মূল সংবাদে যান
২৪ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার করুন

মাগুরায় ৫০টি অবৈধ ভাটায় পরিবেশের ক্ষতি, প্রতিদিন পুড়ছে ২৫ হাজার মন কাঠ

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ৮৫ বার পঠিত

magura
মোঃ সোহেল রানা (মাগুরা জেলা প্রতিনিধি): পরিবেশ আইন লংঘন করে মাগুরায় গড়ে উঠেছে বহু ইটভাটা। কয়েকটি ভাটা পরিবেশ সম্মত হলেও তার দ্বিগুণেরও বেশি ইটভাটায় আইন মানা হয় না। এ কারণে ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। দূষণে আশপাশের বাড়িঘর, ফসলি জমি, ফলের গাছ, জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

সরজমিনে এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রধান সড়কের পাশে ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে অর্ধশত অবৈধ ইটভাটা। আবাসিক এলাকায় তিন ফসলি জমিতে গড়ে ওঠা এসব ভাটায় পরিবেশ বিধ্বংসী টিনের চিমনি বসিয়ে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।
মাগুরা জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম জানান, জেলায় মোট ইটভাটা ৭২টি। এর মধ্যে অনুমোদিত জিকজ্যাক ভাটা ২২টি, যেগুলোতে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয় না। রবিউল এই ২২টি ভাটা নিয়ে গঠিত সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, “সমিতির পক্ষ থেকে আমরা চাই নিয়মনীতি মেনে সব ভাটা স্থাপন করা হোক। কিন্তু দেখা যায় প্রশাসনের কাছে অবৈধ ভাটার মালিকদের কদর বেশি।”
দেশে পর্যাপ্ত কয়লার সরবরাহ রয়েছে। ন্যায্যমূল্যে সেগুলো কেনাও যাচ্ছে। অথচ রহস্যজনক উপায়ে মাগুরার সদর, শালিখা, শ্রীপুর ও মহম্মদপুরে মোট ৫০টি অবৈধ টিনের চিমনির ভাটায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। আর এতে করে আমরা যারা বৈধভাবে সরকারি নিয়মনীতি মেনে ইট প্রস্তুত করছি তারা অবৈধ ভাটার মালিকদের সাথে পেরে উঠছি না। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি দারুনভাবে।
ধলহরা এনআরজি ভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় কাঠ। এ ভাটার প্রধান কারিগর মোহন মোল্লা বলেন, “তাদের ভাটায় দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ মণ কাঠ পুড়ছে। বড় ভাটায় এর পরিমাণ আরও বেশি।” এই হিসাবে জেলার ৫০টি ‘অবৈধ’ ইটভাটায় দৈনিক ২৫ হাজার মণের বেশি কাঠ পুড়ছে বলে মোহন মনে করেন। তিনি বলেন, “প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত টাকা দিয়ে এই ব্যবসা চালানো হয়।” এসব অবৈধ ভাটার কারণে শুধু বনই উজাড় হচ্ছে না, সাধারণ মানুষ ও কৃষিও সমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এনআরজি ব্রিকসের পাশে বসবাসকারী ফারুক হোসেন বলেন, “বাড়ি ও ফসলি জমির পাশে ইটভাটা স্থাপন করায় স্বাবলম্বী থেকে আমি এখন দিনমজুরে পরিণত হইছি। “আগে আমার তিন ফসলি জমিতে ধান, সরিষা, ডাল, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল ফলত। বাড়িতে বিভিন্ন গাছে নানা ধরনের ফল ধরত। ৩৫ থেকে ৪০টি খেজুর গাছে প্রচুর রস হতো।” তার জমির পাশে টিনের ছোট্ট চিমনি দিয়ে ইটভাটা স্থাপন করায় আগুনের তাপে ও ধুলাবালিতে এখন কোনো ফসল হয় না। মৃতপ্রায় গাছগুলোয় এখন আর ফল ধরে না। খেজুর গাছগুলো মরে গেছে বলে জানান তিনি।
ফারুক বলেন, সংসার চালানোর জন্য এখন প্রায়ই রিকশা চালান তিনি। অবৈধ ইটভাটার প্রতিবাদ করার কারণে তাকে প্রায় চার বছর বাড়িছাড়া থাকতে হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মাগুরা সদর উপজেলার ধলহরা এলাকার ‘হিনো ব্রিকস’ এর মালিক আবুল কালাম আজাদ। তার ইটভাটায় কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হয়। তিনি বলেন, “অবৈধ ভাটা চালাতে গেলে নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। প্রায়ই প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের লোক আসে টাকা নিতে। এক মৌসুমে ভ্যাট বাদে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা ঘুষ গুনতে হয়।”
আজাদ বলেন, অনুমোদিত জিগজ্যাগ ভাটায় কয়লা দিয়ে ইট পেড়াতে হলে কোটি টাকার উপরে বিনিয়োগ করতে হয়। অপরদিকে অবৈধ ভাটায় লাগে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুব্রত কুমার চক্রবর্তী জানান, ‘পতিত ও এক ফসলি’ জমিতেও ইটভাটা করতে হলে পরিবেশ অদিধপ্তরের আগে কৃষি বিভাগের অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কৃষি বিভাগের অনুমতি ছাড়া মাগুরায় প্রায় সব ‘তিন ফসলি’ জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মুহম্মদ মাহবুবর রহমান বলেন, অবৈধ ভাটায় অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।তারপরও নতুন করে আবার ভাটার কার্যক্রম চালাচ্ছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হবে।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/১০-০১-১৬ইং/মোঃ সোহেল রানা/মইনুল হোসেন