দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান খালেদার
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্কঃ
গুলশানের রেষ্টুরেন্টে সন্ত্রাসী হামলাকে ‘ভয়াবহ জাতীয় সংকট’ হিসেবে অভিহিত করে সন্ত্রাস দমনে ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
তিনি বলেন, ‘কে ক্ষমতায় থাকবে, কে ক্ষমতায় যাবে, সেটা আজ বড় কথা নয়। আজ আমরা যারা আছি, আগামীতে তারা কেউ হয়তো থাকবো না। দেশ থাকবে, জাতি থাকবে। সেই দেশ ও জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আজ বিপণ্ন। আমরা যে যাই বলি, আমাদের কিছুই থাকবে না, কোনো অর্জনই টিকবে না যদি আমরা সন্ত্রাস দমন করতে না পারি।’
রোববার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি নেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন খালেদা জিয়া।
বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘ভৌগলিক ও রাষ্ট্রীয় গন্ডি পেরিয়ে সন্ত্রাস আজ বিশ্বের দেশে দেশে রক্ত ঝরাচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও আজ সন্ত্রাসের বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত। এটা আমাদের জন্য নতুন এক ভয়াবহ জাতীয় সংকট। শুক্রবার রাতের ঘটনায় শুধু একটি রেস্তোরাঁ নয়, সারা বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, শান্তি, স্থিতিশীলতা, আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা।’
দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর সুদূরপ্রসারি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে সকলের মিলিত প্রয়াসে এই সংকট মোকাবিলা করার আহ্বান জানান প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রী।
গুলশানের হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলায় ঘৃণা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই পৈশাচিক সন্ত্রাসী হামলা এবং নারীসহ দেশি-বিদেশি নির্দোষ নাগরিকদের এভাবে হত্যার ঘটনার নিন্দা করার কোনো ভাষা নেই। আমরা গভীর বেদনাহত এবং ক্ষুব্ধ। কোনো অজুহাতেই শান্তিপ্রিয় নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সুস্থতার লক্ষণ নয়। এই বিকারগ্রস্ততার প্রতি আমরা তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করছি।’
কূটনৈতিক জোনের কঠোর নিরাপত্তা ভেদ করে সন্ত্রাসী হামলা হওয়ায় ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, ত্রুটি এবং সন্ত্রাসীদের সামর্থ প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে’ বলেও মনে করেন খালেদা জিয়া।
তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা এখন আর চোরাগোপ্তা হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশে ভয়াবহ সন্ত্রাসের দানব গোপনে বেড়ে উঠেছে। তারা এখন পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে প্রকাশ্যেই ভয়ংকর ছোবল হানছে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে পরিস্থিতিকে আরো অবনতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।’
কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা ও নিরপরাধ মানুষের হত্যাযজ্ঞকে মেনে নিতে পারে না- উল্লেখ করে বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘এমন অযৌক্তিক, নিষ্ঠুর, হঠকারী ও ভুল পথে কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। কোনো আদর্শ কিংবা ধর্মই এ ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনুমোদন করে না। শান্তির ধর্ম পবিত্র ইসলাম নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা এবং সন্ত্রাসের ঘোরবিরোধী।’
সন্ত্রাসী হামলার পর সহানুভূতি ও সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে তারা সন্ত্রাস মোকাবিলায় সম্ভাব্য সকল ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তবে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রথম কর্তব্য হচ্ছে সে দেশের সরকার ও জনগণের।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘বর্তমানে সন্ত্রাসের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেটা নিছক আইন-শঙ্খলাজনিত মামুলী কোনো সমস্যা নয়। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সন্ত্রাস মোকাবিলা করা যাবে না। এই সংকটের শেকড় আরো অনেক গভীরে। সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে এই সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।’
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রহীন দেশে, স্বৈরাচারী শাসন, অসহিষ্ণু রাজনীতি, দমন-পীড়নের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং সুশিক্ষার অভাব ক্রমাগত চলতে থাকলে সেখানে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পদক্ষেপের মাধ্যমে এই কারণগুলো দূর না করলে সমাজ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করা যায় না। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের জাতীয় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কেবল গণতান্ত্রিক পরিবেশই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতে পারে।’
সন্ত্রাসী হামলা দমন ও জিম্মিদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থার যেসব সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানান খালেদা জিয়া।
উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত দুই পুলিশ সদস্যের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে তাদের শোকার্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান বিএনপি প্রধান। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় যারা আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
হত্যাকাণ্ডের শিকার বিদেশিদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে তাদের নিজ নিজ পরিবার এবং ইতালি, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সরকার এবং জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান খালেদা জিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।