আমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া : মোঃ আসাদুল্লাহ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, কিশোরগঞ্জ
মুক্তিযোধার কন্ঠ ডটকমঃ
কিশোরগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জনাব মোঃ আসাদুল্লাহ সাহেবের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে’র নিজস্ব প্রতিবেদক এস.কে. শাহীন নবাবের কাছে তার ১৯৭১ সালের সৃতিবিজরিত মহান মুক্তিযুদ্ধে তার নিজের জীবন থেকে নেয়া অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
যা ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে প্রকাশিত করা হবে।
এর প্রথম পর্ব আজ দেয়া হল…
১৯৭১ সালে আমি গুরুদয়াল কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে ৭১ এর উত্তাল দিন গুলো সহ ১৯৬৬ এর ৬ দফা ১৯৬৯ এর গণআন্দোলন এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনে আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। সেই সময় আমি টগবগে যুবক। সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ খেলাধুলা ছিল আমার খুবই প্রিয়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণই আমাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে। বাবার চাকুরীর সুবাদে ছোটবেলা থেকে কিশোরগঞ্জ শহরে বড় হই। ১৯৭১ইং সালে ১৯ এপ্রিল বিকাল বেলা পাকবাহিনী কিশোরগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। এর ১৪/১৫ দিন পূর্বে কিশোরগঞ্জ আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল কে.এম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি বিরাট বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে। এর ২/৩ দিন পর কিশোরগঞ্জ শহরের উপর দিয়ে পাকিস্তানী বিমান বাহিনীর ২টি যুদ্ধ বিমান চক্কর দিলে বেঙ্গল রেজিমেন্টের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অস্ত্রের মাধ্যমে গুলি ছুড়ে জবাব দেয়া হয়। বিমান ২টি চলে গেলে সকলের মনে ভয় জাগে আবার যে কোন মুহূর্তে যুদ্ধ বিমান এসে নিরীহ মানুষের উপর বোম্বিং করতে পারে।
ভয়ে মানুষ শহর শুণ্য হয়ে পড়ে অর্থাৎ সকলেই শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। পিতামাতা সহ আমিও আামাদের পরিবার নিয়ে দেশের বাড়ি কুলিয়ারচরে চলে যাই। ৪/৫ দিন পর আমি আবার কিশোরগঞ্জ আসি। এসে দেখি শহর একদম ফাঁকা। কোন মানুষ নেই, এমনকি জীবজন্তুও নেই। হঠাৎ এক বন্ধুর দেখা পেয়ে যাই। আমাকে পেয়ে সে যেমন আকাশকে নাগাল পাওয়ার মত অবস্থা, ঠিক আমার অবস্থাও তদ্রুপ। আমরা ২ বন্ধু একসাথে থাকি, খাই, ঘুমাই। ১৯ এপ্রিল সকাল বেলা থানার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। থানার ওয়্যারলেছ অপারেটর আমাদের পরিচিত। তিনি জানালেন, তোমরা এখনই কিশোরগঞ্জ শহর ত্যাগ কর। আজ যে কোন মুহূর্তে শহরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী প্রবেশ করবে। সিদ্ধান্ত নিলাম দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে চলে যাব। ১০টার দিকে পুকুরে গোসল করার জন্য রওনা হলাম। পথে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ স্যার কে পেলাম। স্যার জিজ্ঞাসা করলেন কি খবর? তখন স্যারকে পাক বাহিনীর আগমনের খবরটি অবহিত করলাম এবং সাথে সাথে কিশোরগঞ্জ শহর ছেড়ে যাওয়ারও অনুরোধ করলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে মাথার উপর দিয়ে আকাশে একটি বিমান উড়ছিল। আমরা ভাবলাম এটা হয়ত পর্যবেক্ষণ বিমানও হতে পারে। এই ভেবে দ্রুত গোসল সেরে বাসায় গিয়ে সব গুছিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ করে কিশোরগঞ্জ শহরকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়ে রওনা হলাম।
পুরান থানা যেতেই শুনলাম শত শত লোক দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে দৌড়াচ্ছে। আর বলছে পাক সেনারা এসে গেছে, দ্রুত পালাও। আমরা সাইকেল ঘুরিয়ে আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হয়ে জঙ্গলবাড়ী হয়ে অনেক পথ ঘুরে শেষ অবধি সন্ধার দিকে গিয়ে উঠলাম আমার বন্ধুর বাড়ী নানশ্রী গ্রামে। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমাদের গুরুদয়াল কলেজের অনেক শিক্ষকসহ কিশোরগঞ্জ শহরের অনেক চেনামুখ, নানশ্রী উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা দুই বন্ধু সেখানে সেইসব আশ্রিতদের থাকা খাওয়া সহ থাকার সুব্যবস্তা করলাম। রাতে খবর পেলাম পাঞ্জাবিরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে এবং অসংখ্য বাড়ী ঘর অগ্নিসংযোগ করছে। তাদের এ দেশীয় দোসররা অর্থাৎ রাজাকার-আলবদররা দেদারছে বাড়ি ঘরে লুটতরাজ চালাচ্ছে। নিজ বাসা বাড়ির খবর নেয়ার জন্য স্থির করলাম একদিন কিশোরগঞ্জ আসব। ৭/৮ দিন পর শহরে আসার জন্য বেশ কয়েকজন রওনা দিলাম।
পথে দেখা পেলাম আমাদের গুরুদয়াল কলেজের গেইম সেক্রেটারী টুনু ভাইকে। তিনি জানতে চাইলেন আমরা কোথায় যাব। আমরা বললাম শহরে যাব। তিনি রেগে ধমকের সুরে আমাদেরকে শহরে যেতে বারণ করলেন। আমরা তার পরামর্শ মোতাবেক যাত্রা বিরতি করলাম। ৪/৫ দিন পর আবার শহরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিলাম। ৭/৮ জন রওনা দিলাম। পথে বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ, তাদের সাথে দেখা হল এবং তারা বললেন পাঞ্জাবিরা যদি কাউকে ছাত্র সন্দেহ হয় তা হলে মেরে ফেলে। সে অনুযায়ী অমাদের ২ জনকে অর্থাৎ আমি ও আমার বন্ধু জয়নালকে যেতে নিষেধ করলেন। সেইদিনই ঠিক করলাম কাউকে না জানিয়ে এমনকি আমার বন্ধুকেও না জানিয়ে কুলিয়ারচরে গ্রামের বাড়ীতে চলে আসব। বন্ধুকে জানায়নি কারণ তাকে জানালে আসতে দিত না। ঠিক তাই, কাউকে না জানিয়ে বিকাল ২টার দিকে সাইকেলে চড়ে রওনা করলাম। অত্যন্ত বিপদ সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে অনেক পথ ঘুরে রাত ১২টার দিকে এসে গ্রামের বাড়ীতে পৌছলাম। আমার উপস্থিতিতে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হল। মা-বাবা, ভাই-বোনদের কান্নাকাটি। কারণ তারা ভেবেছিল পাঞ্জাবিরা হয়ত আমাকে হত্যা করে ফেলেছে। তাই হঠাৎ আমাকে দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি।
সিন্ধান্ত নিলাম আর দেশে থাকব না। দেশে থাকা ঠিক নয়, নিরাপদ নয়। তাছাড়া পাক-বাহিনীর অমানবিক আচরণ, হত্যা, ধর্ষণ, লুট-পাট, এটা মেনে নেয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধে যাব, প্রশিক্ষণ নিব। সেখান থেকে অস্ত্র নিয়ে এসে তাদেরকে সমুচিত জবাব দিব, দেশকে শত্রুমুক্ত করব, একটি স্বাধীন দেশে স্বাধীন পতাকা উড়াব। এদিকে আমার আসার খবর পেয়ে অনেক বন্ধু-বান্ধবও কিশোরগঞ্জ শহরের খবর জানার জন্য আসতে থাকে। তাদেরকে আমি শহরের বিভৎস অবস্থা জানালাম। পাঞ্জাবীদের নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট-পাট ইত্যাদির কথা জানালাম। এসব জানার পর তারাও শপথ নিল এবং আমার সাথে একমত পোষন করল আর দেরী না করে সিদ্ধান্ত হল – যেতে হবে ভারত, ট্রেনিংয়ে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র হাতে নিয়ে এদেশকে স্বাধীন করব। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, সোনার বাংলা গড়ব। রাতেই ৭/৮ জন বন্ধু মাদ্রাসার মাঠে বসে সব ঠিক করলাম। ২/৩ দিনের মধ্যে আরো বেশ কয়েকজনকে সংগঠিত করে অত্যন্ত সংগোপনে প্রয়োজনীয় সবকিছু জোগাড় হলে চলে যাব। দিন ক্ষন ঠিক হল। আমরা ১৫ জন ভোর রাতে রওনা দিলাম। সকলের অজান্তেই শুধু মাকে একটুকরো চিঠি লিখে বালিশের নীচে রেখে গেলাম। লিচুগাছ তলায় পায়ের চপ্পলগুলো ফেলে রেখে খালি পায়ে রওনা দিলাম। কারণ রাস্তা ছিল খুবই পিচ্ছিল। দ্রুত চলতে লাগলাম। যদি কেউ টের পেয়ে যায় তবে আমাদের না যাওয়ার জন্য রাস্তা আটকিয়ে দেবে এই ভেবে। সকাল ৮ টার দিকে আমরা বেলাবো বাজারে পৌছলাম। এখানে নাস্তা খেয়ে আবার খালি পায়ে হেঁটে চলতে চলতে নারায়নপুর আসলাম। সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে নৌকা করে গন্তব্যে যেতে হবে। অর্থাৎ সি.এন্ড.বি এর ব্রীজ পার হয়ে আগর তলায় যেতে হবে। প্রতিজনে ১৫ টাকা করে দিতে হবে সাব্যস্থ হল। আমাদের ১৫ জন সহ আরও শরনার্থী নিয়ে ২০/৩০ জন হবে। নৌকা ছাড়ল দুপুর ২টার দিকে। খুব সাবধানে যেতে হবে। যদি পাকবাহিনীর টহল গানবোটের সামনে পড়ে যায় তবে মৃত্যু ছাড়া উপায় নেই। সবাইকে মাঝ বলল খালি গা হয়ে নৌকার নীচে বসে পড়ার জন্য। কারণ পাক সেনারা নাকি বাইনোকুলার দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। যদি বায়নোকুলারে শত্রুর সন্ধান টের পায় তবে সাথে সাথে স্পীড বোট দিয়ে এসে ব্রাশ ফায়ার করে সব শেষ করে দিবে। অত্যন্ত ঝুকি নিয়ে মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছি। একদিকে প্রবল ঢেউ, যে কোন মুহূর্তে নৌকা ডুবে যেতে পারে, অন্যদিকে পাক বাহিনীর উপস্থিতি।
মেঘনার মাঝ নদীতে নৌকা পৌছতেই প্রচন্ড বৃষ্টি আর প্রবল বাতাস শুরু হল। বিরাট বিরাট ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে নৌকার উপর। মনে হচ্ছিল এই বুঝি নৌকা ডুবল। এই ভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর মূল নদী পার হলাম এবং ঢেউও কমে আসল। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সন্ধ্যার দিকে দালালদের বাড়িতে এসে নৌকা ভিড়ল। এখানে রাত্রি যাবন করতে হবে। কারণ এখানে হিসাব আছে। হিসাব করে যেতে হবে এটা দালালদের জানা আছে। আমরা সহ আরও অনেক শরণার্থী সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ জন মানুষ দালালদের বাড়ীতে রাত যাপন করার জন্য বিরতি দিয়েছে। খাওয়া-দাওয়া দালালদের মাধ্যমেই হবে। রাতের খাবার খেলাম। খড় দিয়ে বিছানা বানানো হয়েছে। সেই বিছানায় ঘুমিয়েই রাত পার করলাম। ভোর হল। সকালের নাস্তা খেলাম। মোটা চালের ভাত আর শুটকি ভর্তা। সকলের জন্য একই খাবার। পেটে ভীষন ক্ষিদে। তাই সবাই তৃপ্তিসহকারেই খেলাম। সারাদিন দালালের বাড়িতে একই জায়গায় থাকতে হয়েছে। বিকালে নৌকায় উঠলাম।
রাত ১২ টার দিকে সি.এন্ড.বি’র ব্রীজের নিকট পৌছলাম। প্রচন্ড ঝোপ-ঝাড় ঘেরা জঙ্গলের পাশে নৌকা রাখা হয়। আরও নৌকা এসে একই জায়গায় থামল। কোন শব্দ নেই। অত্যন্ত বিপদসংকুল এলাকা। ব্রিজের উপর দিয়ে আধ ঘন্টা পর পর পাক সেনারা টহল দেয় এবং সার্চ লাইট উপরের দিকে মেরে বেশ কিছু জায়গা আলোকিত করে ফেলে। শত্রুর সন্ধানে একটু পর পর সার্চলাইট মারে। ব্রিজের উপর পাহারায় আছে রাজাকারের দল। তাদের সাথে নৌকার দালালদের একটি গোপন আতাত আছে। তাদের সহায়তা ছাড়া ব্রীজের নীচ দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একটি মাত্র পথ। আর কোন পথ নেই। সে কারণে নৌকায় দালালদের সাথে ব্রীজের উপর পাহারারত রাজাকারদের গোপনে একটি অর্থের লেনদেন আছে। এইভাবে রাজাকারদের সহায়তায় ব্রীজের নীচে নিচ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
এখানে একটি সিগন্যাল আছে। যখন পাঞ্জাবী সেনারা ব্রীজের উপর দিয়ে একবার টহল দিয়ে গেল তারপর আবার ৪০/৪৫ মিনিট পর আসে। এইভাবে একটু পর পর টহল দেয়। ব্রীজ পার হওয়ার সময় যদি পাঞ্জাবীদের টহলের মধ্যে পড়তে হয়, তাহলে আর রক্ষা নেই, নিশ্চিত মৃত্যু। ব্রাশ ফায়ারে বুক ঝাঝরা করে দেবে। এমন কয়েকটি ঘটনা এখানে ঘটেছে যা আমরা পরে শুনেছি।
রাজাকার এবং নৌকার দালালদের সাথে যে সংকেতটি আছে তা হলো পাঞ্জাবীদের টহল গাড়িটি ব্রীজের উপর দিয়ে চলে গেলেই রাজাকাররা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বরে শ্লোগান দেয় এবং ব্ল্যাংক ফায়ার করে। তখনই নৌকার দালালরা বুঝে নেয় এক্ষনই যেতে হবে। তখন শত শত নৌকা ব্রীজের নীচ দিয়ে কে কার আগে যাবে সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কারণ পাঞ্জাবীরা যদি এসে পড়ে তা হলে আর নেই ।
যাহোক… আল্লাহ আল্লাহ করে দুরু দুরু বকে ব্রীজ পার হয়ে নিরাপদ দুরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। দালালেরা আমাদের অভয় দিল আর কোন ভয় নেই। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর ভোর হলো আর আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌছলাম। আবছা আবছা অন্ধকার এটা বাংলাদেশ সীমান্তের শেষ প্রান্তে আগরতলা থেকে ৫/৬ কিলোমিটার দূর হবে। এখানেই আমাদেরকে নৌকা থেকে নামতে হবে। তারপর দ্রুত পায়ে হেঁটে এক রকম দৌড়ের মত করে ১ ঘন্টার মধ্যে আমরা আগরতলা কংগ্রেস ভবনে এসে নামলাম। নাম এন্ট্রি করলাম। সকালের নাস্তা দেয়া হল। গুড় এবং শুকনা চিড়া। কংগ্রেস ভবনের সামনে সুবাস বসু পার্ক। এই পার্কের মধ্যে এসে বিশ্রাম নিলাম। ৪/৫ দিন কংগ্রেস ভবনে থাকার পর আমাদেরকে পাঠানো হলো হাফানিয়া ইয়ুথ ক্যাম্পে।
ইয়ুথ ক্যাম্পে আমাদের ১দিনও থাকতে হয়নি। যেদিন গিয়েছি সেদিনই রিক্রুট হয়েছি ট্রেনিং এর জন্য। এই ক্যাম্পে অনেকেই দীর্ঘদিন যাবত অবস্থান করছে যারা ট্রেনিং এর জন্য বাছাই হতে পারেননি। আমাদের ভাগ্য ভাল। সকলেই বছাই এ টিকে গেছি। আামাদের রিক্রুট করেছেন মেজর নুরুজ্জামান সাহেব (পরে ৩ নং সেক্টর কমান্ডার) ছিলেন। তিনি প্রথমে আমাকে বাছাইয়ে নেননি। পরে ঘুরে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কি কর? আমি বললাম কলেজে ২য় বর্ষের ছাত্র। বললেন কোন কলেজ। আমি বললাম গুরুদয়াল কলেজে। তখন তিনি বললেন মৌলানা মোসলেহ উদ্দিনকে তুমি চেন? আমি বললাম চিনি। তাকে মারতে পারবা, আমি বললাম পারবো। পরে তিনি আমাকে ডেকে নির্বাচিতদের দলে নিলেন। রিক্রুট এর পরে তিনি আমাদের সামান্য ব্রিফ করলেন। বললেন তোমরা এখান থেকে কোথাও যাবে না। যে কোন সময় তোমাদের বহন করার জন্য গাড়ী চলে আসতে পারে। তোমাদের নিয়ে গাড়ী ট্রেনিং সেন্টারে যাবে। ট্রেনিং সেন্টারের নাম আম্পিনগর। এখান থেকে অনেক দুর। ভোরে যাত্রা করলে সন্ধ্যায় পৌছা যায়।
টাটার ট্রাক আসল ভোরে। ডাকাডাকি শুরু হল। সবাই ঘুম থেকে উঠলাম। সিরিয়ালী নাম ডাকল। আর আমরা ট্রাকে চরলাম। ৭/৮টি ট্রাক এক সাথে যাত্রা শুরু করল হাফানিয়া ইয়ূথ ক্যাম্প থেকে আম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে। ট্রাক চললো পাহাড়ের আঁকাবাকা পথ বেয়ে। অনেকজন এভাবে চলার পর আমাদের ট্রাকের অনেকেই বমি করেছিল। এভাবে চলতে চলতে ১৪/১৫ ঘন্টা পর আমরা আম্পিনগর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে এসে পৌঁছলাম। তখন সন্ধ্যা ৭/৮ টা হবে। আম্পিনগর ৫টি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আছে। ক্যাম্পগুলোর নাম ইংরেজী অক্ষরে করা। যেমন এ.বি.সি.ডি.ই.। এ থেকে আলফা, বি থেকে ব্রেভো, সি থেকে চার্লি, ডি থেকে ডেল্টা, এফ থেকে ইকো।
সকলের মাঝ থেকে আমরা ৩ জনকে আলফা ক্যাম্পে নিয়ে এসেছে। বাকীরা অন্যান্য ক্যাম্পে পড়েছে। একটি ক্যাম্পে ২০০ জনের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের আলফা ক্যাম্পে ১৯৭ জন আগেই যোগ দিয়েছিল। আর আমরা ৩ জন হওয়াতে ২০০ জনে পূর্ণ হলো। ক্যাম্পে পৌছার পর দেখতে পেলাম রাতের খাবার শুরু হয়েছে। আমাদের ৩ জনের খাবার পেতে দেরী হবে। কারণ আমাদের ৩ জনের নামে এখনো খাবার প্লেট, গম, বেডিংপত্র এলট হয়নি। পেটে এমন ক্ষিদে যে বলে বোঝানো যাবে না। কারণ ১৪/১৫ ঘন্টা একাধারে অনাহারে থাকা। যাওয়ার পথে পাহাড়ি এলাকায় কোন খাবার পাইনি। যাই হোক অবশেষে সবকিছু মিলল। প্লেট, মগ, বেডিং সবই পেলাম। রাতের খাবার সেরে নিলাম। ঘুমানোর জায়গা তাবুতে। একটি তাবুতে ২০ জনের থাকার ব্যবস্থা। তাবুতে ২টি সারি, প্রতি সারিতে ১০ জনের থাকার ব্যবস্থা। রাতে শোবার আগে আমাদের বাঙালি ওস্তাদ ব্রিফ করলেন। নিয়ম কানুন সব জানালেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কি করতে হবে তা জানালেন। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের কঠোর নিয়ম কানুনের কথা জানালেন। নিয়ম কানুনের ব্যতিক্রম হলে মারাত্মক শাস্তি কোয়ার্টার গার্ড। এটি একটি সামরিক শাস্তি। চোখ, হাত বেধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। বাঙালি ওস্তাদের কাছ থেকে শোবার নির্দেশ পেলাম। ঘুমানের জন্য তাবুর ভিতর দুই সারিতে চিকন বাশের পাটাতনের মত করে রাখা আছে। সেখানে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। বালিশ নেই। বালিশ ছাড়া থাকতে হবে। গায়ের শার্ট খুলে মাথার নিচে বালিশ বানালাম। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম কিছুই জানিনা।
সকাল বেলা বাশির হুইসেল। ফলিন করতে হবে। এর আগে নির্দেশমোতাবেক বিছানাপত্র গোছানো, বাথরুম করা, মুখ ধোয়ার মত সকালের সকল কাজ শেষ করতে হবে। বাঁশি বাজার সাথে সাথে ফলিন এ যোগ দিতে হবে। তারপর সেখান থেকে ৫/৭ কি.মি. দূরে অবস্থিত হেলিপ্যাড গ্রাউন্ডে দ্রুত দৌড়ে যেতে হবে। পড়ে গেলে কি র বাড়ি খেতে হবে। তাই কেউ পিছনে পড়তে চায় না। হেলিপ্যাড গ্রাউন্ডে পৌছে শারীরিক ব্যায়াম এবং পিটি প্যারেড। ১ ঘন্টার মত শারীরিক কসরত শেষে আবার শিবিরে ফিরে আসতে হবে। ফিরে আসার পর সকালের নাস্তা। ১টি ডালডায় ভাজা পুরি এবং ১০০ গ্রামের মত হালুয়া। কঠোর পরিশ্রম এবং বয়সে যুবক ১টি পুরি আমাদের ক্ষিদে একবারেই মিটল না। তারপর মগভর্তি চা খেয়ে পেট ভরতে হয়। চা খুব উন্নতমানের। একটি কথা বলা দরকার। আম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পটি খুবই উন্নতমানের। একেবারে আর্মি কায়দায় পরিচালিত হয়। অত্যন্ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন একটি ট্রেনিং ক্যাম্প। খাবার-দাবারের মান খুবই উন্নত।
যাই হোক, নাস্তা সেরে আমাদের চানমারি ফিরতে হবে। চানমারি মানে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অস্ত্রের প্রশিক্ষণ, টার্গেট বোর্ডে গুলি ছোড়া। নিশানা ঠিক করা। প্রথমেই আমাদের শিখতে হলো খোলনা জুড়না। এটি হলো একটি অস্ত্র পার্ট বাই পার্ট খোলা এবং লাগানো। এভাবে পর্যায়ক্রমে আমরা রাইফেল, স্টেনগান, এস.এল.আর, এল.এম.জি, মর্টার, গ্রেনেড এবং বিভিন্ন চার্জ প্রশিক্ষণ নিয়েছি। রাইফেল দুই রকমের একটি ৩০৩ এবং আরেকটি মার্ক-৪। মর্টারের মধ্যে আমরা ২টি মর্টারের ট্রেনিং নিয়েছি। চার্জ শিখেছি প্রায ৯টা। চার্জের মাধ্যমে ব্রিজ, কালভার্ট, ব্রিজের পিলার, গ্যাগ লাইন, পানির লাইন ইত্যাদি ধ্বংস করা যায়। চার্জের মাধ্যমে আছে প্রেসার চার্জ, কাটিং চার্জের মাধ্যমে পানির পাইপ কিংবা গ্যাসের পাইপ উচ্চ বিস্ফোরনের মাধ্যমে কেটে লাইন বিচ্ছিন্ন করা যায়। আমরা আম্পিনগর ক্যাম্পে যে সব অস্ত্রের ট্রেনিং পেয়েছি অনেকেই অন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তা পায়নি। যে কারণে আমাদের আম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পটি ছিল অন্যান্য ট্রেনিং ক্যাম্পের চেয়ে উন্নতমানের। আমরা সেখানে প্রায় ১ মাস ৫ দিন ট্রেনিং দিয়েছি। ট্রেনিং চলাকালীন সময়ের অনেক ঘটনা আছে যা এখানে সময়ের অভাবে উল্লেখ করিনি। পরে বিস্তারিত যখন লিখব তখন সব ঘটনার কথা উল্লেখ করব।
ট্রেনিং এ আমাদের আর একটি বিষয় ছিল জঙ্গল প্যারেড। অর্থাৎ গভীর জঙ্গলে পাহাড়ি এলাকায় প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে যুদ্ধ করতে হয়, থাকতে হয়, জঙ্গল থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হয় তা শিক্ষা দেয়া। ট্রেনিং শেষে আমরা চলে এলাম হোল্ডিং ক্যাম্পে। যেখান থেকে আমাদের অস্ত্র দেয়া হবে। হোল্ডিং ক্যাম্প যেখানে অবস্থিত সেই জায়গাটির নাম হেজামারা। হেজামারা জায়গাটি আগরতলায় অবস্থিত। হেজামারা হোল্ডিং ক্যাম্পে আমাদের ২ দিন থাকতে হয়েছে। হোল্ডিং ক্যাম্পে অনেক কষ্ট এবং সেখানে থাকা অনেক ঝুকিপূর্ণ। বর্ডার এলাকায় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় অ্যামবুশ করতে হয়। একবার সন্ধার পর আর একবার শেষরাতে। এ দুটি সময়ই শত্রুরা আক্রমণ করতে পারে। তাই এ সময়ে শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ রেখে এলার্ট থাকতে হয়। ট্রে র মধ্যে জমে থাকা পানির মধ্যে অ্যামবুম করতে হয়। সেই পানিতে আবার বড় বড় জোক থাকে। ট্রে র মধ্যে না থাকলে আবার জীবনের ঝুকি। পাক সেনাদের ছাউনি আমাদের থেকে খুব বেশী দূরে নয়। তাদের ছোড়া মর্টার শেষ অনেক সময় আমাদের খুব কাছাকাছি এসে পড়ে। হোল্ডিং ক্যাম্পে খাওয়া দাওয়া ছিল খুবই নিম্নমানের। ভাতের মধ্যে ছিল লাল লাল কিড়া। ডাল দিয়ে ভাত নিলে ডালের উপর শুধু কিড়া আর কিড়া ভাসত। পেটের ক্ষিদেয় এসবই খেতে হয়েছে।
সেখানে আমাদের ২৯ জনের একটি গ্রুপ ছিল। গ্রুপ কমান্ডার নির্বাচিত হলেন মোঃ জসীম উদ্দিন। আমাদের গ্রুপকে ৭০% অস্ত্র দেয়া হল। সবাইকে অস্ত্র দেয়া হয়নি। ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল জনাব কে.এম. সফিউল্লাহ সাহেব আামাদের ব্রিফ করলেন। যে ২৯ জন নিয়ে আমাদের গ্রুপ হলো তাদের সবাই কুলিয়ারচর উপজেলা বাসিন্দা। আমাদের উপর কড়া নির্দেশ হলো আমাদেরকে প্রথম নিজ উপজেলা কুলিয়ারচরকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। আমাদের জন্য বড় নৌকা ভাড়া করা হল। আমাদের সাথে কটিয়াদী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারাও একই নৌকায় আসেন। আমাদের গাইড ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেসবাহ উদ্দিন সাহেব। তিনি পথঘাট ভাল চেনেন। এর পূর্বেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ভারত থেকে দেশে এসেছেন। মেসবাহ উদ্দিন সাহেব অত্যন্ত অভিজ্ঞ লোক।
হেজামারা থেকে আমরা সকাল ৯টায় নৌকায় উঠলাম এবং রাত ২ টার দিকে কুলিয়ারচরের ডোমরাকান্দা বাজারে পৌছলাম। নৌকা থেকে নামার পর আমরা প্রত্যেকেই যার যার বাড়ীতে চলে গেলাম। নির্দেশ অনুযায়ী খুব গোপনীয়তা রক্ষা করলাম। ভোররাতে এসে বাড়িতে উঠলাম। মাকে আস্তে আস্তে ডাকলাম। মা চিৎকার করে উঠলেন। মাকে আমি আবার ডাকলাম, মা আমি এসেছি, তুমি ওঠ। মা সহ সবাই আমার হাতে অস্ত্র দেখে অবাক এবং আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ল। বড়ভাইকে ডেকে সবকিছু খুলে বলার পর উনি বুঝতে পারলেন এবং আমার অস্ত্র নিরাপদ গোপনীয় জায়গায় রেখে দিলেন। ৪/৫ দিন বিশ্রামের নির্দেশ ছিল। এর মধ্যে আমাদের ইনচার্জ এবং কমান্ডার মিলে কুলিয়ারচর থানায় কোথায় কি কি ঘটছে, কি করতে হবে, সব কিছু ঠিক ঠাক করে নিলেন। আমি রানারের মাধ্যমে খবর পেলাম সন্ধার পর লক্ষীপুর স্কুল মাঠে সমবেত হতে হবে। সকলেই সেখানে অস্ত্র ছাড়া সমবেত হলাম। সিদ্ধান্ত হল রাত ২টার দিকে পীরপুর নামক স্থানে রাজাকারের অবস্থানের উপর আঘাত হানতে হবে। রাজাকাররা গ্রামবাসীদের অত্যাচার করা সহ বিভিন্ন ধরনের লুটতরাজ চালাত। তাই পাক বাহিনীর সহায়তাকারী রাজাকারদের খতম করে দিতে হবে এই পণ করলাম। শক্ত আঘাত হানতে হবে। শেষ রাতে আক্রমন হবে। রাজাকাররা একটি রেলসেতু পাহারায় নিয়োজিত ছিল। আমরা এক দালালের বাড়ীতে রাত ১২টার দিকে উপস্থিত হলাম। দালাল মানে পাক বাহিনীর সহযোগী। প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ সমর্থন পাঞ্জাবীদের প্রতি। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে সে ভয়ে এবং আমাদের কমান্ডারের নির্দেশে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। আমাদের খাওয়া শেষ হওয়ার কিছু ক্ষন পর আজানের শব্দ ভেসে এল। এ সময়টাই শত্রুদের উপর আঘাত করার মোক্ষম সময়।
কিভাবে কোন দিক থেকে আক্রমন হবে সে কাজটি দিনের বেলাতেই ঠিক করে রাখা ছিল। সকলেই একসাথে রাজাকারের অবস্থানের উপর গুলি ছুড়তে শুরু করলাম। আমি আমার এস.এল.আর থেকে সিঙ্গেল ফায়ার না করে ব্রাশফায়ার করতে লাগলাম। রাজাকাররা কোন পাল্টা জবাব দেয়নি। তারা যে যেভাবে পারল পালিয়ে গেল। এদিকে ভোর হয়ে গেল। আমরাও ফায়ার বন্ধ করে দিলাম। পরে সামনের ধানক্ষেতের মধ্যে দেখলাম ২ জন রাজাকার আহত এবং ২ জনের লাশ পড়ে আছে। গ্রামবাসী পলায়নরত ৪ জন রাজকারকে আটক করল। সকল গ্রামবাসী যখন জানতে পারল মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের ক্যাম্পে আঘাত হেনেছে, তখন সবাই জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিশে গেল।
সেদিনের এই দৃশ্য যে কি আনন্দের, কি আবেগময় তা এই স্বল্প পরিসরের লেখার মাধ্যমে বোঝানো যাবে না। এভাবে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা অনেক অপারেশন এবং যুদ্ধ করেছি যা পর্যায় ক্রমে লেখা হবে।
চলবে…
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/২৬-০৬-২০১৬ইং/ অর্থ