গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করছে সরকারের আশ্রয়ন প্রকল্প
আহমেদ আবু সাইম, কমিউনিটি মিডিয়া ফেলো ।। দেশে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ৬০ হাজার গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের সব গৃহহীন পরিবারের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের অধিনে গৃহহীন প্রত্যেক পরিবারকে একটি করে ঘর করে দেয়া হয়েছে। ২১ হাজার ৭৪৫টি পরিবারকে ৩২ কোটি ৫২ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। ঋণের টাকায় এসব পরিবার আয়বর্ধক নানা কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজেরা স্বাবলম্বী ও দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের কেবল একটি করে ঘর করে দেয়া হয়নি, পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের চাহিদামতো কর্মমূখী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে পরিবার প্রতি ৩০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণও দেয়া হয়। এই ঋণ নিয়ে তারা আয়বর্ধক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো- ভূমিহীন, গৃহহীন ও ছিন্নমূল অসহায় মানুষের আবাসন সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নপ্রসূত এ প্রকল্প সারাদেশের গৃহহীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনসহ দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে কক্সবাজার জেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হওয়ায় বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। সে সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব গৃহহীন পরিবারকে তাৎক্ষণিক পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে সে বছরই ‘আশ্রয়ণ’ নামের এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় থেকে তিনটি পর্যায়ে নিয়মিতভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের সকল ছিন্নমূল ও গৃহহীন মানুষকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এর অংশ হিসেবে চলমান আশ্রয়ন প্রকল্পের অধীনে সরকার নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে আড়াই লাখ গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা করেছে। প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটি খাসজমি শনাক্ত করে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠায়। প্রকল্প অফিস সেটি সরেজমিনে যাচাইয়ের পর সশস্ত্র বাহিনীর কাছে ব্যারাক নির্মাণের জন্য অগ্রিম টাকা দেয়। টাকা দেয়ার ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ব্যারাক নির্মাণের কাজ শেষ হয়। এরপর সুবিধাভোগি পরিবার বাছাই করা হয়। সুবিধাভোগী পরিবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারীসহ ভূমিহীন বা গৃহহীন পরিবারকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। উল্লেখ্য, আশ্রয়ণ প্রকল্পে সুবিধাভোগী প্রত্যেক পরিবার থেকে অন্তত দু’জন সদস্যকে ৭ দিনের উপার্জনমূলক কুটির শিল্প, মৎস্য চাষ, নার্সারী, হস্তশিল্প, সেলাই, পোশাক শিল্প বা দর্জির কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণকালীন প্রত্যেক সদস্য দৈনিক ২০০ টাকা করে ভাতা পান। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৪০টি প্রকল্পে ২৫ হাজার ২৪০টি পরিবারকে ৯ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি এই প্রকল্পের আওতায় ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩২৭টি বৃক্ষ রোপণ, ৬৯০টি প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। ‘যার জমি আছে ঘর নাই’ কর্মসূচির আওতায় পুনবার্সিত ১৫ হাজার ১৪২টি পরিবারের মধ্যে ৩ হাজার ৭১০টি সেমি-পাকা এবং অবশিষ্টগুলো টিনের ঘর দেয়া হয়েছে। প্রকল্প গ্রামসমূহের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় স্কুলগামী সকল শিশুর স্কুলে যাওয়া নিশ্চত করা হচ্ছে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকাগুলোতে স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও গোসলখানা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের সকল সুবিধাভোগির জন্য শতভাগ স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুপেয় পানির জন্য গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় রাস্তাঘাট করে দেয়া হচ্ছে। আশ্রয়ন প্রকল্পে পুনর্বাসিত সুবিধাভোগিরা আত্ম-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন। যেসব ভিক্ষুক এই প্রকল্পের সহায়তা পেয়েছেন তারা এখন নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করে নিজেদের সম্মানজনক পেশায় প্রতিষ্ঠিত করছেন।