মুক্তিযোদ্ধা মফিজের গল্প : মেজর (অবঃ) কামরুল হাসান ভুঁইয়া
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ রিপোর্টঃ
৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় শত্রু পশ্চিম দিক থেকে আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের উপর আক্রমন করলো। আমরা সবাই মারা পড়তাম অথবা ধরা পড়তাম বা আহত হতাম। এ কেয়ামতসম অবস্থার ৯৫ ভাগ দায় আমার নিজের। ১১ প্লাটুন যোদ্ধা নিয়ে আমি যুদ্ধের সব নিয়ম কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক সারির একটি প্রতিরক্ষা অবস্থান (Linear Defense) নিয়েছি। আত্মহত্যার পরিকল্পিত প্রস্তুতি। শত্রু এক ব্যাটালিয়ান। (এ যুদ্ধ নিয়ে ময়না তদন্ত এখন নয়।)
পরদিন (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত কাটলো কোনো গোলাগুলি ছাড়া। কেননা শত্রু আমাদের অবস্থান নির্ণয় করতে পারেনি। চাঁদনি রাতটা কাটলো উভয়পক্ষের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির মাধ্যমে। মূল আক্রমণ আসলো আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানর পূর্ব দিক থেকে পরদিন সকাল ৯টায়। দিনের আলোতে এমন সময়ের আক্রমণ যুদ্ধের সমস্ত ব্যাকরণের অবমাননা। তাও খোলা আবাদি জমির উপর দিয়ে। পাকিস্তানি বুদ্ধি!
আমাদের ছেলেরা মনের সুখে পাকিস্তানিদের মারলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ঘন্টাখানিক পরে। ছেলেদের গুলি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অবস্থা ভয়াবহ। গুলি ছাড়া অস্ত্র লাঠিরও অধম। আমাদের গুলি আনতে হয় ভারত থেকে। অসম্ভব অবস্থা। পশ্চাদপসরণের আদেশ দিলাম। দিনের আলোতে যুদ্ধরত অবস্থায় পশ্চাদপসরণ করা আর শত্রু অস্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে দেয়া একই কথা।
যখন ইউনিয়ন কাউন্সিলের রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে পশ্চাদপসরণ তদারকি করছি তখন হন্তদন্ত হয়ে মফিজ এসে হাজির। মফিজ আমাদের ফুট-ফরমাশ খাটার মানুষ।আমাদেরই একজন।
‘স্যার, পইয়ারা আইয়া পড়ছে।’
এটা আমাকে মফিজের কাছ থেকে শুনতে হবে কেন। মফিজ মুক্তিযোদ্ধা না। খালি গা, পরনে লুঙ্গি। সে এসেছে আমাকে নিরাপদে পিছনে নিয়ে যাবার জন্য। আমি বললাম,’তুমি পিছনে যাও। এখানে এসেছো কোনো?’ মফিজ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। আমার মাথায় রক্ত উঠে আছে। সবগুলি প্লাটুনের সব ছেলে আসছে কিনা-অস্থির হয়ে আছি। মফিজ বললো,’স্যার, পাইয়ারা ঘেরাও দিয়ে লাইবো’।
অর্থাৎ সে আমাকে নিয়ে যাবেই। আর কথা বলার ধৈর্য ছিলো না। বাম হাতটা দিয়ে তার বাম কাঁধটা ধরে জোরে শরীরটা ঘুরিয়ে দিয়ে বললাম,’তুমি পিছনে যাও’। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম তার পিছনের দাপনার অনেকখানি মাংশ নাই। মাংশ ছিড়ে গিয়ে সাদা হয়ে আছে। শত্রুর আর্টিলারী বা মর্টারের গোলায় উড়ে গেছে। অঝোর ধরায় গড়িয়ে রক্ত পড়ছে।
‘মফিজ, কী হয়েছে?’
‘স্যার, কিছ্ছু অইছে না।’
আমার উত্তপ্ত মাথা ক’সেকেন্ডে শীতল হয়ে গেলো।
মনে মনে বললাম,’মফিজ, দেশ স্বাধীন হলেতো আমি বড় হবো কিন্তু তুমি কি জানো তুমি কোনোদিনই কিছু হবে না’।
যতোদিন বেঁচে ছিলো কিছুই হয়নি মফিজ। আসলে কিছুই হবার যোগ্যতা ছিলো না তার।
সূত্রঃ গেরিলা ৭১।
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০৭-১০-২০১৬ইং/ অর্থ