টাঙ্গাইলের বীরাঙ্গনা রেখা এখন যৌনপল্লীর বাসিন্দা !
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্কঃ
‘যুদ্ধের সময় রাজাকার ধরে নিছিলো। ২০ দিন ক্যাম্পে আটকে রেখেছিল। তখন আমার বয়স ১৫, ১৬ বছর। মুক্তিযোদ্ধারা যখন উদ্ধার করে তখন শরীরের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এক বছর কিছু খাইতে পারি নাই। বারবার শুধু সেই দিনগুলোর কথা মনে হইছে। এক বছর পর বাপ, ভাইয়েরা পাঞ্জু মিয়া মেম্বারের সঙ্গে সতীনের সংসারে বিয়ে দিয়েছিল। কিছুদিন পরই স্বামী, সতীন খুব অত্যাচার করছে। নূরনবী নামে আমার ছেলে ছিলো, তাকে দুধ খাওয়ানোর সময়ও দেয় নাই।
দুই বছর পর সে মারা গেছে। সেই সংসারও টেকে নাই। পরে গ্রামের একজন এই পাড়ায় ছিলো, তার হাত ধরেই এখানে আসছি। কূল না পাইয়ে আইছি, তারপর থেকে এহানেই আছি’ কথাগুলো কান্দাপাড়ার বীরাঙ্গনা রেখার।
রেখা ভাগ্য বিড়ম্বিত নারী। তারা পিতা হোসেন আলী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তিনি নিজেও সম্ভ্রম হারিয়েছেন পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে। তার জন্ম টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সিলিমপুর ইউনিয়নে। অভাব ও পরিস্থিতির কারণে লেখাপড়া হয়নি। পাঁচ ভাই, বোনের মধ্যে তৃতীয় রেখা প্রায় ৩৫ বছর ধরে আছেন কান্দাপাড়া যৌনপল্লীতে। ভাই, বোনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও সামাজিক বাস্তবতায় আর বাড়িতে যাননি। ষাট বছর বয়সী রেখা এখনও পল্লীতেই থাকেন। ঘর ভাড়ার টাকায় খেয়ে, পরে বেঁচে আছেন। লোকলজ্জার ভয়ে এক প্রকার বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন এই শহীদ সন্তান।
কান্দাপাড়ার অন্ধকার পল্লীর এক ঘরে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘এইটা কোনো জীবন না। এইটা তো আমি জীবন বলে মনে করি না। বড় কষ্ট কইরে থাকি। মনের ভেতরে অনেক দুঃখ আছে, কষ্ট আছে। কারো কাছে যাই না। কার কাছে যামু? গেলেই তো ঠ্যালা, গুতা দিবো। ইজ্জতহারা কইবো। এই জায়গায় আইছি, এই জায়গায়ই জীবন পার করছি। এইটা আমার এক বোনের বাড়ি, ভাড়া উঠাই। বোন যা দেয়, তাই দিয়া এক প্যাট আল্লায় চালায়। এখন আমার কেউ নাই, কেউ তো আর বিয়াও করবো না’।
সরকারি স্বীকৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার অনেক আগে কার্ড দিছিলো। এখন সেইগুলান নাই, ভাঙ্গাচোরার পর সবকিছু মাইনষে নিয়া গ্যাছে গা। আমারে কোনো টাকা, পয়সা বা ভাতা দেয় নাই। সরকারি কেউ খোঁজ নিতে আসে নাই। এর আগে এক মেয়ে আইছিলো ফটু লইছে, পরে তো আর কোনো খোঁজ পাইলাম না। এখানে তো আজীবন থাকা যাবে না। কিন্তু যাওয়ার তো জায়গা নাই। সরকার যদি মাথাগোঁজার ব্যবস্থা করে, শহীদ সন্তান ও বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে বাকি জীবনটা কাটবে।’
বীরাঙ্গনা ‘রেখা’র সম্পর্কে আলাপকালে টাঙ্গাইল যৌনপল্লীর একটি সংগঠনের নেত্রী আঁখি আক্তার বলেন, ‘রেখা বড্ড অভাগী। এই জীবনে তার কিছুই নাই। এই পল্লীতেই জীবন শেষ করে দিলো। একাত্তরের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা তারে ধরে ক্যাম্পে রাখছিলো। তার বাপও যুদ্ধের সময় শহীদ হইছে। কিন্তু সে এখনো স্বীকৃতি পায় নাই। বয়স হইছে, এখন আর কাজ, কাম করতে পারে না। বোনের ঘর আছে, ভাড়া তুলে খায়। পল্লীতেই থাকে। মাঝে মাঝে পাড়ার মেয়েরাও কিছু সাহায্য করে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যৌনকর্মীর জীবন আসলে জীবন নয়। এই জীবনটা অনেক কষ্টের, যন্ত্রণার। একজন বীরাঙ্গনা নারী স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও যৌনপল্লীতে থাকবেন, এটা মেনে নেয়া যায় না। এটা সবার জন্য লজ্জার, কষ্টের’।
নারী অধিকারকর্মী ও বেসরকারি সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবীর বলেন, ‘স্বাধীনতা পেলেও যাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তাদের অনেকেই এখনো দু:সহ জীবন যাপন করছেন। এই নারীও তাদেরই একজন। স্বাধীনতার এত বছর পরও বীরাঙ্গনারা যৌনপল্লীতে বসবাস করবেন- এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। কিন্তু তারপরও এটাই নিয়তি, অনেক শহীদ পরিবারের সদস্য, বীরাঙ্গনা নারী ও তাদের সন্তান, সন্ততিও অন্ধকার পল্লীতে জীবন পার করছে। রাস্ট্রের পক্ষ থেকে এমন পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। এ লজ্জা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই’।