মৃত্যুর আগে খুনিদের যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু

আবদুর রহমান শেখ রমা। রমা নামেই যাকে সবাই চেনে। ১৫ই আগস্ট ভয়াল কাল রাতের প্রত্যক্ষদর্শী। খুব কাছে থেকে তিনি দেখেছেন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ঘাতকের বুলেটে চোখের সামনেই একে একে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর অনেক দিন পালিয়ে বেড়িয়েছেন ভয়ে। এখনও থাকেন অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর মনে জমে থাকা ক্ষোভ আর কষ্টের ভার কিছুটা লাঘব হলেও সেদিনের বীভৎসতার দৃশ্য মনে হলে এখনও স্থির থাকতে পারেন না তিনি। ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন রমা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ঘুরে ঘুরে বর্ণনা দিয়েছেন সেদিনকার নৃশংসতার। বিশ্বস্ত হিসেবে রমা কাজ করতেন ওই বাড়িতে।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে যা দেখেছি তাতে মনে হয়েছে, গজব নেমে এসেছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের এই বাড়িটিতে। মুহূর্তে যেন নরকের দরজা খুলে গেছে। একে একে হত্যা করা হচ্ছে স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শিশুপুত্র শেখ রাসেলসহ অন্যদের।
৬৯-এ বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বাসায় কাজের ছেলে হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন রমা।
বঙ্গবন্ধু তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হয়ে কারাগারে। এরপর থেকেই পরিবারটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। আছে নানা স্মৃতি। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। জানালেন, বেগম মুজিব তাকে আদর করতেন খুব। ছিলেন বাড়ির সকলের আদরের ছোট্ট শেখ রাসেলের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। তার সঙ্গে খেলেছেন ফুটবল ক্রিকেট, চালিয়েছেন সাইকেল। তবে, সেসব স্মৃতি মনে করলেই চোখ ভিজে আসে রমার। গলায় কান্নার দলা পাকিয়ে আসে।
তিনি বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সবছে নৃশংস দৃশ্যগুলো আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এতটাই নৃশংস ছিল যে, এখন এই বয়সে যদি এই দৃশ্যগুলো দেখতাম তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমার মৃত্যু হতো। এমন নির্মম দৃশ্য দেখার পর থেকে আমি রাতের পর রাত ঘুমুতে পারিনি। কেবলই গুলির শব্দ, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খুনিদের শেষ কথাগুলো, বেগম মুজিবের আর্তনাদ, ছোট্ট শেখ রাসেলের বাঁচার আকুতি আমার কানে বাজতো। আর আমার নিজের নিরাপত্তাহীনতাতো ছিলই। কিন্তু দুঃখের বিষয় অনেক দিন এনিয়ে আমি মুখ খুলতে পারিনি। উপরন্তু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছি। নিজের পরিচয়ও গোপন রেখেছি কখনও। এমন একটি সময় ছিল যখন এ নিয়ে কোন কথাই বলা যেত না। অবশেষে দীর্ঘ দিন পর আদালতে আমি জবাবন্দি দিই। কয়েকজন খুনির ফাঁসি হয়। মনে হয়েছিল বুক থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেছে।
পঁচাত্তরের ১৪ই আগস্ট রাতের একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ করেন আবদুর রহমান শেখ রমা। তিনি বলেন, প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর গাড়িটি তাকে নিয়েই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে নেমেই বঙ্গবন্ধু চলে যান দোতলায় নিজ কক্ষে। কিন্তু ওই দিন (১৪ই আগস্ট) রাত ৯টার দিকে ৩২ নম্বরের বাসার গেটের কাছেই গাড়ির ইঞ্জিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। চালকের (নাম মনে নেই) অনেক চেষ্টার পরেও গাড়ির ইঞ্জিন চালু করা যাচ্ছিল না। বঙ্গবন্ধু কিছুটা বিরক্ত হয়ে গাড়িটি ভেতরে নেয়ার কথা বলে বাসার ভেতরে চলে যান।
রমা বলেন, পরদিন ভোরের মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার অশুভ ইঙ্গিত যেন এই ছোট্ট ঘটনাটুকু। তিনি বলেন, ১৪ই আগস্ট রাত ১১টার দিকে দোতলায় বঙ্গবন্ধুর কক্ষের সামনের পাসেজ রুমে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ বেগম মুজিব ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে চিৎকার করছেন, সেরনিয়াবাতের (আবদুর রব সেরনিয়াবাত) বাসায় আর্মিরা আক্রমণ করেছে, কে কোথায় আছ বের হও, তাকে বাঁচাও।
এর কয়েক সেকেন্ড পরেই বাসার কাছেই গুলির শব্দ শুনতে পাই। বাসার সামনের লেকের পাড়ের সামনে গিয়ে দেখি একদল সৈন্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাসার সামনের দিকে আসছে। পেছনের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে দেখি বেগম মুজিব দোতলায় ছোটাছুটি করছেন। বঙ্গবন্ধু নিচে রিসিপশন কক্ষে টেলিফোনে কথা বলার চেষ্টা করছেন। এরপর তিনতলায় গিয়ে কামাল ভাইকে (শেখ কামাল) ডেকে তুলি। কামাল ভাই প্যান্ট শার্ট পরে নিচতলার দিকে যেতে থাকেন। তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে নিয়ে আসি দোতলায় বঙ্গবন্ধুর কক্ষে। দোতলায় জামাল ভাই (শেখ জামাল) ও তার স্ত্রী রোজী জামালও সেই কক্ষে আসেন। একপর্যায়ে নিচতলায় গুলির শব্দ ও কামাল ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনি।
রমা বলেন, কিছুক্ষণ পরেই বঙ্গবন্ধু দোতলায় তার ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য গুলাগুলি থেমে গেলে তিনি আবারও বাইরে বেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ান। এসময় একদল সৈন্য তাকে ঘিরে ধরে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। বঙ্গবন্ধু তখন চিৎকার করে বলতে থাকেন, তোরা কারা? কি চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে? সৈন্য দল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটু এগোনোর চেষ্টা করে। বঙ্গবন্ধু সিঁড়ির দুই তিনটি ধাপ হাঁটতেই সিঁড়ির নিচের দিক থেকে সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু।
স্মৃৃতি হাতড়ে রমা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কয়েক সেকেন্ড পরে খুনিদের পিছনে দাঁড়ানো আমাকে একজন সৈন্য প্রশ্ন করে আমার পরিচয় কি? আমি এখানে কি করি? আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলি, আমি এই বাড়ির কজের ছেলে। তারা আমাকে সেখান থেকে সরে যেতে বললে আমি আবারও বঙ্গবন্ধুর কক্ষে চলে যাই। সেখানে আগে থেকেই বেগম মুজিব, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, শেখ রাসেল ও বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের ছিলেন।
বেগম মুজিবকে বলি বঙ্গবন্ধুকে সিঁড়িতে গুলি করা হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই সৈন্যরা দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। বেগম মুজিব তখন চিৎকার করে বলতে থাকেন ‘মরতে হয় সবাই একসঙ্গে মরবো’। দরজা খুলে বাইরে এসে সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেন বেগম মুজিব। তার আর বুঝতে বাকি রইল না পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে যাচ্ছে। তিনি খুনিদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে থাকেন, আমি কোথাও যাব না। আমাকে এখানেই মেরে ফেল।
আবদুর রহমান শেখ রমা বলেন, একপর্যায়ে সৈন্যরা আমাকে শেখ আবু নাসের ও শেখ রাসেলকে নিচে নিয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোতলায় মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ ও নারী কণ্ঠের আর্তচিৎকার শুনতে পাই। বুঝতে বাকি ছিল না যে, বেগম মুজিবসহ অন্যদের হত্যা করা হয়েছে। ছোট্ট শিশু রাসেলের হত্যার বর্ণনা দিয়ে শিউরে ওঠেন রমা।
তিনি বলেন, শেখ রাসেলসহ সৈন্যরা আমাদেরকে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে। নিচতলায় গাড়ি বারান্দার সামনে আমগাছতলায় দাঁড় করিয়ে রাখে আমাদের। শেখ আবু নাসেরকে তখন নিচতলায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শেখ রাসেল তখন কান্না জুড়ে দেয়, আর বলতে থাকে ‘আমি মার কাছে যাবো, আমাকে মার কাছে নিয়ে যাও’। কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা মুহিত ভাইকে (আ ফ ম মুহিতুল, বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন আবাসিক ব্যক্তিগত সহকারী) করুণ গলায় বলতে থাকে, আমাকে মারবে না তো, আমাকে মারবে না তো’।
মুহিত ভাই তাকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, যেহেতু সে বয়সে ছোট তাই খুনিরা হয়তো তাকে রেহাই দিতে পারে। তখন আমাদেরও বিশ্বাস ছিল যে, ছোট বলে খুনিরা হয়তো রাসেলকে হত্যা করবে না। কিন্তু ওরা ছিল সাক্ষাৎ আজরাইল। সৈন্যদের একজন তখন রাসেলকে বললো ‘চল তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাই’। এই বলে রাসেলকে নিয়ে ওপরে ওঠার একটু পরেই গুলির আওয়াজ পাই। বুঝতে পারি ছোট্ট রাসেলকেও খুনিরা রেহাই দেয়নি। এর একটু পরেই বাসার সামনে একটি ট্যাংক এসে থামে। সেখান থেকে কয়েকজন অফিসার বঙ্গবন্ধুর বাসার ভেতরে তার পরিবারের কেউ জীবিত আছে কিনা জানতে চায়। জবাবে ভেতর থেকে বলা হয় ‘অল আর ফিনিশ্ড’।
রমা বলেন, ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকলকে শুধু খুন করেই ক্ষান্ত হয়নি। সবকিছু শেষ করে চালায় লুটপাট। খুনের নেশায় আসা ঘাতকদের তখন যেন লুটের নেশায় পেয়ে বসেছে। যে যেভাবে পেরেছে ঘরে থাকা সোনা, রুপা, বিভিন্ন সময়ে পাওয়া বঙ্গবন্ধুর উপহার সামগ্রীসহ নানা জিনিস লুট করে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনে। এছাড়া তছনছ করেছে বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষের বিছানা ও আসবাবসহ অন্য কক্ষগুলো।
তিনি বলেন, ধ্বংস যজ্ঞ শেষে দুপুর ১২টায় আমাদের চলে যেতে বলা হয়। আমি তখন মগবাজারে আমাদের এক সহকর্মীর বাসায় চলে যাই। সেখানে তিনদিন থেকে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যাই। সেখানে গিয়ে শুনতে পাই ঘটনার পর বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়ায় আনা হয়। তাকে গোসল করিয়ে কাফন পরিয়ে টুঙ্গিপাড়াতেই দাফন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের পলাতক খুনিদের ফাঁসি জীবদ্দশায় দেখতে চান জানিয়ে রমা বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের অনেকেই এখনও জীবিত। তারা সদম্ভে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে মরেও আমি শান্তি পাব না।