মূল সংবাদে যান
২৪ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার করুন

শহীদুল ইসলাম লালু : ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত দেশের সর্বকনিষ্ঠ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ১৭৯ বার পঠিত ৫ মিনিটের পাঠ

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ রিপোর্টঃ 

৬৭৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌর এলাকার শহীদুল ইসলাম লালু। তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে মহান স্বাধনীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব পেয়েছিলেন। মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং আমিনা বেগমের সন্তান তিনি।

তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট । গোপালপুরে পাক-হানাদার বাহিনী আসলে স্থানীয়রা প্রাণভয়ে এলাকা ছাড়া শুরু করলে কিশোর শহীদুল ইসলামও স্বজনদের সঙ্গে পালিয়ে বর্তমান ধনবাড়ী উপজেলার কেরামজানী নামক স্থানে আশ্রয় নেন। দুরন্ত লালুর সঙ্গে স্থানীয় বাজার ও স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। মুক্তিযোদ্ধা দলের কমান্ডার কাজী হুমায়ুন আশরাফ বাঙাল ও আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি কাছে টেনে নেন। তারপর থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফুট-ফরমায়েশের কাজে লেগে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের চা-পানি খাওয়ানোর পাশাপাশি মাঝে মধ্যে অস্ত্র পরিষ্কারের কাজও করতেন। এভাবেই অস্ত্র ধরা শেখেন কিশোর শহীদুল। সপ্তাহ খানেক পর মুক্তিযোদ্ধা দলের সঙ্গে ট্রেনিং করার জন্য ভারত চলে যান। ভারতে গিয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করে অস্ত্র হিসেবে স্টেনগান ও গ্রেনেড পান।

lalu-3

ট্রেনিংয়ের সময় ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণকালে ভারতীয় বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সমজিত সিং শহীদুল ইসলামেকে আদর করে লালু ডাকতেন । সেই থেকে শহিদুল ইসলামের নাম হয়ে যায় শহিদুল ইসলাম লালু। যুদ্ধের পরবর্তীতে তিনি লালু নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে ছিলেন। এই লালু ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় হুইসেল বাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে জাতীয় সংগীত গেয়ে পতাকা উঠাতেন ও নামাতেন।

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যখন টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কাদেরিয়া বাহিনীর সকল যোদ্ধা অস্ত্র জমা দিচ্ছিল, তখন শহীদুল ইসলাম লালুও তার ব্যবহ্নত স্টেনগানটি বঙ্গবন্ধুরহাতে তুলে দিচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে শহীদুল ইসলাম লালুর পিঠ থাপ্পড়ে বলেছিলেন ‘সাব্বাস বাংলার দামাল ছেলে।’ তারপর যখন সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে লালুর বাংকার ধ্বংসের কাহিনী শুনলেন তখন বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে ‘বীর বিচ্ছু’ আখ্যা দেন। তারপর বঙ্গবন্ধু তাকে মঞ্চে শেখ রাসেলের পাশে নিয়ে বসান।

কিছুদিন পর আরও অনেকের মত বিস্মৃত হন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম লালু, যদিও ৭৩ সালের গেজেটে তাঁকে বীরপ্রতীক উপাধি দেয়া হয় কিন্তু জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তিনি তাঁর বীরপ্রতীক খেতাবের কথা ১৯৯৬ সালে জানতে পারেন। তারপরও মানবেতর জীবনযাপন করে চার সন্তানের জনক বঙ্গবন্ধুর বীর বিচ্ছু ও দেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক শহীদুল ইসলাম লালু ২০০৯ সালের ২৫ মে ঢাকাস্থ মিরপুরের ভাড়াবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এ বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ মিরপুরেই সমাহিত করা হয়।

কি করেছিলেন লালু?

অপারেশন গোপালপুর থানা নামে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ঘটনাটি একান্তই শহীদুল ইসলাম লালুময়। যুদ্ধের উত্তুঙ্গ দিনগুলোতে গ্রুপ কমান্ডার পাহাড়ি তাকে নির্দেশ দেন গোপালপুর থানার হালহকিকত জেনে আসতে, মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে তা দখল করতে পারে। লালু গিয়ে সেখানে তার এক দূর সম্পর্কের তুতো ভাই সিরাজের দেখা পান। সিরাজ পাকিস্তানী সেনাদের দালালী করে, তাকেও একই কাজ করার প্রস্তাব দেয়। লালু রাজী হয়ে যান।

lalu-2

পরের দফা তিনটি গ্রেনেড নিয়ে থানায় হাজিরা দেন তিনি। অল্প বয়স বলে তাকে চেক করা হয় না। মুক্তিযোদ্ধাদের আগেই জানান দিয়ে রেখেছিলেন তার অভিপ্রায়। পুরো পুলিশ স্টেশন একবার চক্কর মেরে এসে, এক বাংকারে প্রথম গ্রেনেড চার্জ করলেন লালু। ভীত ও হতভম্ব পাকিস্তানীরা আন্দাজে গুলি ছুড়তে শুরু করে লক্ষ্যহীনভাবে। শুয়ে লালু দ্বিতীয় গ্রেনেডটি ছোড়েন, কিন্তু এটা ফাটে না। এখান থেকে আর বেরুনো হবে না- এই ভয় পেয়ে বসে তাকে। তারপরও তৃতীয় গ্রেনেডটি সশব্দে ফাটে আরেকটি বাংকারে। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারাও এগিয়ে এসেছেন। গোলাগুলির এই পর্যায়ে সিরাজ এসে লালুকে একটি অস্ত্র ধরিয়ে দেয়, জিজ্ঞেস করে চালাতে পারে কিনা। লালু তাকে পয়েন্ট ব্ল্যান্ক রেঞ্জে গুলি করেন। এই ঘটনায় কিছু পাকিস্তানী পালায়, কিছু ধরা পড়ে, মারা যায় অনেক। হতাহতের মধ্যে দিয়েও মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেন গোপালপুর থানা। বলতে গেলে শহীদুল ইসলাম লালুর একক কৃতিত্বে।

শহিদুল ইসলাম লালু আজ আমাদের মাঝে নেই, ২০০৯ সালের ২৫ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বারান্দায় ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছেন। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা এই অকুতোভয় মানুষটির আত্মার চির শান্তি দেন।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ, বাঙলার স্বাধীনতার সুফলভোগী প্রত্যেকে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/১৯-১০-২০১৬ইং/ অর্থ