এক গ্রামেই অর্ধশতাধিক খুন, তবু থামেনি টেঁটাযুদ্ধ
মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ রিপোর্ট,
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের এক জনপদের নাম নিলক্ষা। চরাঞ্চল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে অনেকটা এগিয়ে গেছে এই জনপদ। কারণ এই জনপদে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ।
শিক্ষাক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই নিলক্ষার বাসিন্দারা। গ্রামের অনেকেই নরসিংদী জেলা শহরসহ রাজধানী ঢাকায় পড়াশোনা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বংশানুক্রমিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিহিংসার মরণ নেশা টেঁটাযুদ্ধে অন্ধ ওই গ্রামটির অনেকেই। সরেজমিনে জানা গেছে, রক্তপাত, পঙ্গুত্ববরণ এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত এই গ্রামবাসীদের ধারাবাহিক সংঘর্ষ থেকে বিরত রাখতে পারছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শুধু রায়পুরা উপজেলার নিলক্ষা ইউনিয়নেই টেঁটাযুদ্ধে মারা গেছে অর্ধশত লোক। এসব ঘটনায় কিছু ক্ষেত্রে মামলা হলেও যার কোনো বিচার আদৌ হয়নি। কারণ আদালতের পরিবর্তে স্থানীয় সমাজপতিরা অর্থদণ্ড করেই আপস মীমাংসা করেছেন এসব হত্যার।
সর্বশেষ গত ১৪ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে নিলক্ষা ইউনিয়নের সাবেক ও বর্তমান ইউপি দুই চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে মারা গেছেন চারজন। এ ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা নিলক্ষা ইউনিয়নবাসী। কিন্তু ১০ দিন পার হলেও চার খুনের ঘটনায় কেউ থানায় মামলা করতে সাহস করেনি।
টেঁটাযুদ্ধের নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে কেবল দুটি শব্দ- আধিপত্য বিস্তার। নিলক্ষায় রাজনৈতিক, সামাজিক বা পারিবারিক সব বিরোধের শেষ জবাব হয় টেঁটায়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, নিলক্ষা ইউনিয়নের সাতটি গ্রামের ছয় হাজারেরও বেশি মানুষ প্রবাসে থাকেন। যার ফলে এককালের দরিদ্র এই জনপদের বাসিন্দার এখন অর্থনৈতিকভাবে বেশ সাবলম্বী।
আর প্রবাসীদের রক্ত-পানি করে পাঠানো এই অর্থের জোগান নিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে টেঁটাযুদ্ধের মরণ নেশায় লিপ্ত হচ্ছেন তাঁরা। জয়ী হতে আশপাশের চরাঞ্চলের গ্রামগুলো থেকে ভাড়ায় যোদ্ধা ও লাঠিয়াল এনে বিভিন্ন মারণাস্ত্র নিয়ে সম্মুখযুদ্ধে জড়াচ্ছেন।
কবে থেকে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বংশানুক্রমে এই যুদ্ধ চলছে তার সদুত্তর কিন্তু দিতে পারেননি কেউ।
সরেজমিন গিয়ে নিলক্ষা ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নরসিংদী জেলা সদর থেকে নিলক্ষা ইউনিয়নের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এলাকার অনেক মানুষ।
কিন্তু তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে টেঁটা নিয়ে রক্তক্ষয়ী মরণযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে এখানকার মানুষগুলো। আধিপত্য বিস্তার আর প্রতিহিংসার কারণে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই টেঁটাযুদ্ধ যেন এখন এলাকাবাসীর অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। এসব যুদ্ধে যেমন প্রাণ গেছে অনেকের, তেমনি অন্ধকার নেমে এসেছে অসংখ্য মানুষের জীবনে। দিনের পর দিন এসব যুদ্ধে হতাহতের ঘটনায় মামলা হলেও বিচার না হওয়ায় এবং স্থানীয় দাঙ্গাবাজদের কারণে যুগ যুগ ধরে অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে নিলক্ষা ইউনিয়নজুড়ে।
সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনের পরের টেঁটাযুদ্ধে চারজন নিহত হওয়ার পর এলাকাটিতে গত শক্রবার থেকে ১৪৪ ধারা জারি আছে। আর এ ধারাটি জারি থাকায় ধস নেমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক জীবনেও।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা জানান, নিলক্ষা ইউনিয়নের প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অনেকটা অনর্থে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থের ও ক্ষমতার দাপটে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার দাপটের হানাহানিতে প্রতিবছর ধ্বংস হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। দিনের পর দিন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে প্রাণহানি, পঙ্গুত্ববরণ ও অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে অনেকেই।
এদিকে একটি সহিংসতার ঘটনা জন্ম দিচ্ছে আরেকটি সহিংসতার। একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আরো কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এ ছাড়া চলমান মামলা ও বিরোধ নিয়ে নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতার। আর এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন সমাজপতির মুখোশধারী একটি শ্রেণি। বিবদমান দলের মধ্যে সমঝোতার নামে তাঁরা চালান ঘুষবাণিজ্য। যে কারণে অবসান হওয়ার পরিবর্তে যুগযুগ ধরে মাছ শিকারে ব্যবহৃত টেঁটার ব্যবহার হচ্ছে মানুষ নিধনের হাতিয়ার হিসেবে।
নিলক্ষা ইউনিয়নের সাতটি গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই সংরক্ষিত আছে ১০ থেকে ৫০টি করে টেঁটা। তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই টেঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রতিপক্ষের ওপর। আক্রমণে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। মৃত্যু, রক্তপাত, পঙ্গুত্ববরণ কোনো কিছুতেই থামে না এ যুদ্ধ। প্রতিপক্ষকে হারাতে ঝগড়ার জন্য আশপাশের চরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলো থেকে ভাড়াটিয়া হিসেবে নেওয়া হয় লোকজন ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নিলক্ষা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকার। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অপর প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম। এলাকার দাঙ্গাবাজ হিসেবে পরিচিত ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লোকজন বিভক্ত হয়ে নির্বাচন করেন দুই প্রার্থীর পক্ষে। তাজুল ইসলাম নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নতুন মুখ হলেও আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন ও প্রভাব বিস্তারের কারণে জিতে যান নির্বাচনে। পরাজিত হন একাধিকবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকার।
নির্বাচনের প্রচারণাকালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। নির্বাচন শেষে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। দুই প্রার্থীর পক্ষে থাকা দাঙ্গাবাজদের নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার দায়ভার কাঁধে তুলে নিতে হয় দুই চেয়ারম্যানকে। বিবাদ ছড়িয়ে পড়ে দুই গ্রুপে। নিজেদের স্বার্থ আদায় আর অস্তিত্ব রক্ষায় নেতৃত্বে থাকা দুই চেয়ারম্যানের অর্থ সরবরাহ নিয়ে চলে পক্ষে-বিপক্ষে সংঘর্ষ, লুটপাট, হত্যা, পাল্টা হামলা, মামলা।
এলাকার ঐতিহ্য রক্ষায় অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নারী-পুরুষ উভয়েই জড়িয়ে পড়েন এই টেঁটাযুদ্ধে। দাঙ্গাবাজদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাঁরা এলাকায় এই যুদ্ধে শামিল হননি, তাঁদের ওপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ। বাধ্য হয়ে অনেককেই যোগ দিতে হয় এই টেঁটাযুদ্ধে।
জনপ্রতিনিধি যুদ্ধ থামানোর পরিবর্তে উল্টো যুদ্ধের ইন্ধন জোগান। এ ছাড়া রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধেও বাণিজ্যের অভিযোগ। মামলা দিয়ে অর্থনৈতিক ফায়দা লুটতে যুগ যুগ ধরে পুলিশও আন্তরিকভাবে চান না এই যুদ্ধ থামুক। তাই জিইয়ে রাখতে পুলিশি ভূমিকাও অনেকটা দায়ী বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নিলক্ষা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের মোবাইল বন্ধ থাকায় আর সম্ভব হয়নি।
সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিত আমিরাবাদ গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এখানকার এক শ্রেণির গ্রাম্য অশিক্ষিত মাতুব্বর ও জনপ্রতিনিধিরাই এসব সংঘর্ষের জন্য অনেকটা দায়ী। তাঁরা নিজেদের স্বার্থে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঝগড়া লাগিয়ে রাখেন। মূলত স্থানীয় মাতুব্বর ও জনপ্রতিনিধিদের হাতেই রয়েছে এখানকার টেঁটাযুদ্ধের চাবিকাঠি। চরাঞ্চলের টেঁটাযুদ্ধ সামাজিকভাবে প্রতিরোধ ছাড়া শুধু পুলিশ দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম বলেন, অনেকটা শিক্ষার অভাবের কারণে এই এলাকার সাধারণ মানুষ প্রভাবশালীদের বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। প্রভাবশালীরা বংশপরম্পরায় এমনভাবে তাঁদের ব্রেনওয়াশ করে রাখেন, যাতে করে সাধারণ মানুষ তাদের কথার বাইরে না যায়। এসব প্রভাবশালী মূল হোতারা নেপথ্যে থেকে সুতা টানেন আর মানুষগুলো না বুঝে পুতুলনাচের মতো সংঘর্ষে জড়ায়। আমরা তাদের মোটিভেটেড করার চেষ্টা করছি।’
আর বাণিজ্যের স্বার্থে সংঘর্ষের হামলা মামলা জিইয়ে রাখে এটা ঠিক না। বর্তমান সময়টাতে পুলিশ এসব বিষয়ে ছাড় দিচ্ছে না। তবে অতীতের একটা সময় হয়তো চরাঞ্চলের কিছু দালাল মামলাবাজের সঙ্গে কতিপয় পুলিশের সখ্য ছিল। যেমনটা সারা দেশের চরাঞ্চলেই কমবেশি থাকে, এখন আর তেমনটা নেই।