বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকমঃ
কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেকে ছাপিয়ে পরিণত হন একটি প্রতিষ্ঠানে। কোন পরিচয়ে তাঁকে সম্বোধন করবো জানা নেই। কোন বিশেষণ দিয়ে তাঁকে আমরা সীমাবদ্ধ করতে পারিনা।বাঙলাদেশের থিয়েটার আন্দোলন ও মঞ্চ নাটকের পুরোধা, চলচ্চিত্রকার এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান যোদ্ধা তিনি। তবুও সব ছাপিয়ে যেন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
স্বদেশ যখন পাকিস্তানী হায়েনার আক্রমনে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হচ্ছে প্রতিদিন সে সময়ে তিনি ও তাঁর অসীম সাহসী দল কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকা, আরিচা, সাভার, মানিকগঞ্জ, কামরাঙ্গিরচর সহ বিভিন্ন স্থান। সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন বীরদর্পে, শহীদ মানিক পরবর্তী সময়ে তিনি কম্যান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনীর স্বাধীনতা অর্জনের মুহূর্ত পর্যন্ত।
একাত্তরে মাত্র মাত্র ২১ বছর বয়েসী এই দুর্ধর্ষ কম্যান্ডার ও তাঁর বাহিনী ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর পাক আর্মি ও শান্তি কমিটির রাজাকারদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের পরাজিত করে কালিয়াকৈর, ধামরাই ও সাভার মুক্ত করেন। মিরপুর-গাবতলী ব্রিজ পর্যন্ত তখন মুক্ত এলাকা হিসাবে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। এমনকি সাভার রেডিও স্টেশনও তাঁদের দখলে ছিল।
জন্মভুমি বাঙলা’র চরম দুঃসময়ে রুখে দাঁড়ানো মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু নিজের জীবনকে ব্যর্থ প্রানে পরিণত হতে দেননি তিনি, মাতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন মাত্র ২১ বছর বয়েসে। রবি ঠাকুরের এ গানটি যেন তাঁর একাত্তরের দিনগুলোরই কাব্যিক রূপ …
ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো।
একলা রাতের অন্ধকারে আমি চাই পথের আলো ॥
বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনীর কম্যান্ডার। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ের অনেক জানা-অজানা কথা তুলে এনেছেন তাঁর এই স্মৃতিচারণায়।
২৬শে মার্চ ১৯৭১, সকালবেলা আমরা গেলাম কারফিউয়ের মধ্যে রাজারবাগ দেখতে। ভয়াবহ ছবিগুলোতে যে রকম দেখা যায়, হাত-পা খণ্ড-বিখণ্ড বিভিন্ন রাস্তার মধ্যে পড়ে আছে। সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। পোড়া দেহ দেখতে পেয়েছি পুলিশের। ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুরো এলাকা। জোনাকী হলের সামনে এবং রাজারবাগ। এরপর ভাবলাম কী করব। আমাদের কাছে সাতটা রাইফেল আর দেড়শ’ থেকে দুশ’ রাউন্ড গুলি আছে। এই গুলিগুলো নিয়ে আমরা এখন কী করি। অস্ত্রও তো ঠিকমতো চালাতে জানি না। অভিজ্ঞতার দৌড় ছবিতে দেখা পর্যন্তই। যা হোক, আমরা প্রতিশোধ নেব। কিসের প্রতিশোধ নেব, কেমনভাবে প্রতিশোধ নেব জানা নেই। কোথায় যাব তাও ঠিক নেই। ঠিক করলাম, একদিন অপেক্ষা করি। কোথাও কোনো যোগাযোগ নেই, টেলিফোন লাইন কাটা।
২৬ তারিখ একটা বক্তৃতা হলো ইয়াহিয়া খানের। কারফিউ সম্পর্কে কী কী সব বলল। ২৭ তারিখে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ল। তারপর কারফিউ ওঠানো হলো চার ঘণ্টার জন্য। আমরা সোজা আমাদের এই অস্ত্রগুলো বেঁধে জিঞ্জিরা চলে গেলাম। রিকশা করে নদীর পাড়ে গিয়ে নৌকা করে পার হলাম। আমাদের চারদিকে লাখ লাখ মানুষ তখন জিঞ্জিরা ছুটছে। সেখানে গিয়ে ইপিআরের কিছু লোক পেলাম। পুলিশেরও কিছু লোক পাওয়া গেল। তাদের নিয়েই আমরা ট্রেনিং শুরু করলাম। জিঞ্জিরা যে আমাদের জন্য নিরাপদ না, এ রকম খুব একটা ভাবিনি। কিন্তু হঠাত্ করে ৩০ শে মার্চ দেখলাম পাকিস্তানিদের কয়েকটা স্যাবর জেট জিঞ্জিরার ওপর দিয়ে উড়ল। এবং আমাদের কিছু অর্বাচীন, তথাকথিত ছাত্রনেতা ওগুলোর দিকে গুলি করল। এটি ছিল মারাত্মক একটি ভুল সিদ্ধান্ত। যা হোক, আমরা কয়েক হাজার ছেলে ট্রেনিং নিচ্ছি, ইপিআরের অধীনে।
আমার মনে আছে, তার পরই, এপ্রিল মাসের ২ তারিখ সকাল বেলা পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেখানে এসে নামল। ওরা এসেছে নৌযানে করে। হাজার হাজার সেনা। পুরো এলাকা ঘেরাও করল এবং তারপর যাদের পেরেছে তাদেরই মেরে ফেলেছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। নারীদের ওপর অত্যাচার করেছে এবং আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে মানুষের শরীরে, জীবন্ত মানুষের শরীরে। এটি এমনই এক ভয়াবহ দৃশ্য যে আমার চোখে এখনও তা ভাসে। এ রকম ভয়াবহ দৃশ্য আমি আর জীবনে দেখিনি।
আমরা আগস্ট মাসে ঢাকায় প্রবেশ করি। আবার এর মধ্যে বর্ডার ফাইটও ছিল। আমাদের দায়িত্ব পড়ে ঢাকার উত্তর অংশে। মানিক হলো কমান্ডার, আমি সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। এভাবে আমাদের বেইজ ক্যাম্প বা আস্তানা তৈরি করি রৌহাই, ধামরাইতে। সেখান থেকে সরাসরি নৌকা করে নদী পার হয়ে আমরা চলে আসতে পারি সাভার। তারপর সাভার থেকে ঢাকায় ঢুকে পড়ি। কিন্তু এই পথে প্রচুর চেক পয়েন্ট আছে। আমরা অস্ত্র নিয়ে এসেছি অনেক, অ্যামুনিশন, গ্রেনেড নিয়ে এসেছি। এসব কিছু ঢাকার বাইরে রেখে ঢাকায় অপারেশনটা করতে হবে। ‘ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনী’ নাম দেওয়া হলো। আমাদের কাজ ঢাকার আশপাশের ব্রিজগুলো ভেঙে দেওয়া। ঢাকার উপকণ্ঠে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে মুভমেন্টগুলো আছে তা বন্ধ করতে হবে। দূরপাল্লার যত যান চলাচল আছে সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। আর সেই সঙ্গে ঢাকা শহরের ভেতরে ঢুকে হিট অ্যান্ড রান করতে হবে। আরবান গেরিলা ওয়ারফেয়ার করতে হবে।
তখন হাবিবুল আলম, ফতেহ আলি, চাষী জিয়া, চুন্নু ভাই-এরা সবাই অপারেশন করছে। ঢাকা শহরে বেশ ভালো ভালো অপারেশন হয়েছে তখন। শেরাটন হোটেলের অপারেশনটা হয়েছে। ফার্মগেট অপারেশন হয়েছে। এখন উত্তর দিক থেকে চাপ দেওয়ার ভাবনা খালেদ মোশাররফের মাথায় এসেছে। উনি ঢাকাকে সব দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছিলেন।
আমাদের অপারেশন বায়তুল মোকাররাম, ডিআইটি, মালিবাগ রেললাইন। অপারেশন কাকরাইল, অপারেশন রেডিও পাকিস্তান। অল ইউনিভাসির্টি, অল স্কুল যেগুলো খোলা ছিল সেগুলো পুনরায় বন্ধ করে দেওয়ার জন্য গ্রেনেড আক্রমণ। আমাদের অপারেশন হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ এবং সেটি বন্ধ করে দেওয়া, অক্টোবর মাসে আমাদের আক্রমণ হচ্ছে মিরপুর ব্রিজ আক্রমণ। এবং তারপরে ঢাকার আউট স্কার্টে যেমন কল্যাণপুরে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুটি যানের ওপর, পানিতে যাচ্ছে নৌযান, সেগুলো আক্রমণ আর ওখানে শাহাবুদ্দীন, শিল্পী শাহাবুদ্দীনকে আমরা প্লেস করেছিলাম শনমাসি, বসিলা অঞ্চলে ও ভাটি ভাওয়াল অঞ্চলে। আর আরেকটা ফ্ল্যাঙ্ক করেছিলাম ধামরাইয়ের দিকে, আরেকটা জিরাব অর্থাত্ মিরপুরের হাওরটার ঠিক পেছনে। সাভার ডেইরি ফার্মটার যে পজিশন। আক্রমণ চলছিল উত্তর এবং দক্ষিণ দিক থেকে। কারণ তখন হাবিবুল আলম, শাহাদাত চৌধুরী-প্রয়াত বিচিত্রার সম্পাদক, ফতেহ আলী, চাষী জিয়া, মায়া, বদি, জুয়েল, রুমি এরা তখন পূর্বদিক থেকে ঢাকাকে আক্রমণ করছে।
খুবই প্রিপ্ল্যানড ও সুচিন্তিত। একটি যুদ্ধ পরিকল্পনা খালেদ মোশাররফের। আমরা যে অপারেশনগুলো ঢাকা শহরে করেছি তার মূল লক্ষ্য ছিল যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করব এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্ষতিসাধন করব। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জনগণের যে সাহস এবং আকাঙ্ক্ষা সেগুলোকে উজ্জীবিত করব এবং ধরে রাখব।
আর মূল অপারেশন হচ্ছে যে ডিআইটি অপারেশন। খুব সুচিন্তিত অপারেশন। বায়তুল মোকাররম অপারেশনের পর এটা বড় অপারেশন। দুটো অপারেশনই বিবিসি এবং এবিসি (অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং সেন্টার) ওই দিনই প্রচার করল। আরেকটি ছিল মালিবাগ রেললাইন অপারেশন, ট্রেনলাইনগুলো উড়িয়ে দেওয়া। ফেরদৌসের (ফেরদৌসের বাবার কারণে আমরা গেরিলা পত্রিকাটি বের করতে পারতাম।) গেরিলা পত্রিকার জন্য আমরা ব্যবহার করেছি সেগুনবাগিচা স্কুলের সাইক্লোস্টাইল মেশিন। আর স্টেনসিল কেটে তখন সাইক্লোস্টাইল করতে হতো। আজকালকার মতো এত কারিগরি উন্নয়ন হয়নি বাংলাদেশে। বাংলা টাইপরাটাইটার ছিল না বলে ইংরেজি বের করতে হতো। কাজগুলো করেছি আমরা কিছু ছেলেমেয়ে। ইংরেজি মিডিয়ামের। উনি কাজ করতেন ইউএসএইডে। উনার ওখানে রাতে সাইক্লোস্টাইল করে আমেরিকার দূতাবাসের একটি সংগঠন থেকে আমরা পত্রিকা বের করতাম। আমেরিকা তখন আমাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে মদদ দিচ্ছে যুদ্ধে। এগুলো খুব একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এ পত্রিকাটি শেরাটন হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে ভোরবেলায় আমাদের বাঙালি এবং বোম্বাইয়া কিছু লোক, বোম্বাইয়া বলতে গুজরাটি, ওদের দিয়ে লিফলেটগুলো পাঠাতাম।
ফকিরেরপুলের সামনে থেকে একটি ফিয়াট গাড়ি প্রথম হাইজ্যাক করি। গাড়িটায় এবার এক্সপ্লোসিভটা ফিট করা হবে। গাড়ি চালাবে আরিফ। সঙ্গে থাকবে ফেরদৌস, ফিরোজ। এরা ঢাকা ট্রেইনড। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। ওদের একটু ট্রেনিং আমরা এখানেই দিয়েছিলাম। কীভাবে এক্সপ্লোশন করাতে হবে। ওরা গাড়িটা চালিয়ে গেল। আমরা এখানেও এক মিনিটের একটা ফিউজ দিলাম। কারণ ওখান থেকে হেঁটে বায়তুল মোকাররম ক্রস করে মসজিদের দিকে চলে আসবে। তারপর স্টেডিয়ামের দিকে চলে যাবে। আর এর মধ্যে গ্রেনেড চার্জ হবে।
ওরা গিয়ে গাড়িটাকে প্লেস করেছে জায়গামতো। খালেদ, ফেরদৌস আর ফিরোজ। ওরা সবই প্লেস করেছে। আর দু’জন গ্রেনেড নিয়েও দাঁড়িয়েছে। ফিউজে আগুনও দিয়েছে। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয় করে… আমাদের গোনা চলছে… কিন্তু, নব্বই সেকেন্ড চলে গেল ব্রার্স্ব করে না। এখন কী করা যাবে। তাড়াতাড়ি করে একটা মিটিংয়ে বসলাম। আমাদের আরভি অর্থাত্ রিক্রুটিং ভেন্যু যেটাকে বলে, আমরা রিগ্রুপ হলাম। রিগ্রুপ হয়ে সেখানে আমি কমান্ডার হিসেবে আমার খুব মেজাজ খারাপ। তখন আসাদ বলল, ‘আমি যাই। আমি গিয়ে গাড়িতে ঢুকে দেখি কী অবস্থা। যদি দেখি যে ফিউজটা ঠিক আছে তাহলে ওটা জ্বালিয়ে দিয়ে চলে আসব।’ একটা এক্সট্রা ফিউজ নিয়ে ও গেল। হাঁটতে হাঁটতে আমরা আবার গেলাম। দূরে দাঁড়িয়ে আছি।
আসাদ আস্তে করে গাড়িটার কাছে গেল। গিয়ে দেখে আর্মিরা গল্প করছে। হাঁটাহাঁটি করছে। ও আস্তে করে গাড়ির দরজা খুলেই দেখে ধোঁয়া। ফিউজটা অর্ধেক পুড়ে আর পোড়েনি। তখন ও এটাকে কেটে ইগনিশন করে করিডোরটা পার হতে পারেনি… প্রচণ্ড শব্দ। পুরো শহর কাঁপিয়ে গাড়ি বিস্ফোরিত হলো। আর পাকিস্তানি উনিশজন সেনার দেহ খণ্ড খণ্ড হয়ে চারদিকে পড়ে গেল। লোকজন ছুটছে প্রাণভয়ে। আমরা কিছু লোক যে এই অপারেশন করেছি সেটা কারও বোঝার কোনো উপায় নেই। অনেক সাধারণ লোকও মারা গিয়েছিল ওই অপারেশনে, এ জন্য আমরা খুবই দুঃখিত। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য একটি সমুচিত জবাব ছিল এটি। এটি ছিল জিরো পয়েন্টের ওপর একটা অ্যাটাক। জিপিও হচ্ছে জিরো পয়েন্ট। ওর ওপরই অ্যাটাক করেছি আমরা। বায়তুল মোকাররম এবং জিপিও। আরও অনেক অপারেশন আছে। সব ক’টা তো বলা যাবে না। সব কথা লেখাও যাবে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এগুলোর পরই আমার নামে একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। আমার মাথার ওপর পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
১৯৭১ সালে ঢাকা অপারেশনের কথা মনে হলে অনেক স্মৃতির মাঝে আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান কার্যালয়ের ট্রান্সমিশন সেন্টার উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। সেই ঘটনা পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। এর কারণ ছিল, পাকিস্তস্নান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান কার্যালয়টি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গভর্নর হাউস বা এখনকার বঙ্গভবনের খুব কাছে। আজকের যেটা রাজউক ভবন আর সেদিনের ডিআইটি ভবনেই ছিল পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান সম্প্রচার কেন্দ্র। যে গভর্নর হাউসে ‘ঠ্যাটা মালেক’ নামে পরিচিত আবদুুল মালেক থাকতেন, যে গভর্নর হাউসে বসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা রাও ফরমান আলি, নিয়াজি বৈঠক করতেন, যেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাম আযম এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গ রাজাকার-আলবদররা এসে বৈঠক করত, তার ৩০ গজের ভেতর এত বড় একটি বিস্ফোরণের পর পাকিস্তান বাহিনী বুঝে গিয়েছিল, তাদের নিরাপত্তাবূ্যহ আর সুরক্ষিত নেই। সে সময় বিবিসির খবরেও বলা হয়েছিল, মুক্তিবাহিনী এখন পাকিস্তানি বাহিনীর নিরাপত্তা প্রাচীরের স্পর্শকাতর স্থানে চলে এসেছে। যার প্রমাণ ঢাকার টেলিভিশন সম্প্রচার ভবনে মুক্তিবাহিনীর সফল হামলা।
এ অপারেশনে মূল দায়িত্ব পালন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলী। তিনি তখন পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান কার্যালয়েই কাজ করতেন। আমরা পরিকল্পনা করলাম টেলিভিশন কেন্দ্রের ট্রান্সমিশন সেন্টার, টাওয়ার এবং নিচে যেখানে টেপ চালানো হয়, সেগুলো উড়িয়ে দেব। সমস্যা হলো, হামলা চালাতে হলে ভেতরে এক্সপ্লোসিভ নিতে হবে। সে কাজটিও মাহবুব আলীই করেছিলেন। তিনি তখন প্রতিদিন একটু একটু করে এক্সপ্লোসিভ ভেতরে নিয়ে যেতেন। প্রতিদিন আড়াই আউন্স করে হালুয়ার মতো দেখতে এ এক্সপ্লোসিভ তিনি নিতেন টিফিন ক্যারিয়ার ও জুতার মধ্যে করে। খুব সতর্কভাবে কাজটি করা হচ্ছিল। কারণ কোনো অবস্থাতেই ধরা পড়া যাবে না। ধরা পড়লে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আমাদের যারা গোপনে সহায়তা করছেন, পাকিস্তানি বাহিনী যদি তাদের ধরে ফেলতে পারে, আমাদের গোপন অবস্থানের কথা জেনে যেতে পারে, অনেক প্রাণহানি হতে পারে। এ জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ হচ্ছিল।
আমাদের পরিকল্পনা ছিল, এক্সপ্লোসিভসহ ডেটোনেটর সব নিয়ে যাওয়া শেষ হলে একটা দিন ঠিক করা হবে চূড়ান্ত অপারেশনের জন্য। অপারেশনের দিন আমরা আউটার স্টেডিয়ামের কাছে অবস্থান নিয়ে গানফায়ার করব। ভেতরে অপারেশন হবে। এর মধ্যেই একদিন মাহবুব আলী আমাদের নয়াপল্টনের গোপন অবস্থান কেন্দ্রে এসে জানালেন, পাকিস্তান বাহিনী সম্ভবত অপারেশন পরিকল্পনার ব্যাপারে কিছু টের পেয়েছে। হঠাৎ তারা পুরো ভবনে সার্চ করছে। তখন অক্টোবর মাস। সম্ভবত ২৩ অক্টোবর হবে। আমি বললাম, আর দেরি করা যাবে না। আজই অপারেশন শেষ করতে হবে। ভেতরে যেমন অবস্থায় এক্সপ্লোসিভ রাখা আছে, তেমন অবস্থাতেই অপারেশন করতে হবে। মাহবুব আলীকে ডেটোনেটর দেওয়া হলো। আরও যা যা প্রয়োজন তা মোটামুটিভাবে দেওয়া হলো। তবে বারবার বলে দেওয়া হলো, খুব সাবধানে করতে হবে সবকিছু। ধরা পড়া যাবে না।
মাহবুব আলী অসীম সাহসের সঙ্গে আবার ফিরে গেলেন ডিআইটি ভবনে টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্রে। পাঁচতলায় একটা আলমারির ভেতরে কাগজের নিচে এর আগে প্রতিদিন নিয়ে যাওয়া এক্সপ্লোসিভ তিনি জড়ো করে রেখেছিলেন। সেই এক্সপ্লোসিভ নিয়ে ডেটোনেটর যুক্ত করে মাহবুব আলী খুব সফলভাবে পাকিস্তানিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এসেছিলেন। ভবনের বাইরে তিনি যখন এলেন তার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ।
ভবনের ভেতরে যেখানে মূল বিস্ফোরণটা ঘটেছিল, সেখানে সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। টাওয়ার অংশ একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। এখন যে ঘড়িটা দেখা যায়, রাজউক ভবনের সে ঘড়িটাও অচল হয়ে গেল। জানালার কাচ ভেঙে আশপাশে পড়ে গেল। ডিআইটির ফাইলগুলো উড়ে এসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল নিচে। ডিআইটি ভবনের পাশে আমেরিকান এমবাসির ইউএসএআইডি এবং সম্ভবত ব্রিটিশ হাইকমিশনের একটা শাখা অফিস ছিল। সে ভবনগুলোও বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল, জানালার কাচ ভাঙল। ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিকেল সাড়ে ৩টার খবরে বিবিসি সংবাদ প্রচার করল ঢাকা কেন্দ্রে গভর্নর হাউসের পাশের ভবনে মুক্তিবাহিনী হামলা চালিয়েছে। সংবাদ পর্যালোচনায় বলা হলো ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের ব্যাপক হামলার পর পাকিস্তানের অখণ্ডতা কোথায় থাকে? পাকিস্তান বাহিনীর যে দম্ভ তারা ঢাকা দখল করে রেখেছে, সেটাও চূর্ণ হয়ে গেল। ঢাকায় আসলে অন্যান্য অঞ্চলের মতো সম্মুখ সমর হয়নি।
ঢাকায় হয়েছে গেরিলা আক্রমণ। মে-জুন মাস থেকেই এ হামলা ধারাবাহিকভাবে হয়েছে। ক্র্যাক প্লাটুন নামে যারা পরিচিত ছিল সেই হাবিবুল আলম, মায়া, জিয়া, সামাদ ভাইয়েরা শেরাটনে হামলা চালিয়েছেন। আমাদের বন্ধু আজীজ (প্রয়াত আজীজ বীরপ্রতীক) তার গ্রুপ নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে মর্টার দিয়ে হামলা করেছিলেন। সাদেক হোসেন খোকা, রাজা, বাকী (শহীদ বাকী) তাদের মতো করে বিভিন্ন জায়গায় গ্রেনেড দিয়ে, এক্সপ্লোসিভ দিয়ে হামলা করেছে। আমাদের বায়তুল মোকাররম অপারেশনে মাত্র ১৭ বছর বয়সী আসাদ, যে আজকের অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ অসম্ভব সাহসের সঙ্গে ফাইট করেছে। কাকরাইলে পাকিস্তানিদের তেলের ট্যাঙ্কে হামলা করে পুরো সরবরাহ কেন্দ্র উড়িয়ে দিয়েছি আমরা। মূলত নভেম্বর পর্যন্তই ছিল গেরিলা অপারেশন।
ঢাকা পড়েছিল ২নং সেক্টরে। এ সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। এ সেক্টরকে আবার বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল। এসব অঞ্চলের জন্য আবার একজন করে অধিনায়ক ছিলেন। আমি ছিলাম ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনীতে। ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন মানিক। আমি ছিলাম সেকেন্ড-ইন কমান্ড। ১৪ নভেম্বর ভায়াডুবির ব্রিজের যুদ্ধে মানিক শহীদ হন। তিনি শহীদ হওয়ার পর সেকেন্ড-ইন কমান্ড হিসেবে আমি স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হই। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে ঢাকা অবরুদ্ধ করে ফেলেন। আমি ছিলাম সাভারে। ১২ ডিসেম্বর আমরা মিরপুর ব্রিজ পর্যন্ত এলাকা দখলে নিয়ে নিই। তখনও মিত্রবাহিনী এসে পেঁৗছায়নি। ১৩ ডিসেম্বর পাঞ্জাব ৩৩ রেজিমেন্টের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আমাদের কাছে পরাজিত হয়। প্রায় ২৪৮ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।
এ যুদ্ধের পর আমরা যখন আবার সবকিছু রি-অর্গানাইজ করছিলাম, তখন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর এক অফিসার আমার কাছে এলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি কি ঢাকা নর্থের কমান্ডার?’ আমি আমার পরিচয় দিলে অফিসার বললেন, জেনারেল নাগরা এসেছেন। তার সঙ্গে কিছু দূর যাওয়ার পর দেখলাম, জেনারেল নাগরা একটা গাড়ির ওপর বসে আছেন। তিনি আমার সঙ্গে পরিচিত হলেন। ঢাকার একটি ম্যাপ চাইলেন আর বললেন মিত্রবাহিনীর সবার জন্য খাবার ব্যবস্থা করতে। তখন সাভার ডেইরি ফার্মের ডাক্তার, ম্যানেজার এবং সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই মিলে সবার জন্য খাবারের আয়োজন করলেন। আমি সেদিন জেনারেল নাগরাকে বারবার বলছিলাম ঢাকায় ঢুকে পড়তে। জেনারেল নাগরা বললেন না, ঢোকা যাবে না। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, ঢুকতে গেলে অনেক বিপদ হতে পারে। তোমাদের অনেক লোক মারা যেতে পারে। তার চেয়েও বড় বিপদ হতে পারে, ঢাকার সাধারণ মানুষকে পাকিস্তানিরা মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি খুবই ভয়ঙ্কর হতে পারে। অতএব, আরেকটু ধৈর্য ধরো। একটা নেগোসিয়েশন চলছে সারেন্ডারের জন্য। পাকিস্তানি বাহিনী টুডে অর টুমরো সারেন্ডার করতে পারে। অনেক কষ্ট করেছো, এখন একটু ধৈর্য ধরো।
১৬ ডিসেম্বর নিয়াজি আত্মসমর্পণ করার পর আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম। বিজয়ের আনন্দ নিয়ে ঢাকায় আসার মুহূর্তেই একটা বড় শোকের ধাক্কা আমাদের হতবাক করে দিল। ঢাকায় আসার আগে আমরা বুদ্ধিজীবীদের হত্যার খবর জানতাম না। এ খবরটা পাওয়ার পর চারদিকে স্বজনহারা অসংখ্য পরিবারের আহাজারি, আর্তনাদ বিজয়ের সন্ধ্যার পরিবেশ ভারী করে তুলল অকল্পনীয় শোকগাথায়। এভাবে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসকদের কেউ হত্যা করতে পারে সেদিনের বধ্যভূমি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
পাকিস্তানি বাহিনীর মতোই তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীও যে ভয়ঙ্কর, বর্বর, জঘন্য ঘাতক, মানবতার চরম শত্রু সেটাই প্রমাণ করে এ হত্যাকাণ্ড। তবে প্রতিটি বিজয়ের পেছনে আত্মদান থাকে, প্রতিটি আনন্দের পেছনে শোক থাকে এটা আমাদের মানতেই হয়। এ ভেবেই চোখের সামনে যে প্রিয় সহযোদ্ধাদের শহীদ হতে দেখেছি, অসংখ্য মানুষ যারা অ্যাটাক-পাল্টা অ্যাটাকের সময় আমাদের রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছেন, আরও অসংখ্য মানুষ, মুক্তিযুদ্ধে যারা অকাতরে জীবন দিয়েছেন, সেই ত্রিশ লাখ স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে থাকি।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা মনে হলে সে সময় সাধারণ মানুষের ভালোবাসার দিনগুলোর কথাও মনে পড়ে যায়। সাভার থেকে নানা ছদ্মবেশে ঢাকায় আসতাম। রিকশাওয়ালারা, ঠেলাওয়ালারা আমাদের মিরপুর ব্রিজ পার করে দিত নিজেরা ঝুঁকি নিয়ে। মিরপুর ব্রিজ পার হয়ে আমরা আমাদের গোপন অবস্থানে চলে যেতাম। সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ সবাই আমাদের আশ্রয় দিত, বিপদে আড়াল করে রাখত। এমন অনেক দিন গেছে, আত্মগোপনের জন্য হোটেলবয়দের সঙ্গে তাদের রুমে ঘুমিয়েছি। যতভাবে সম্ভব তারা আমাদের সহায়তা করত। সেই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও সেই দিনগুলো হয়ে যেত অন্যরকম ভালোবাসার দিন।
ছবি: রণক্ষেত্রে অ্যামবুশে অবস্থানরত বীর নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপন
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/১৬-০৭-২০১৬ইং/ অর্থ