হাবিপ্রবি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ এর হোলি উৎসব
অর্জুন রাায়, দিনাজপুর প্রতিনিধি ।। সম্পুর্ন ধর্মীয় গাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে সম্পন্ন হল, হাবিপ্রবি সনাতনীদের হোলি উৎসব। অনুষ্ঠানের উদ্ভোধন করেন অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম। যিনি একজন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ব্যাক্তিত্ব। সকলকে সকল অশুভ থেকে সরে এসে শুভ, সত্য সুন্দরের পথে পথ চলতে আহ্বান জানান মাননীয় উপাচার্য।মানবতাই আমাদের ধর্ম।
হোলি নিয়ে কিছু কথা সারা ভারতবর্ষের সাথে একই সাথে নেপাল,বাংলাদেশ,মরিশাস, গায়ানা, সুরিনাম,ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, আমেরিকা, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, গ্রেট ব্রিটেন সহ পৃথিবীর অনেক দেশেই যেখানে হিন্দু সংখ্যাধিক্য সেখানেই দশেরা, দেওয়ালী এবং হোলি এ প্রধান তিনটি উৎসব পালিত হয় রঙিন বর্ণাঢ্যভাবে। হিন্দুর প্রধান এ তিনটি উৎসবের মধ্যে রূপে-রসে-গন্ধে হোলি অনন্য। ‘হোলি’ নামটি সাধারণত উত্তরভারতেই প্রচলিত। সেখানে হোলির আরেক নাম ‘ফাগোয়া’। এ ফাগোয়া বা হোলিকেই আমরা বাঙালীরা দোলযাত্রা নামে পালন করি। এ ছাড়া সারা ভারতবর্ষে বিভিন্ন নামেই এ উৎসব পালিত হয় যেমন : ওড়িশায় দোলোৎসব, মধ্যভারতে হরি (হোলি), গোয়ায় শিমাগা, দক্ষিণভারতে মদন-দহন বা কামায়ণ ইত্যাদি। “দোল্যতে অস্মিন কৃষ্ণনেতি দোলি” অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণকে দোলারোহণ করে দোল দেয়া হয়, তাই এই উৎসবের নাম দোলযাত্রা। ফাল্গুনী পূর্ণিমাতিথিতে এ উৎসব আয়োজিত হয়। যে দিন অরুণোদয় কালে পূর্ণিমাতিথি লাভ হবে, সে পবিত্র দিনেই দোলযাত্রা হবে। এ দোলযাত্রা সম্পর্কে পদ্মপুরাণের পাতাল খণ্ডে বলা আছে তা খুবই তাৎপর্যবাহী – ” কলিযুগে এই দোলোৎসব সকল উৎসবের মধ্যে অন্যতম প্রধান। যথাবিধি ভক্তিপূর্বক সাদা, লাল, গেরুয়া, হলুদ এই চারপ্রকারের ফল্গুচূর্ণ (আবির) দ্বারা এবং নানাবিধ সুগন্ধ দ্রব্য তাতে মিশ্রিত করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণেকে সন্তুষ্ট করবে। এ দোলোৎসব পাঁচদিন বা তিনদিনব্যাপী করবে। দক্ষিণাভিমুখে কৃষ্ণকে দোলযানে স্থাপন করবে। যারা এই দোলস্থ কৃষ্ণকে দর্শন করে, তারা নিঃসংশয়ে সকল প্রকার পাপ হতে মুক্তিলাভ করে। ” শুধুমাত্র পদ্মপুরাণ, গরুড়পুরাণ, নারদীয় পুরাণই নয় স্কন্ধপুরাণের উৎকলখণ্ডের ৪২ অধ্যায়ে বিস্তারিত দোলযাত্রা বিবরণ দেয়া আছে – “দোলোৎসবে গোবিন্দের পূজা করতে হয়। যারা দোলারূহ পূজা অবস্থায় গোবিন্দের দর্শন করে, তারা মুক্তি লাভ করে। এ সময়ে গোবিন্দকে তিনবার দোল প্রদানে পাপ নাশ হয় এবং তিনবার দোলোৎসব দর্শনে আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক এই ত্রিতাপ হতে জীব মুক্ত হয়। যে রাজা এ দোলোৎসব আয়োজন করেন, তিনি রাজচক্রবর্তী হন। আর অন্যরা বেদবিদ হয়ে মুক্তিলাভ করেন।” স্কন্দপুরাণ গ্রন্থের ফাল্গুনমাহাত্ম্য গ্রন্থাংশে হোলিকা ও প্রহ্লাদের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। হোলিকা ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপুর ভগিনী। ব্রহ্মার বরে হিরণ্যকশিপু দেব ও মানব বিজয়ী হয়ে দেবতাদের অবজ্ঞা করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। প্রহ্লাদ বিষ্ণুকে নিজ পিতার উপরে স্থান দেওয়ায় ক্রুদ্ধ হয়ে হিরণ্যকশিপু নিজের পুত্রকে পুড়িয়ে মারার আদেশ দেন। দাদার আজ্ঞায় হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করেন। কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অক্ষত থাকেন; বরং আগুনে পুড়ে হোলিকারই মৃত্যু হয়। হোলিকার এই অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কাহিনিই স্মরণেই সকল অমঙ্গলের প্রতীক হোলিকার পুতুলে দোলের পূর্বদিনে আগুন জ্বালিয়ে অনুষ্ঠিত হয় হোলিকাদহন, ঢুণ্ঢারদাহ বা চাঁচর উৎসব। মহারাষ্ট্রে এ সময় আগুনের চারিদিকে তিনবার প্রদক্ষিণ করতে করতে হোলিকাসুরের উদ্দেশ্যে অনেক অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে হোলিকাসুর সহ সকল অসুরদের অনুরোধ করা হয়, মানুষের ক্ষতি না করতে। বসন্তকাল ঋতুরাজ, আর সেই ঋতুরাজের পূর্ণিমাতিথি সৌন্দর্যময়তায় অনন্য ; এর তুলনা হয় না। তাই এই বসন্তপূর্ণিমাতে প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে যুবক-যুবতীর চির আকাঙ্ক্ষিত কামদেব মদনের উপাসনা। অসংখ্য সংস্কৃত গ্রন্থে বিবরণ পাওয়া যায়। সপ্তম শতাব্দীর প্রখ্যাত কবি স্থাণীশ্বরের রাজা মহারাজ হর্ষবর্ধনের বিখ্যাত নাটকত্রয়ীর অন্যতম রত্নাবলীতে সেই সময়ের বসন্ত উৎসবের একটা প্রামাণ্য দলিল বলা চলে। এই বসন্তোৎসবই আজকের দিনে হোলি উৎসবে রূপান্তরিত।

দোলযাত্রা বা হোলি আধ্যাত্মিক,সামা জিক, সাংস্কৃতিক সকল কারণ ছাপিয়ে বাঙালী জীবনে তৈরি করেছে এক অনন্য স্থান ; কারণ এই দিনেই জন্ম নিয়েছেন বাঙালীর প্রাণপুরুষ শ্রীচৈতন্যদেব। শ্রীচৈতন্যদেবের সাথে সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে এবং স্মৃতিতেও দোলযাত্রা এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই এ দোলকে ধর্মের আবরণ থেকে মুক্ত করে এক সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর স্মৃতিবাহী শান্তিনিকেতনে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বজনীন দোল পূর্ণিমা উৎসবের প্রবর্তন করেন। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ শান্তিনিকেতনের এ উৎসবে যোগদান করেন। শান্তিনিকেতনের গৌড় প্রাঙ্গণে বৈতালিকের মাধ্যমে শুরু হয় এ উৎসবের। অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ বিশিষ্টজনেরা। বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে হাতে বিভিন্ন রংয়ের আবির নিয়ে বসন্ত উৎসবে মেতে ওঠেন ছাত্র-শিক্ষক সহ সবাই । দিনভর চলে নৃত্য -গীত আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই উৎসবে দেশ-বিদেশের অসংখ্য শিল্পীরা অংশ গ্রহণ করে নৃত্য -গীতে মুখরিত করে তোলে বিশ্বভারতীর গৌর প্রাঙ্গণ এবং গেয়ে চলে রবীন্দ্রনাথের দোলযাত্রার বা বসন্তের গান – ওরে গৃহবাসী খোল্, দ্বার খোল্, লাগল যে দোল। স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল। দ্বার খোল্, দ্বার খোল্॥ রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে, রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে, নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল। দ্বার খোল্, দ্বার খোল্॥ বেণুবন মর্মরে দখিন বাতাসে, প্রজাপতি দোলে ঘাসে ঘাসে। মউমাছি ফিরে যাচি ফুলের দখিনা, পাখায় বাজায় তার ভিখারির বীণা, মাধবীবিতানে বায়ু গন্ধে বিভোল। দ্বার খোল্, দ্বার খোল্॥ মথুরা-বৃন্দাবনের হলিও অনন্য। এর সাথে শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান নবদ্বীপেও অতুলনীয় হলি উৎসবের আয়োজন করা হয়। নদীয়া জেলার নবদ্বীপের অনন্য অসাধারণ এ দোলোৎসবে অংশ নেয় বিশ্বের প্রায় ৬০টির অধিক দেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে থেকে লক্ষ-লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষ। সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণে নবদ্বীপ হয়ে ওঠে এক অক্ষয় আনন্দঘন ধামে। সবাইকে জানাই দোলপূর্ণিমা, হোলি এবং শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মজয়ন্তীর শুভেচ্ছা!

