কেউ নেই। রাতের অন্ধকারে বিপদ বুঝে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আমাদের বাসার সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তাঁর কিছুদিন পরে আমাদের পেছনের বিহারি পরিবারও কোথায় যেন চলে গেল। আস্তে আস্তে আমাদের পাড়া থেকে বিহারিরা বিদায় নিতে শুরু করলো। কিন্তু সামনের বাড়ির দুই বিহারি পরিবার তখন ছিল।
আমাদের বাড়ির সামনেই আমার নানা শিল্পি কাইয়ুম চৌধুরী থাকতেন, আমাদের বাসা থেকে তিন মিনিটের পথ। একদিন আমার আব্বু বাজার থেকে ফিরছিলেন হঠাৎ কোথা থেকে একটা জীপে করে কিচু পাক আর্মি পথ রুখে দাঁড়ালো। আব্বু মটরবাইক চালাতেন। উনাকে নামতে বলা হলো, উনি তাই করলেন। একজন জোরে জিজ্ঞাসা করলো, কোথায় যাও? আব্বু বললেন, বাসায় যাচ্ছি।আর্মিটা আব্বুকে জিজ্ঞাসা করলো, ঐ ব্যাগে কি আছে? আব্বু বললেন , আমি বাজার নিয়ে যাচ্ছি। ওরা হাত থেকে ব্যাগ কেড়ে নিয়ে চেক করলো। কিন্তু কিছুই পেল না। এরপর জিজ্ঞাসা করলো, কোথায় থাকো? আব্বু বিপদ টের পেলেন। যদি বলে দেন তাহলে বাড়িতে ঢুকে পড়বে, আমাদের বাসা একদম কাছেই। আব্বু বললেন, একটু দূরে থাকি।ওরা বিশ্বাস করলো না। আব্বুকে চ্যালেঞ্জ করলো। বললো, তুমি ঝুট বলছো। কিন্তু আব্বু অনড়। আমি মুসলমান, কেন মিথ্যা বলবো? পাকি আর্মি আব্বুকে বন্দুকের বাট দিয়ে ৩/৪ বার পিঠে আঘাত করলো। উনি তাঁর নীতিতে অনড় ছিলেন। তারপরেও বললেন, আমি বাসায় যাচ্ছি কারণ আমাকে বাজার নিয়ে যেত হবে, আমার ছোট ছোট বাচ্চা আছে। আল্লাহর কি রহমত ওরা আব্বুকে ছেড়ে দিল। আব্বু প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, আম্মু তাড়াতাড়ি আব্বুকে গরম তেল দিয়ে মালিশ করে দিলেন। শুনেছি কয়েকদিন উনার প্রচন্ড ব্যথা ছিল যে রাতে ঘুমাতে পারতেন না। মনে আছে খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম আব্বুর জন্য চিৎকার করে কেঁদেছিলাম।
আমাদের আজিমপুর এলাকাতে তৎকালীন ছাত্রনেতারা আসা যাওয়া করতেন। এঁরা হচ্ছেন নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ আর আ.স.ম আব্দুর রব। এজন্য আজিমপুরে পাকি আর্মিদের পেট্রল বেড়ে গেল।আমার আব্বুর গায়ে কেউ আঘাত করবে আমি তা ভাবতে পারিনা আর ঐ পাকিরা কিনা আমার আব্বুর শরীরে আঘাত করলো?
আব্বুর জেদ চেপেছিল যেভাবে হোক উনি লুকিয়ে হলেও উনি দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করবেনই। আব্বু গোপনে শীতের কাপড় পাঠাতে থাকলেন মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে। উনাদেরকে অনেক সাবধান করে দিলেন আজিমপুর, শেখ সাহেব বাজার, লালবাগ এলাকা সম্পর্কে। কারণ শেষের দিকে বিগত তিনমাস যাবত এই জায়গাগুলোতে পাক আর্মিদের প্রচন্ড যাতায়াত বেড়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা আংকেল বাড়ি এই এলাকাতেই। উনাদের পরিবারকে আব্বু আমাদের বাসায় নিয়ে এলেন। আম্মু বললেন, আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন। আমাদের বাড়িতে আরো চারজন সদস্য হলো। আমার অল্প কিছু দৃশ্য মনে পড়ে। আমাদের পুরো বাড়িটা কুচকুচে অন্ধকার। সবাই খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল। আগেই বলেছিলাম আমাদের ডাইনিং টেবিলটা অনেক বড় আর দেখতে বক্স এর মত। বাড়িতে আসা মেহমানরা ঐ টেবিলের নীচে বসে রেডিও শুনছে, চক্ষু মিয়ার কথা আর পাশে মোমবাতির আলো।
আব্বু ভোরে ছাদে গিয়ে কিসের অপেক্ষায় থাকতেন, উনাকে বেশ অস্থির দেখায়। মুক্তিযোদ্ধা আংকেলের মাকে আমরা দাদী বলে ডাকতাম। প্রতিদিন উনিও মনোযোগ দিয়ে খবর শুনতেন। একদিন খবর এলো আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। ইন্ডিয়ান আর্মিরা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। আব্বু, আংকেলরা সবাই শুধু ছাদে ছুটে যাচ্ছেন কিন্তু অন্যদেরকে বারণ করছেন। উনারা অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে ছাদের এপাশ থেকে অন্যপাশে যেতেন যাতে আশে পাশের বিহারিগুলো না দেখতে পায়।
দিন ঘনিয়ে এলো। ছোট্ট আজিমপুরের মানুষের মুখে হাসি ফিরে এলো। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে খবর এলো আমরা স্বাধীন হয়েছি।
আব্বু ছুটে গেলেন অস্থির শিশুর মত, নিয়াজি নাকি সারেন্ডার করবে।
আব্বু আর থাকতে পারলেন না, বিকেলে ছুটে গেলেন শত্রুদের পরাজয় দেখতে।
নিশ্চয়ই সেদিন আব্বু মনে মনে ডুকরে কেঁদেছিলেন। আব্বুর খালাতো ভাইকে (আবিদ) মিরপুরে জবাই করেছিল। উনার দুইভাইকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে অনেক হেলিপকপ্টার দেখা গেল। অনেক শব্দ কিন্তু এবার ভয় পাইনি, ভয় পেলনা কেউ।
বাড়িতে সবাই অপেক্ষায় শুভ ক্ষণের জন্য। এই সাড়ে নয় মাসে যতটুকু বুঝিনি আজ একটু হলেও বুঝতে পেরেছ। আমার ভয় কেটে গেল। দাদি বুকে জড়িয়ে নিলেন। শুভ বিজয়।
সূত্রঃ গেরিলা ১৯৭১।

